২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর ইসরাইলের ভূখণ্ডে হামাসের নজিরবিহীন আক্রমণের তিন বছর পূর্ণ হলো আজ বুধবার। ইসরাইলের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ওই ঘটনার পর গাজায় শুরু হওয়া সামরিক অভিযানে উপত্যকাটির সিংহভাগ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এক বছর আগে ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পরও সেখানে এখনও মারাত্মক মানবিক সংকট চলছে। এ খবর প্রকাশ করেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
তিন বছর আগের হামাসের সেই হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জন ইসরাইলি নিহত হয়েছিলেন। একই সঙ্গে ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এরপর ইসরাইলের নির্বিচার বিমান হামলা ও স্থল অভিযানে গাজায় ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে উপত্যকাটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।
হামলায় নিহতদের স্মরণে বুধবার গাজা সীমান্তের কাছে নোভা মিউজিক ফেস্টিভ্যাল প্রাঙ্গণে মোমবাতি প্রজ্বালন ও স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। হামাসের হামলায় সেখানে ৩৪৮ জন তরুণ-তরুণী নিহত হয়েছিলেন। এছাড়া তেল আবিবের ‘হোস্টেজ স্কয়ার’-এ দিনটি স্মরণে বিশেষ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এটিই প্রথম বর্ষপূর্তি, যখন গাজায় কোনো জীবিত বা মৃত ইসরাইলি জিম্মি আর আটকে নেই। হামাসের সঙ্গে বন্দি বিনিময়ের আওতায় জীবিতদের ফিরিয়ে আনা হয় এবং গত জানুয়ারিতে সর্বশেষ জিম্মির মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
দরজায় কড়া নাড়ছে ইসরাইলের সাধারণ নির্বাচন: এই বর্ষপূর্তিটি এমন এক সময়ে পালিত হচ্ছে, যখন দেশটিতে সাধারণ নির্বাচনের বাকি মাত্র ২০ দিন। ওই হামলার পর এটিই প্রথম জাতীয় নির্বাচন, যাকে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘ ক্ষমতার ওপর গণভোট হিসেবে দেখা হচ্ছে। হামলার নিরাপত্তা ব্যর্থতার দায় নিতে শুরু থেকেই অস্বীকৃতি জানিয়ে আসা নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র তদন্তের দাবি আটকে রাখার অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে নিহত ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে, যাদের কেউ কেউ আসন্ন নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ইসরাইল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের এক জরিপে দেখা গেছে, ৬৮ শতাংশ ইহুদি ভোটার জানিয়েছেন— ৭ই অক্টোবরের ঘটনাই তাদের ভোট দেয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান বিবেচ্য বিষয়। তবে জনমত জরিপ অনুযায়ী, নেতানিয়াহু বা তার মূল বিরোধীদের কেউই সরকার গঠনের মতো একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নাও পেতে পারেন।
যুদ্ধবিরতির এক বছরেও থামেনি সহিংসতা: এদিকে ২০২৫ সালের ১০ই অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির এক বছর পেরোলেও তা ইসরাইলি হামলা সম্পূর্ণ থামাতে কিংবা হামাসের নিরস্ত্রীকরণ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। ওই চুক্তির আওতায় গাজার প্রায় ৫৩ শতাংশ এলাকা ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে ছিল, যা পরবর্তীতে বাড়িয়ে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশে উন্নীত করেছে দখলদার বাহিনী। বাকি এক-তৃতীয়াংশ হামাসের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যেখানে প্রায় ২০ লাখ ফিলিস্তিনি এখনো তাঁবুতে বা বোমার আঘাতে বিধ্বস্ত ভবনে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিস’ গাজা পুনর্গঠনের বেশ কিছু প্রস্তাব আনলেও ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ির ফিলিস্তিনি মালিকদের অধিকার উপেক্ষা করায় তা গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।
এছাড়া সেনা প্রত্যাহার ও হামাসের অস্ত্র সমর্পণের শর্তাবলি নিয়েও অচলাবস্থা কাটেনি। গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এক বছর আগের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকেও ইসরাইলি হামলায় আরও ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এ সময়ে নিহত হন পাঁচজন ইসরাইলি সেনা। গাজা পরিনত হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ মানবেতর কারাগারে।
