স্কালোনি কেন কাঁদলেন

মন্তব্য প্রতিবেদন

স্কালোনি কেন কাঁদলেন

ফন্ট সাইজ:

আর্জেন্টিনার মনুমেন্তাল স্টেডিয়াম। কানায় কানায় পূর্ণ। এই স্টেডিয়াম এর আগে এত জনতার বাণ দেখেছে কিনা গবেষণার বিষয়। প্রতিজন মানুষের পরনে আকাশী-সাদা জার্সি। হাতে লিও-প্লাকার্ড। কপালে, গায়ে জড়ানো আর্জেন্টিনার পতাকা। হবেই না বা কেন! এদিন যে তারা তাদের ফুটবলের মহানায়ক, এ যুগের ফুটবল কিংবদন্তি লিওনেল মেসিকে বিদায় জানালেন। না না, চিরবিদায় নয়। সম্মানের সঙ্গে জাতীয় দল থেকে তার স্বেচ্ছায় বিদায়। এ উপলক্ষে মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে যে দৃশ্য ধরা পড়েছে, তা নিকট অতীতে কোনো ম্যাচে বা কোনো ইভেন্টে দেখা গেছে কিনা জানা নেই। মেসির স্টেডিয়ামে উপস্থিতি থেকে শেষ পর্যন্ত পুরোটা সময় বেনিনের সঙ্গে ম্যাচটি হয়ে রইল মেসিময়। যেন ওই স্টেডিয়ামের আকাশে বাতাসে মেসির সুবাস ছড়িয়ে পড়েছিল। তারই মোহে তিল ধারণের ঠাঁই নেই, স্টেডিয়ামে সম্মোহিতের মতে বসে রইলেন দর্শকরা। বসে রইলেন বললে ভুল হবে। তারা সমুদ্রের সুনামির মতো মুহূর্তে মুহূর্তে ফুলে ফেঁপে উঠছিলেন উল্লাসে। মেসির পায়ে বল যেতেই লিও লিও চিৎকারে এক অদ্ভুত পরিবেশ সৃষ্টি করছিলেন। গ্যালারিতে বসে তখন হাস্যোজ্বল মেসিপত্নী রোকুজ্জু হয়তো নিজেকে এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী, সমৃদ্ধ, সম্মানিত নারী বলে মনে করছিলেন। সন্তানরা তখন কী ভাবছিল! পাশে মেসির মা। তার তখন অনুভূতি কী! যেকোনো পিতামাতা সম্ভবত বুঝতে পারেন সে সময়ে মেসির মায়ের বুকে কেমন ঝড় চলছিল। এই তো কয়েকদিন আগেই তিনি হারিয়েছেন স্বামীকে, মেসির পিতাকে। মেসির বিদায়ী ভাষণে সে কথাই ফুটে উঠেছে। তিনি তার পিতার বিদায়কে স্মরণ করেছেন। তবে যার কথা না বললেই নয়, তিনি হলেন কোচ লিওনেল স্কালোনি। তার কাছে মেসি এক নির্ভরতা। মেসি মাঠে থাকলে তিনি নির্ভয়ে থাকেন। মেসি কী, তিনি তা জানতেন। তাই তাকে বুড়ো বয়সেও বিশ্বকাপ স্কোয়াডে রেখেছিলেন এবং তাতে কী লাভ হয়েছে মেসি সর্বশেষ বিশ্বকাপে দেখিয়েছেন। মেসির জন্য স্কালোনির ভালবাসা আগাগোড়াই ছিল। কিন্তু বেনিনের বিরুদ্ধে প্রীতি ম্যাচ শুরুর সময়ে যখন আর্জেন্টিনার জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হয়, তখন টিমের সঙ্গে দাঁড়িয়ে একা একা তিনি অঝোরে কাঁদছিলেন। কেন? তিনি জানেন এদিন কী সম্পদ জাতীয় টিম হারাচ্ছে। তার সেই কান্না শুধু চোখ ভেজা নয়। পুরো গণ্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়েছে। ক্যামেরা বার বার তাতে ফোকাস করে দেখিয়েছে স্কালোনির কান্না। এই কান্না তার ভালোবাসার, মেসির জন্য ভালোবাসার। এমন ভালোবাসা ক’জন দিতে জানেন! স্কালোনিকে আমি বলি ঠাণ্ডা মাথার ‘খুনি’। কারণ, দল যখন হেরে যাচ্ছে দেখেন, তারপরও সাইডবারের বাইরে চুপচাপ বসে থাকেন। সর্বোচ্চ দাঁড়িয়ে দেখেন। কখনো কখনো খেলোয়াড়দের নির্দেশনা দেন। কিন্তু অন্য কোচদের মতো উত্তেজিত হতে দেখা যায়নি তাকে। এত ঠাণ্ডা মাথায় থাকার কারণ, তিনি জানেন তার তুরুপের তাস হাতে আছে। সেই তুরুপের তাসের জোরে রাউন্ড অব সিক্সটিনে মিশরের বিরুদ্ধে শেষ মুহূর্তে জয় ছিনিয়ে আনে আর্জেন্টিনা। বেনিনের সঙ্গে ম্যাচের পরে যখন আকাশে আলোর ঝলকানিতে অঙ্কিত হচ্ছিল মেসি অধ্যায়, তখন মাঠে সারিবদ্ধভাবে দলের সঙ্গে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য উপভোগ করেন ফুটবল কিংবদন্তি। দর্শক হয়তো লক্ষ্য করেছেন, খেলা শেষে বেনিনের খেলোয়াড়রা মেসির সঙ্গে একটি সেলফি তোলার জন্য কি প্রাণান্ত চেষ্টাই করছিলেন। খেলার মাঠে তারা এদিন আর্জেন্টিনাকে ছেড়ে কথা বলেনি। তবে খেলার বাইরে বেনিনের খেলোয়াড়রাও প্রমাণ করে দিলেন তাদের কাছে মেসি কতটা প্রিয়। এই প্রিয় মেসি দীর্ঘদিন হয়তো ফুটবলের ইতিহাসে চিরদিনের চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।