মশা মারতে ৪৮ হাজার কমিটি কাগজে আছে, বাস্তবে নেই

সহযোগীদের খবর

মশা মারতে ৪৮ হাজার কমিটি কাগজে আছে, বাস্তবে নেই

ফন্ট সাইজ:

মশা মারতে ৪৮ হাজার কমিটি কাগজে আছে, বাস্তবে নেই। প্রথম আলোর শিরোনাম। খবরে বলা হয়,
মশা মারার জন্য সারা দেশে ৪৮ হাজারের বেশি কমিটির কাজ করার কথা। ইউনিয়নের প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ে এসব কমিটির কথা কাগজে আছে, বাস্তবে নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় আন্তরিক ও উদ্যোগী না হলে দেশে ডেঙ্গু প্রতিরোধ সম্ভব নয়।

ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। প্রতিদিন মৃত্যুর খবর দিচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গতকাল মঙ্গলবার আরও ১০ জন মারা গেছে। এর আগের দিন ৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এ নিয়ে এ বছর ডেঙ্গুতে ২৮১ জনের মৃত্যু হলো। আরও মৃত্যুর আশঙ্কা আছে।

ডেঙ্গু এখন দেশের সব জেলায়। এই ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা। এডিস মশা মারার মূল দায়িত্ব স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের; কিন্তু বছরের পর বছর তারা কাজটি ঠিকমতো করছে না।

২০১৯ সালে স্থানীয় সরকার বিভাগ প্রকাশিত ‘ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ জাতীয় নির্দেশিকা’য় ইউনিয়ন পর্যায় থেকে শুরু করে উপজেলা, জেলা, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও জাতীয় পর্যায়ে কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। প্রতিটি স্তরে কত সদস্যের কমিটি কবে, কাদের নিয়ে কমিটি গঠিত হবে, কমিটির কার্যপরিধি—এসব বিস্তারিত ওই নির্দেশিকায় লেখা আছে। কিন্তু জাতীয় কমিটি এবং সিটি করপোরেশনগুলোর কমিটি ছাড়া বাকি সব কমিটি কার্যত নিষ্ক্রিয়। জেলা, উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিটি নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হতে দেখা যায়নি।
স্থানীর সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. রবিউল ইসলাম গত সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, জাতীয় কমিটি ও ১৩টি সিটি করপোরেশনের কমিটিগুলো মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। ৩৩০টি পৌরসভার কমিটিগুলো কাজ করছে। অন্য কমিটির বিষয়ে তিনি বলেন, নিশ্চয়ই কমিটিগুলো অ্যাকটিভ আছে। তারা কাজ করছে।
কত যে কমিটি
সবচেয়ে শুরুর স্তরের কমিটি হচ্ছে ইউনিয়নের ওয়ার্ড পর্যায়ে ‘ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ কমিটি’। এই কমিটির সদস্য ১১ জন। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড মেম্বার এই কমিটির সভাপতি। দেশে ইউনিয়ন আছে ৪ হাজার ৫৯৯টি। সেই হিসাবে ওয়ার্ড ৪১ হাজার ৩৯১টি (প্রতি ইউনিয়নে ৯টি ওয়ার্ড হিসাবে)। দেশের কোনো ইউনিয়নের কোনো ওয়ার্ডে ডেঙ্গু বা মশা প্রতিরোধে কমিটি আছে বলে জানা যায়নি। এর ওপরের স্তরের ইউনিয়ন পর্যায়ে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ কমিটি। এই কমিটির সভাপতি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান।

ইউনিয়নের ওপরের স্তরে দুই ধরনের কমিটি। পৌরসভা ও উপজেলা কমিটি। দেশে পৌরসভা আছে ৩৩০টি এবং উপজেলা আছে ৫০৩টি। পৌর মেয়র পৌরসভা কমিটির সভাপতি এবং উপজেলা চেয়ারম্যান উপজেলা কমিটির সভাপতি।
এর ওপরে জেলা কমিটি। প্রতিটি জেলায় একটি করে মোট ৬৪টি কমিটি থাকার কথা। আর আছে প্রতিটি সিটি করপোরেশনে একটি করে কমিটি। এখন দেশে সিটি করপোরেশন ১৩টি। এ ছাড়া প্রত্যেক সিটি করপোরেশন ও প্রত্যেক পৌরসভার প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে কমিটি হওয়ার কথা। সিটি করপোরেশনগুলোতে ওয়ার্ড আছে ৬৬৮টি এবং পৌরসভাগুলোতে ওয়ার্ড আছে কমপক্ষে ৯৯০টি।

কেন্দ্রীয়ভাবে সবার ওপরে আছে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধবিষয়ক জাতীয় কমিটি। এই কমিটির সদস্য ২৪ জন। সদস্যদের মধ্যে আছেন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মেয়র, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিনিধি, ১৪টি মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং আরও ৫ জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি।
দেখা যাচ্ছে ইউনিয়নের ওয়ার্ড পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত কমিটির সংখ্যা ৪৮ হাজার ৫৫৯। স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতায় এত কমিটি গঠন করার কথা অনেকে জানেনই না।

ডেঙ্গু বিষয়ে বর্তমান সরকারকে পরামর্শ দিচ্ছেন এমন একজন গবেষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিটি পৌরসভায় কমিটি আছে বা থাকার কথা। কিন্তু ইউনিয়ন বা ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি গঠনের কথা জানা নেই। বড় বড় নীতিনির্ধারণী সভাতেও এ কথা শোনা যায়নি।
এসব কমিটির কী কাজ
২০১৯ সালে তৈরি করা জাতীয় নির্দেশিকায় স্থানীয় সরকার বিভাগসহ সব স্তরের কমিটির করণীয় বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ আছে। বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকার বিভাগ ডেঙ্গু প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর-সংস্থা এবং বেসরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠা, গণযোগাযোগমাধ্যম ও এনজিওসহ সব অংশীজনের দায়িত্ব নির্ধারণ করবে এবং সবার কাজের সমন্বয় করবে। স্থানীয় সরকার বিভাগ ডেঙ্গু প্রতিরোধে বছরব্যাপী কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়নে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা ও সহায়তা করবে এবং হাতে নেওয়া কাজের তদারকিও করবে। সিটি করপোরেশন, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন থেকে আসা মতামত ও সুপারিশের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা তাদের। ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ কাজের মধ্যে আরও বলা আছে, দেশব্যাপী মশা মারার প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ আসবে মূলত স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে।

