তিনটি বছর অতিবাহিত। গাজায় শান্তি আসেনি। উল্টো নির্যাতন, হত্যা, দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। এখন শুধু হামলা নয়, তাদেরকে পুরোপুরি উচ্ছেদের পরিকল্পনা নিয়েছে ইসরাইল। গাজা এবং পশ্চিম তীরে অবর্ণনীয় নির্যাতন চালাচ্ছে তারা। এসব নিয়ে আন্তর্জাতিক একাধিক সংবাদমাধ্যম খবর প্রকাশ করে যাচ্ছে। কিন্তু বিশ্ব বিবেক গাজাবাসীর জন্য কিছুই করছে না বা করতে পারছে না। তিনটি বছর ধরে ভয়াবহতার মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকা গাজাবাসীর কাছে জীবন মানেই ক্ষণস্থায়িত্বের সঙ্গে অবিরাম মুখোমুখি হওয়া। বারবার তাদের উপলব্ধি করতে হয়েছে একটি বাড়ি, একটি বন্ধুত্ব, জীবিকা, পরিচিত জীবনযাপন, এমনকি নিজের আগের সত্তাটিও এমন কিছুতে পরিণত হতে পারে, যার অস্তিত্ব কেবল স্মৃতির মধ্যেই থেকে যায়।
২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর আজকের এ দিনে ইসরাইলে ড্রোন হামলা চালায় গাজার স্বাধীনতাকামী যোদ্ধাগোষ্ঠী হামাস। তাতে প্রায় ১২০০ ইসরাইলি নিহত হয়। এরপর থেকে টানা তিন বছর ধরে গাজার ওপর প্রতিশোধ নিতে ইসরাইলি সেনারা হামলা, নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। বিস্তৃত জনপদ পরিণত হয়েছে বিরাণভূমিতে। এখন গাজার অনেক মানুষ শোককে পরীক্ষা হিসেবে দেখেন। তারা দেখছেন পৃথিবী এমন সব কিছু কেড়ে নেয়, যা আর কখনো ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। এমন সময় মানুষের নিয়ন্ত্রণে আসলে কী অবশিষ্ট থাকে, সেটিই যেন সেই পরীক্ষার বিষয়।
গাজা সিটিতে নিজের বাড়িতে ছিলেন ওমর আলদালু। কাজে যাওয়ার আগে সকালের নাশতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। এমন সময় অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডজুড়ে রকেটের আঘাত শুরু হয়। তার বাড়ির লোকজন বিভ্রান্ত অবস্থায় ঘুম থেকে উঠে একই প্রশ্ন করতে থাকেন- কী ঘটছে?
রকেট ছোড়া হচ্ছিল, বিস্ফোরণের শব্দ হচ্ছিল, মানুষ চিৎকার করছিল এবং স্লোগান দিচ্ছিল। কিন্তু প্রথম মুহূর্তগুলোতে আশপাশের কেউই বুঝতে পারেননি, কী ভয়াবহতার সূচনা হয়েছে কিংবা এরপর কী ঘটতে যাচ্ছে। একসময় উপসাগরীয় অঞ্চলের একটি প্রতিষ্ঠানে সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করা ওমর বাড়ি থেকে বের হননি। কারণ কোথায় যাবেন, তার কোনো জায়গা ছিল না। কী ঘটছে, সে সম্পর্কেও পরিষ্কার কোনো ধারণা ছিল না। তবে এই অনিশ্চয়তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। তিনি বলেন, মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সবকিছু উল্টে গেল। বোমাবর্ষণ ভয়াবহ রূপ নিল। আমি যে এলাকায় থাকতাম, সেটি ছিল প্রথম দিকের যেসব এলাকায় ব্যাপক হামলা চালানো হয়, তার মধ্যে অন্যতম।
বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে নিজের বাড়ি ও ঘরের ছবি তুলে রাখেন তিনি। ছবি তোলার সময় কাঁদছিলেন ওমর। কারণ বাস্তুচ্যুত হওয়ার অভিজ্ঞতা তার কাছে নতুন না। ২০১৪ সালে ইসরাইলের সামরিক অভিযানের সময়ও তাকে বাস্তুচ্যুত হতে হয়। ফলে কোনো জায়গা ছেড়ে যাওয়ার পর সেটির কী হবে কিংবা তিনি কখনো সেখানে ফিরতে পারবেন কি ন- এই অনিশ্চয়তার যন্ত্রণা তিনি আগেই জানতেন।
গত তিন বছরে সবচেয়ে কঠিন কী হারিয়েছেন- এমন প্রশ্ন করা হলে ওমর একটি নির্দিষ্ট বিষয় বেছে নিতে পারেননি। কারণ তার বর্ণনায়, এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো কোনো একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একের পর এক ক্ষতি। তিনি বলেন, একটি বিষয় বেছে নেয়া আমার জন্য খুব কঠিন। কারণ এই তিন বছর ধরে আমরা ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন জিনিস হারিয়েছি। এক বছরে ৩৬৫ দিন। আর কখনো কখনো মনে হয়, ৭ই অক্টোবরের পর থেকে প্রতিটি দিনই যেন নতুন কোনো হামলা নিয়ে এসেছে। তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে কঠিন ক্ষতিগুলোর একটি হয়তো স্থিতিশীলতাকেই হারিয়ে ফেলা। যুদ্ধের আগে আমি খুব প্রাণবন্ত একজন মানুষ ছিলাম। কাজ করতে, নতুন কিছু শিখতে, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে, হাসতে এবং বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসতাম। তিন বছরের যুদ্ধ, চাপ ও ভয় আমাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একজন মানুষে পরিণত করেছে।