জাতীয় কমিটির কার্যপরিধিতে বলা আছে, এই কমিটি গৃহীত ও বাস্তবায়িত কার্যক্রম পর্যালোচনা, মূল্যায়ন, তদারকি ও সমন্বয় করবে; প্রয়োজনীয় গবেষণা পরিচালনা, নীতি ও কর্মকৌশল প্রণয়ন এবং সেগুলো হালনাগাদ করবে। বছরে কমপক্ষে জাতীয় কমিটির চারটি সভা হতে হবে।
সিটি করপোরেশন এবং সিটি করপোরেশনের মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধ কমিটি কী করবে, তারও বিস্তারিত বর্ণনা আছে। মশা নিধন, ডেঙ্গু প্রতিরোধ, পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে ৩৩টি নির্দেশনা বা করণীয় এতে বলা আছে।

একইভাবে জেলা কমিটি, পৌর কমিটি, উপজেলা কমিটির কাজের তালিকা দিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। প্রতিটি কমিটিকে মাসে একবার সভা করার কথাও তারা বলেছে। পৌরসভার করণীয়তে বলা হয়েছে, ‘মশার লার্ভার উৎসস্থল বিনষ্টকরণে আইনি পদক্ষেপ হিসেবে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ।’ একেবারে প্রাথমিক স্তরে বা ইউনিয়নের ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটিকেও মাসে একবার পরিস্থিতি পর্যালোচনার সভা করতে বলা হয়েছে।
মাঠ পর্যায়ে কী হচ্ছে
এ বছর ১১ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে দেশবাসীকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযানে অংশ নিতে আহ্বান জানান। তখনো স্থানীয় সরকার বিভাগের পক্ষ থেকে বড় কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। এরপর প্রধানমন্ত্রী ১২ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। প্রতি শনিবার এ কর্মসূচি পালিত হচ্ছে, চলবে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

প্রধানমন্ত্রীর এ উদ্যোগের ফলে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও উপজেলা পর্যায়ে কিছু তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। কুমিল্লার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রথম আলোর প্রতিনিধিকে গতকাল জানানো হয়েছে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটি করা হয়েছে। কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ২৭টি ওয়ার্ডেও কমিটি গঠিত হয়েছে।
পাবনা জেলার বেড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বেড়া পৌরসভার প্রশাসক রুনাল্ট চাকমা প্রথম আলোকে বলেন, ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধের জন্য কমিটি গঠনের বিষয়ে কোনো নির্দেশনা আমরা পাইনি। তাই উপজেলায় এ-সংক্রান্ত কোনো কমিটি গঠন করা হয়নি। তবে ডেঙ্গু প্রতিরোধে কাজ চলছে।’

বেড়া উপজেলার হাটুরিয়া-নাকালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল হামিদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘উপজেলা পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত মাসিক সভায় চেয়ারম্যানদের ডেঙ্গু প্রতিরোধে উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। এর পর থেকে আমরা ইউপি সদস্য, গ্রাম পুলিশ ও এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কাজ, মানুষকে সচেতন করার কাজ এবং প্রচারের কাজ হাতে নিয়েছি।’
নেত্রকোনা পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা নূরুল আমিন প্রথম আলোকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী প্রতি শনিবার ফগার মেশিন দিয়ে মশা নিধন কার্যক্রম বলছে। তবে পৌরসভার নয়টি ওয়ার্ডের কোনোটিতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে কমিটি নেই বলে জানান তিনি।

ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সিটি করপোরেশন টাস্কফোর্স কমিটি করা হয়েছে। আগে কাউন্সিলরদের নিয়ে ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি থাকলেও এখন তা কার্যকর নেই।
যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে কোনো কমিটির সভা হয়নি, তবে হবে। এখন প্রতিদিন একটি এলাকা বেছে নিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে। অন্যদিকে একই উপজেলার মজিদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হুমায়ুর কবির বলেন, ইউনিয়ন ডেঙ্গু প্রতিরোধ কমিটির সভা হয়েছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজও চলছে।

কেশবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আলাউদ্দিন বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে গঠিত ইউনিয়ন পরিষদের কমিটির কোনো সভা হয়নি। তবে বিক্ষিপ্তভাবে রাস্তার পাশের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করা হচ্ছে।

রংপুর জেলার তারাগঞ্জ উপজেলার কুর্শা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আফজালুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ইউএনওর নির্দেশে বার্ষিক উন্নয়ন সহায়তা তহবিল প্রকল্পের আওতায় মশা নিধনের ওষুধ ও ফগার মেশিন কিনে দেওয়া হয়েছে। গ্রাম পুলিশ আবদুর রহমানকে মেশিন চালানোর কৌশল শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে মশা নিধন বিষয়ে কোনো কমিটি এখনো হয়নি।

সিলেট সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সেখানে ডেঙ্গু প্রতিরোধে কোনো ওয়ার্ড কমিটি নেই।

চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলা ও পৌরসভা এবং কোনো ইউনিয়নে ডেঙ্গু প্রতিরোধে কোনো ধরনের কমিটি নেই।
ডেঙ্গু শহর থেকে গ্রামে
ডেঙ্গুর সমস্যাটি ছিল মূলত ঢাকা শহরকেন্দ্রিক। কিছুটা ছিল চট্টগ্রাম ও খুলনার মতো বড় শহরে। ফলে মশা নিধনের সরকারি উদ্যোগও ছিল শহর ঘিরে। ২০১৯ সালে ডেঙ্গু প্রথমবারের মতো সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ডেঙ্গু এখন গ্রামেরও সমস্যা। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে মশা নিধনের বড় কার্যক্রম নেই।

দেশের সব জেলার মানুষই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (সোমবার সকাল আটটা থেকে মঙ্গলবার সকাল আটটা পর্যন্ত) সারা দেশে ১ হাজার ৯৯৬ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এ বছরে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার রোগীর সংখ্যা ৯০ হাজার ৩৫৬। গতকাল সারা দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ৫ হাজার ৭৭৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিল।
এ ব্যাপারে জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল প্রথম আলোকে বলেন, এত কমিটির কথা অনেকের জানা নেই। এসব কমিটি সচল করা, তৈরি করা জরুরি হয়ে পড়েছে। মাঠ পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায়ের সব কমিটিকে যদি সক্রিয় করা সম্ভব হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ সম্পৃক্ত হবে, দেশে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বড় আন্দোলন গড়ে উঠবে।

'মবের শিকার শিক্ষক-শিক্ষার্থী তদন্তে আসছে জাতিসংঘ' সমকালের শিরোনাম।

খবরে বলা হয়, জাতিসংঘের শিক্ষা অধিকারবিষয়ক বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ার ফরিদা শাহীন আগামী মাসে বাংলাদেশে আসছেন। তিনি ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর সারাদেশে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মবের শিকার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ তদন্ত করবেন। জাতিসংঘের শিক্ষা সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর ঢাকা অফিস তাঁকে সহায়তা করবে।

আগামী ২৩শে নভেম্বর ফরিদা শাহীনের ঢাকায় আসার কথা। তিনি ৪ঠা ডিসেম্বর পর্যন্ত থাকবেন। তাঁর বাকি কর্মসূচি নভেম্বরের শুরুতে চূড়ান্ত হবে। তবে বাংলাদেশে অবস্থানকালে তিনি মবে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং এ ধরনের ঘটনায় মারা যাওয়া শিক্ষকদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলবেন।

মবের শিকার শিক্ষকদের সংগঠন 'পদবঞ্চিত প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষক জোট' এ তথ্য জানিয়েছে। সংগঠনটির হিসাবে, বেপরোয়া মবকারীদের হাতে প্রায় সাড়ে চার হাজার শিক্ষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

তাদের মধ্যে অন্তত আটজন শারীরিক ও মানসিক আঘাতের পর মারা গেছেন। পাঁচ শতাধিক আহত বা অসুস্থ হয়েছেন। ৯৪০ জন শিক্ষক এখনও বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। মবের শিকারদের বেশির ভাগ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক।

ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষক নেতারা সমকালকে বলেন, এ বিষয়ে সরকারি কয়েকটি নির্দেশনা জারি করলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান তা বাস্তবায়ন করেনি। ফলে দুই বছর ধরে অনেক শিক্ষক কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না। কারও শিক্ষক ইনডেক্স (এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের শনাক্তকরণ নম্বর) বাতিল করা হয়েছে।


বিশ্বের ৫০০ ভালো শহরের তালিকায় নেই বাংলাদেশের কোনো শহর। বণিক বার্তার শিরোনাম। এতে বলা হয়, বড় বড় অবকাঠামো কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কোনো শহরকে বাসযোগ্য ভালো শহর হিসেবে গড়ে তুলতে পারে না। আরো প্রয়োজন হয় দূষণমুক্ত পরিবেশ, মানসম্মত নাগরিক সেবা, সুশাসন ও টেকসই অর্থনীতির। কিন্তু এসব সূচকে পিছিয়ে থাকায় বিশ্বের সেরা ৫০০ শহরের তালিকায় জায়গা হয়নি বাংলাদেশের কোনো শহরের। বরং বছরের ব্যবধানে দেশের বড় শহরগুলোর বৈশ্বিক অবস্থান আরো নিচে নেমেছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক স্বাধীন অর্থনৈতিক পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের ২০২৬ সালের গ্লোবাল সিটিজ ইনডেক্সে বিশ্বের ১৬৩টি দেশের এক হাজার শহরকে পাঁচটি সূচকের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়েছে। তালিকায় বাংলাদেশের আটটি শহরের মধ্যে এগিয়ে থাকা ঢাকার অবস্থান ৫১৫তম। এ ইনডেক্সে গত বছর ঢাকা ছিল ৪৮২তম অবস্থানে। বছরের ব্যবধানে এ শহর পিছিয়েছে ৩৩ ধাপ। ফলে বিশ্বের সেরা ৫০০ শহরের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে ঢাকা। অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের ৫ সূচকের মধ্যে আছে অর্থনীতি, মানবসম্পদ, জীবনযাত্রার মান, পরিবেশ ও শাসন ব্যবস্থা।
ঢাকার সঙ্গে পিছিয়েছে দেশের অন্য বড় শহরগুলোও। গত এক বছরে সবচেয়ে বেশি পিছিয়েছে রাজশাহী। ৬৬ ধাপ নেমে শহরটির অবস্থান এখন ৭৭৯তম। চট্টগ্রাম ১৪ ধাপ পিছিয়ে ৭৬৩তম হয়েছে। খুলনা রয়েছে ৮১১তম, সিলেট ৮৩৪ ও ময়মনসিংহ ৮৯৫তম অবস্থানে। বগুড়া ৩২ ধাপ পিছিয়ে ৯২৬তম হয়েছে। বাংলাদেশের শহরগুলোর মধ্যে শুধু কুমিল্লা আগের বছরের অবস্থান ধরে রেখেছে। শহরটির অবস্থান ৮৮৩তম।

অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের গ্লোবাল সিটিজ ইনডেক্সে অর্থনীতির জন্য সর্বোচ্চ ৩০, মানবসম্পদের জন্য ২৫, জীবনমানের জন্য ২৫ এবং পরিবেশ ও শাসন ব্যবস্থার জন্য ১০ করে মোট ১০০ নম্বর রাখা হয়েছে। প্রকাশ করা হয়েছে শুধু তালিকার শীর্ষে থাকা ১০০ শহরের স্কোর। বাংলাদেশের কোনো শহর এ তালিকায় না থাকায় সেগুলোর সামগ্রিক স্কোর উল্লেখ করা হয়নি।

শহরের সামগ্রিক অবস্থান নির্ধারণে অর্থনীতির আকার, কাঠামো ও প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষা, ব্যবসার পরিবেশ, জনমিতিক প্রবণতা, নাগরিকদের জীবনযাত্রা, স্বাস্থ্য ও আর্থিক অবস্থা, নাগরিক সুবিধা, পরিবেশ, জলবায়ু ঝুঁকি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নাগরিক অধিকার বিবেচনায় নেয়া হয়েছে।

দেশের অন্যতম বিভাগীয় ও পুরনো শহর রাজশাহী। পরিবেশ সূচকে এ শহরের অবস্থান সময়ের সঙ্গে নিচে নামছে, বিশ্বে রাজশাহীর অবস্থান এখন ৮৫২তম। সবুজ ও পরিচ্ছন্ন হিসেবে একসময় শহরটির খ্যাতি থাকলেও গত এক দশকে পরিবেশের মানে অবনতি হয়েছে। জানতে চাইলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাজশাহীর পরিবেশ দিন দিন খারাপ হচ্ছে। এখানে প্রচুর বায়ুদূষণ বেড়েছে। নগরীর বড় বড় গাছ কাটা হয়েছে। তীব্র গরমে জনজীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে এখানকার বরেন্দ্র এলাকায় তীব্র পানি সংকট দীর্ঘদিনের সমস্যা। এ অঞ্চলের নদীগুলোও দূষিত হয়ে পড়ছে।’

পরিবেশের সূচকে দেশের শহরগুলোর মধ্যে এগিয়ে আছে সিলেট। তাও শহরটির অবস্থান ৭৩৫তম। আর সবচেয়ে খারাপ অবস্থা খুলনার, ৯৭৪তম। এতে ঢাকার অবস্থান বিশ্বের মধ্যে ৯৩০তম। ময়মনসিংহ আছে ৯৪০ আর চট্টগ্রাম ৯২৪তম। সামগ্রিকভবে পরিবেশ সূচকে দেশের বড় শহরগুলোর অবস্থান একেবারে পেছনের দিকে।

বাংলাদেশের শহরগুলোর মধ্যে শুধু অর্থনীতির সূচকে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে ঢাকা। বিশ্বে এ সূচকে ঢাকার অবস্থান ২৮৬তম। জিডিপির আকার ও প্রবৃদ্ধি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, মাথাপিছু জিডিপি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির ভিত্তিতে এ সূচক তৈরি করা হয়েছে। এক্ষেত্রে চট্টগ্রাম ৭০২ ও ময়মনসিংহ ৭৩৪তম অবস্থানে রয়েছে।

মানবসম্পদ সূচকেও ঢাকা দেশের অন্য শহরগুলোর তুলনায় এগিয়ে। এ সূচকে শহরটির অবস্থান ১৭৮তম। শিক্ষা, ব্যবসার পরিবেশ ও জনমিতিক প্রবণতার ভিত্তিতে এ মূল্যায়ন করা হয়। এরপর খুলনা ৫৪১ ও রাজশাহী ৫৯৯তম অবস্থানে রয়েছে। অর্থাৎ অর্থনীতি ও মানবসম্পদের মতো সূচকে ঢাকার অবস্থান তুলনামূলক ভালো হলেও পরিবেশসহ সামগ্রিক র‍্যাংকিংয়ে সেটি ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।

আকাশপথে কড়া নজর, বাড়ছে আয়। কালের কণ্ঠের শিরোনাম। এতে বলা হয়, দেশের আকাশসীমা দিয়ে উড়ে যাচ্ছে একের পর এক বিদেশি উড়োজাহাজ। এত দিন এসব উড়োজাহাজের চলাচল নজরদারি ও হিসাব রাখার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ছিল।
ফলে আকাশসীমা ব্যবহারের বিপরীতে প্রাপ্য রাজস্ব আদায়েও পুরোপুরি সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছিল না। আধুনিক রাডার ও এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা চালুর পর সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে।
জানা গেছে, নতুন রাডারে বাংলাদেশের আকাশসীমায় উড়োজাহাজ শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা বেড়েছে কয়েক গুণ। এর সঙ্গে বেড়েছে বিদেশি উড়োজাহাজের কাছ থেকে আদায় করা ‘ওভারফ্লায়িং চার্জ’।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এই খাত থেকে বিমান চলাচল খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) আয় করেছে ৪১৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় আয় বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ।
বেবিচকের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, বাংলাদেশের আকাশসীমায় থাকা উড়োজাহাজের অবস্থান এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা যাচ্ছে। ফলে কোন উড়োজাহাজ কতটুকু আকাশসীমা ব্যবহার করছে, তার হিসাব রাখা এবং সে অনুযায়ী চার্জ আদায় করা সহজ হয়েছে।


বিমানের মহাপরিকল্পনায় প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন- বহর বাড়ছে, সক্ষমতা কোথায়। যুগান্তরের শিরোনাম। এতে বলা হয়, বহর সম্প্রসারণে বড় পরিকল্পনা নিয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। বর্তমানে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থাটির বহরে রয়েছে ১৯টি উড়োজাহাজ। এ বছর বোয়িংকে নতুন করে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার আদেশ দিয়েছে। আজ এয়ারবাসের আরও ১০টি কেনার চুক্তি হবে। পাশাপাশি ২০২৭ সালের মধ্যে ১০টি উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। কিন্তু নতুন বহর বাড়ানোর এই মহাযজ্ঞে কতটা প্রস্তুত বিমান-সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ, বিদ্যমান বহর পরিচালনাতেই নানা সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে সংস্থাটি। দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে যন্ত্রাংশ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সংকট। প্রশ্ন রয়েছে প্রকৌশলী ও মেইনটেন্যান্স সক্ষমতা নিয়েও। এর সঙ্গে রয়েছে পাইলট সংকট। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না থাকা কর্মীরাও বিভিন্ন সময়ে অপারেশনাল জটিলতার কারণ হয়ে উঠছেন। সব মিলিয়ে বহর বাড়ানোর এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে বিমানের বর্তমান সক্ষমতা কতটা এবং নতুন উড়োজাহাজ পরিচালনায় অতিরিক্ত কতটা সক্ষমতা প্রয়োজন-তার সুস্পষ্ট রোডম্যাপ রয়েছে কিনা, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক এভিয়েশন বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব পুনরুদ্ধারে বহর বাড়ানোর উদ্যোগ যথাযথ। তবে শুধু বহর বড় করলেই হবে না; তা নিরাপদ ও দক্ষভাবে পরিচালনার সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে এয়ারলাইন্সের ব্যবসায়িক কৌশলেও পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট রুটের ওপর নির্ভর না করে স্পোক-হাব মডেল, ইন্টারলাইন ও কোডশেয়ার চুক্তির মাধ্যমে বাজার সম্প্রসারণের কৌশল নিতে হবে। নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হলে পাইলট-ক্রুর পাশাপাশি বাড়াতে হবে প্রশিক্ষণ, সিমুলেটর, রক্ষণাবেক্ষণ, হ্যাঙ্গার, পার্কিং, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও বিমানবন্দর অবকাঠামো।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ উইং কমান্ডার (অব.) এটিএম নজরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘বহর সম্প্রসারণ অবশ্যই ইতিবাচক। নতুন বিমান আসার আগেই পাইলট, কেবিন ক্রু, প্রকৌশলী ও রক্ষণাবেক্ষণকর্মী নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ শেষ করতে হবে। সিমুলেটর, যন্ত্রাংশ, মেইনটেন্যান্স সুবিধা ও গ্রাউন্ড সাপোর্টও প্রস্তুত রাখতে হবে। শুধু পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ফ্লাইট দিয়ে বড় বহর পরিচালনা করা কঠিন। একই সঙ্গে কোন রুটে কখন কত যাত্রী সেটি বিবেচনায় নিয়ে উড়োজাহাজ ব্যবহার করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বহর বাড়ানোর সঙ্গে আর্থিক দায়ও বাড়বে। তাই এখনই অর্থায়ন, জনবল, রক্ষণাবেক্ষণ ও অবকাঠামোর সমন্বিত পরিকল্পনা করতে হবে। হ্যাঙ্গার, পার্কিং ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সক্ষমতা না বাড়ালে নতুন উড়োজাহাজের বড় অংশই কাঙ্ক্ষিতভাবে কাজে লাগানো যাবে না।’


জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত যুগান্তরকে বলেন, ‘বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর সম্প্রসারণের উদ্যোগ বর্তমান সরকারের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ। নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত করার পাশাপাশি এগুলো পরিচালনার প্রয়োজনীয় সক্ষমতা গড়ে তোলার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। বহর সম্প্রসারণের সুফল নিশ্চিত করতে নিরাপদ, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক পরিচালনা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।’


নয়া দিগন্তের শিরোনাম- জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বড় পরীক্ষা তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এতে বলা হয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মোটামুটি ঐকমত্য তৈরি হলেও নির্বাচনকালীন সরকার কিভাবে গঠিত হবে এবং প্রধান উপদেষ্টা কে ও কিভাবে নির্বাচিত হবেন- এ নিয়ে এখনো কাটেনি জটিলতা। জুলাই জাতীয় সনদে এ জন্য পাঁচ সদস্যের বাছাই কমিটি থেকে শুরু করে ৫ + ৫ + ২ পদ্ধতি, বিচার বিভাগের দুই প্রতিনিধি যুক্ত করা এবং সাত সদস্যের কমিটিতে গোপন ব্যালটে ‘র‌্যাংকড চয়েস’ ভোটের যে কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে, তার একাধিক ধাপ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমত রয়েছে। বিশেষ করে বিচার বিভাগের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্তি, প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনে র‌্যাংকড চয়েস পদ্ধতি এবং পদ শূন্য হলে উত্তরসূরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া নিয়ে রয়েছে নোট অব ডিসেন্ট। ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় নীতিগত ঐকমত্য এলেও সেটিকে কার্যকর সাংবিধানিক কাঠামোয় রূপ দেয়াই এখন বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে গত রোববার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটির পঞ্চম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অবদান রাখা শ্রমজীবী মানুষ এবং ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা সংবিধান সংশোধন নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব দেন। বৈঠকে উত্থাপিত এবং লিখিতভাবে পাঠানো প্রস্তাবগুলো কমিটির প্রস্তুত করা প্রতিবেদনে উল্লেখ থাকবে বলে জানিয়েছে কমিটি।
গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির ষষ্ঠ বৈঠকে সংবিধান সংশোধন কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা এমনভাবে সংবিধানে প্রতিস্থাপন করা হবে, ভবিষ্যতে এটি পরিবর্তন করতে হলেও জনগণের মতামত নিতে গণভোটের প্রয়োজন হবে। তিনি জানান, রাষ্ট্রপতি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হতে পারবেন না- এ বিষয়ে কমিটির মতামত রয়েছে।
বিরোধী দল ছাড়াই সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি। তবে কমিটির সাথে মতবিনিময় ও সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো অংশ নেয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গতকালসহ মোট পাঁচটি বৈঠক করেছে। এই কমিটিতে জামায়াতসহ বিরোধী দলের পাঁচজনের প্রতিনিধি চাওয়া হলেও তা সরাসরি নাকচ করে দেয়া হয়। সংবিধান সংশোধন নয়, সংবিধান সংস্কার পরিষদ চায় বিরোধী দল। এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই এগিয়ে যাচ্ছে সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটির কার্যক্রম। এমনকি বিশেষ কমিটির বৈঠকে রাজনৈতিক দলগুলোকে আমন্ত্রণ জানালেও জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং তাদের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো মতবিনিময় সভায় অংশ নেয়নি। ফলে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রণীত জুলাই সনদ কিভাবে সংসদীয় ও সাংবিধানিক কাঠামোয় বাস্তবায়িত হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র জানায়, বিশেষ কমিটি আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের মতামত নেয়া অব্যাহত থাকবে। পরবর্তী বৈঠকগুলোতে সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার প্রতিনিধি, নারী নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তি ও সংগঠন, জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের সাথে যুক্ত ব্যক্তি, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক ও আইনজীবী, শিক্ষক, শ্রমজীবী মানুষসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
পাঁচ সদস্যের বাছাই কমিটি
জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী, সংসদের স্বাভাবিক মেয়াদ শেষ হওয়ার ৩০ দিন আগে স্পিকারের তত্ত্বাবধানে সংসদ সচিবালয়ের ব্যবস্থাপনায় পাঁচ সদস্যের বাছাই কমিটি গঠন হবে। এতে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার, বিরোধী দলের ডেপুটি স্পিকার এবং সংসদের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের একজন প্রতিনিধি। একাধিক দলের আসনসংখ্যা সমান হলে নির্বাচনে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া দলকে দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দল হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব রয়েছে। স্পিকার কমিটির বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন।
কমিটি গঠনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের কাছ থেকে প্রধান উপদেষ্টা পদের যোগ্য ব্যক্তির নাম চাওয়া হবে। প্রতিটি দল বা স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য একটি করে নাম দিতে পারবেন। একই সাথে কমিটি নিজ উদ্যোগেও যোগ্য ব্যক্তিদের নাম অনুসন্ধান করতে পারবে। এ পর্যায়ে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। তাদের প্রস্তাব, ‘নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলসমূহ’ কথাটি বাদ দিতে হবে।
প্রথম ধাপে ১২০ ঘণ্টায় সিদ্ধান্ত
রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সংসদ সচিবালয়ে নাম জমা দেবেন। এরপর ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বাছাই কমিটি প্রস্তাবিত ও নিজস্ব অনুসন্ধানে পাওয়া নাম থেকে একজনকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বেছে নেবে। নির্বাচিত ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেবেন; অর্থাৎ বাছাই কমিটি গঠনের পর নাম প্রস্তাব, যাচাই-বাছাই ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে মোট ১২০ ঘণ্টার সময় নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।
ব্যর্থ হলে ৫ + ৫ + ২
১২০ ঘণ্টার মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন সম্ভব না হলে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টায় সরকারি দল বা জোট পাঁচজন, প্রধান বিরোধী দল বা জোট পাঁচজন এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দল দু’জনের নাম প্রস্তাব করবে। মোট ১২ জনের তালিকা স্পিকার জনসাধারণের অবগতির জন্য প্রকাশ করবেন।
এরপর সরকারি দলের পাঁচজনের তালিকা থেকে প্রধান বিরোধী দল একজন এবং প্রধান বিরোধী দলের পাঁচজনের তালিকা থেকে সরকারি দল একজনকে বেছে নেবে। দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের দু’জনের তালিকা থেকেও সরকারি দল ও প্রধান বিরোধী দল একজন করে বেছে নেবে।
এভাবে পাওয়া নামগুলোর মধ্যে কোনো একজনকে নিয়ে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর ঐকমত্য হলে তাকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মনোনীত করা হবে। ঐকমত্য না হলে পাঁচ সদস্যের বাছাই কমিটির অন্তত চারজন কোনো একজনের পক্ষে একমত হলে তাকেই মনোনীত করার বিধান রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোট ঐকমত্য পোষণ করেছে।
বিচার বিভাগের দুই প্রতিনিধি
এ পর্যায়েও সিদ্ধান্ত না হলে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় বাছাই কমিটিতে বিচার বিভাগের দুই প্রতিনিধি যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। একজন হবেন আপিল বিভাগের বিচারপতি এবং অন্যজন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি। তাদের মনোনয়নের জন্য সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি, কর্মরত প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতিকে নিয়ে তিন সদস্যের কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিচার বিভাগের প্রতিনিধিরা প্রধান উপদেষ্টা পদের জন্য কোনো নাম প্রস্তাব করতে পারবেন না।
এই ধাপে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ ২৩টি দল একমত হয়েছে। তবে বিএনপিসহ সাতটি দল নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে।
সাত সদস্যের কমিটিতে র‌্যাংকড চয়েস
বিচার বিভাগের দুই প্রতিনিধি যুক্ত হলে বাছাই কমিটির সদস্যসংখ্যা দাঁড়াবে সাত। এই কমিটি স্পিকারের তত্ত্বাবধানে গোপন ব্যালটে ‘র‌্যাংকড চয়েস’ বা ক্রমভিত্তিক ভোটিং পদ্ধতিতে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন করবে। সময় থাকবে ২৪ ঘণ্টা।
এ প্রস্তাবেও জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ ২৩টি দল একমত হয়েছে। বিএনপিসহ সাতটি দল নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। তাদের প্রস্তাব, এ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত জাতীয় সংসদের মাধ্যমে নির্ধারণ করা উচিত।
নিয়োগ ও উত্তরসূরি নির্ধারণ
যেকোনো পদ্ধতিতে প্রধান উপদেষ্টা মনোনীত হওয়ার পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রাষ্ট্রপতি তাকে ৯০ দিনের জন্য নিয়োগ দেবেন। তবে সংসদ বহাল থাকাবস্থায় তিনি শপথ নিতে পারবেন না। কোনো পদ্ধতিতেই প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন সম্ভব না হলে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুসরণের প্রস্তাব রয়েছে। তবে রাষ্ট্রপতিকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বেছে নেয়া যাবে না।
কোনো কারণে প্রধান উপদেষ্টার পদ শূন্য হলে র‌্যাংকড চয়েস ভোটে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা জ্যেষ্ঠতম ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেয়ার প্রস্তাব রয়েছে। তিনি অপারগ হলে পরবর্তী ব্যক্তি দায়িত্ব পাবেন এবং উপদেষ্টা পরিষদ বহাল থাকবে। এ প্রস্তাবে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ ২৪টি দল একমত হলেও বিএনপিসহ ছয়টি দল নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। তাদের প্রস্তাব, এ পর্যায়ের সিদ্ধান্তও জাতীয় সংসদের মাধ্যমে নির্ধারণ করা।
সর্বোচ্চ ১৫ উপদেষ্টা, মেয়াদ ৯০ দিন
প্রধান উপদেষ্টার পরামর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি অনধিক ১৫ জন উপদেষ্টা নিয়োগ করবেন। প্রধান উপদেষ্টা প্রধানমন্ত্রীর এবং অন্যান্য উপদেষ্টা মন্ত্রীর পদমর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন। উপদেষ্টা হওয়ার সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৭২ থেকে বাড়িয়ে ৭৫ বছর করার প্রস্তাবও রয়েছে।
সংসদের স্বাভাবিক মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সংসদ ভেঙে গেলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিলুপ্ত সংসদের অনুরূপ প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে বাছাই কমিটি গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ১৪ দিন বা ৩৩৬ ঘণ্টার মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ হবে অনধিক ৯০ দিন। দৈব-দুর্বিপাকের কারণে নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন সম্ভব না হলে মেয়াদ সর্বোচ্চ আরো ৩০ দিন বাড়ানো যাবে। নতুন সংসদ গঠনের পর নতুন প্রধানমন্ত্রী কার্যভার গ্রহণের তারিখে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলুপ্ত হবে।
তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা ভবিষ্যতে পরিবর্তনে গণভোটের প্রয়োজন হবে
গতকাল মঙ্গলবার সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃস্থাপন নিয়ে বিশেষ কমিটির অবস্থানও বৈঠক শেষে স্পষ্ট করেছেন সংবিধান সংশোধন কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, আদালতের রায়ের বিষয়গুলো সংবিধান সংশোধনীতে প্রতিফলিত হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা এমনভাবে সংবিধানে প্রতিস্থাপন করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে এটি পরিবর্তন বা বাতিল করতে হলে জনগণের মতামত নিতে হয়; অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা শুধু সংবিধানে ফিরিয়ে আনার বিষয় নয়, ভবিষ্যতে কোনো সরকার বা সংসদ যাতে সহজে তা বাতিল করতে না পারে, সে জন্যও সাংবিধানিক সুরক্ষা দেয়ার চিন্তা রয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, রাষ্ট্রপতি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হতে পারবেন না- এ বিষয়ে কমিটির মতামত রয়েছে। তবে সরকারপ্রধান বা প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের পদ্ধতি, অন্যান্য সদস্যের কাঠামোসহ তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিস্তারিত প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ বিষয়ে বিভিন্ন পক্ষের মতামত পর্যালোচনা করা হবে।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর বিশেষ কমিটির চতুর্থ বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার কী প্রক্রিয়ায় এবং কাদের নিয়ে গঠিত হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রস্তাব নেয়া হবে এবং আলোচনার মাধ্যমে যে প্রস্তাব উপযুক্ত মনে হবে, সেটি সংসদীয় প্রক্রিয়ায় বিবেচনা করা হবে।
এর আগে ২০ সেপ্টেম্বর সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবেই তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে। সনদে থাকা নোট অব ডিসেন্টের বিষয়গুলোও আলোচনার মাধ্যমে বিবেচনা করার কথা জানান তিনি। একই সাথে দ্রুত সংসদে সংবিধান সংশোধন বিল আনার কথা জানিয়েছিলেন।
‘আমরা-মামুরা সংশোধন কমিটি’
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বর্তমান সংবিধান সংশোধন কমিটিকে ‘আমরা-মামুরা সংশোধন কমিটি’ বলে মন্তব্য করেছেন। গত রোববার অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করা অনেককেই চেয়ার, পদ কিংবা মন্ত্রণালয়ের প্রলোভন দেখিয়ে নিজেদের পক্ষে নেয়া হয়েছে। শেষ পর্যন্ত জনগণই তাদের মূল্যায়ন করবে এবং তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলবে- এমন মন্তব্যও করেন তিনি।
গণভোটের ফলাফল প্রসঙ্গে হাসনাত বলেন, ফলাফলের কিছু বিষয় মেনে নেয়া এবং কিছু বিষয় প্রত্যাখ্যান করার মাধ্যমে সংশ্লিষ্টরা দ্বিমুখী অবস্থান নিয়েছেন। তার অভিযোগ, জনগণের রায় বাস্তবায়নে সরকারের অনীহা স্পষ্ট হয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়েও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। তার দাবি, ২০০৬ সালের মতো একদলীয় নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের জন্য বিএনপি নতুন কোনো ফর্মুলা সামনে আনতে পারে। এ ক্ষেত্রে ‘প্রতারণামূলক’ কোনো ব্যবস্থা এবং ধর্মীয় আবেগ ব্যবহারের আশঙ্কার কথাও বলেন তিনি। তার বক্তব্য, জনগণের দেয়া রায় আগে বাস্তবায়ন করতে হবে।
নোট অব ডিসেন্টসহ সনদ সংসদে আনা হোক
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, নোট অব ডিসেন্টসহ জুলাই সনদে সরকারের যে অবস্থান রয়েছে, সেগুলোসহ পুরো বিষয়টি সংসদে আনা উচিত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ সংসদে জুলাই সনদকে ‘অন্তহীন প্রতারণার দলিল’ বলেছেন- এমন প্রসঙ্গ তুলে মিলন বলেন, যারা ওই দলিলে স্বাক্ষর করেছেন, তারাই যদি সেটিকে প্রতারণার দলিল বলেন, তাহলে বিষয়টি জনগণই বিচার করবেন। তবে এ নিয়ে অর্থহীন বিতর্কে যেতে চান না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার পটভূমি
রাজনৈতিক দলগুলোর দীর্ঘ আন্দোলনের পর ১৯৯৬ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত করে। পরে ২০১১ সালে সংবিধানের সংশোধনীর মাধ্যমে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার এই ব্যবস্থা বাতিল করে।
বর্তমানে জুলাই জাতীয় সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে যে রাজনৈতিক ঐকমত্যের কাঠামো তৈরি হয়েছে, সেটিকে সংবিধানে কিভাবে কার্যকর রূপ দেয়া হবে, সেটিই বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রধান প্রশ্ন।
বিশেষ কমিটি এক দিকে বিভিন্ন পক্ষের মতামত নেয়ার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে, অন্য দিকে বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষগুলোর অংশগ্রহণ ও নোট অব ডিসেন্টের বিষয়গুলো কিভাবে সংসদীয় প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। ফলে জুলাই সনদের রাজনৈতিক ঐকমত্যকে সাংবিধানিক ও সংসদীয় কাঠামোয় রূপ দেয়ার ক্ষেত্রে পরবর্তী আলোচনা ও সিদ্ধান্তগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

দেশ রূপান্তর
দেশ রূপান্তরের প্রথম পাতার শিরোনাম ‘বড় বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেল বাংলাদেশ স্যাটেলাইট।’ প্রতিবেদনে বলা হয়, অল্পের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেয়েছে বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট বিএস-১। মহাকাশে দ্রুতগতির একটি স্পেস ডেভরিস (মহাকাশ বর্জ্য) বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১-এর দিকে ছুটে প্রায় ৮৫২ মিটার কাছে চলে এসেছিল। আঘাত করলেই সর্বনাশ! নাসার স্পেস ট্র্যাকার থেকে পাওয়া বার্তা অনুযায়ী অত্যন্ত সতর্কতা ও দক্ষতার সঙ্গে একেবারে শেষ মুহূর্তে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা ওই স্পেস ডেভরিসের আঘাত থেকে বিএস-১-কে রক্ষা করতে সক্ষম হন।

স্পেস ডেভরিস বা মহাকাশ বর্জ্য হলো বিভিন্ন সময়ে মহাকাশে নিয়ন্ত্রণ হারানো বিভিন্ন দেশের স্যাটেলাইটের ছোট-বড় ভগ্নাংশ। মহাকাশে মধ্যাকর্ষণ ও বিপরীত ঊর্ধ্বমুখী বলের ভারসাম্যের কারণে এমন হাজারো স্পেস ডেভরিস মহাকাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
ঘটনাটি গত ২৩ আগস্টের। ওইদিন সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে নাসা থেকে বার্তা আসে, একটি দ্রুতগতির স্পেস ডেভরিস বিএস-১-এর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। নাসা তার স্পেস ট্র্যাকার থেকে সংকেত পেয়ে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল)-এর প্রকৌশল টিমকে ওই তথ্য শেয়ার করে জানায়, স্পেস ডেভরিসটি পরের আধা বেলার (১২ ঘণ্টারও কম) মধ্যে ৮৫২ মিটার কাছে চলে আসতে পারে। বিএস-১-কে তা আঘাত করলে বড় বিপর্যয় হতে পারে বলেও জানায় নাসা। চুক্তি অনুযায়ী নাসা প্রতি দুই (২) ঘণ্টা পর বিএস-১-এর নিরাপত্তাসম্পর্কিত আপডেট দিয়ে থাকে। তবে, ওইদিন সর্বশেষ বার্তাটি ছিল ‘আর্জেন্ট’ ও সতর্কতামূলক।

গত ৫ অক্টোবর বিএসসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মুহাম্মদ ইমাদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটি ছিল একটি চরম সংকটাপন্ন মুহূর্ত। সময় কম, ডেভরিসের আঘাত এড়াতে হলে আমাদের বিএস-১-কে সরাতে হবে। ৮৫২ মিটার কাছে মানে এটি ছিল এনিওয়ানস গেম (জীবন-মৃত্যুর লড়াই)। গাজীপুরে আমাদের গ্রাউন্ড ইঞ্জিনিয়াররা শেষমুহূর্তে এ কাজটি সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। আমাদের স্যাটেলাইট সামনে-পেছনে বা ডানে সরিয়ে নেওয়ার উপায় ছিল না। এটি বাঁয়ে সরাতে গেলে অন্য একটি সক্রিয় স্যাটেলাইটের কাছাকাছি চলে যায়। তাই ওই মুহূর্তে স্যাটেলাইট মুভমেন্ট করার সিদ্ধান্ত কার্যকরী করা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। এদিকে সময় যত গড়িয়ে যেতে থাকে ডেভরিসটি আরও কাছাকাছি চলে আসে। অতঃপর আমাদের প্রকৌশলীরা দক্ষতার সঙ্গে বিএস-১-কে সামান্য বাঁয়ে সরিয়ে নিয়ে চলমান ওই ডেভরিস অতিক্রম করা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে থাকেন। ওই মুহূর্তটি ছিল ভয়, আতঙ্ক ও উত্তেজনাপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত ডেভরিসটি আমাদের স্যাটেলাইট অতিক্রম করে যায় এবং আমরা শঙ্কামুক্ত হই। পরে আবারও আমাদের স্যাটেলাইট আগের জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়।’

প্রতিদিনের বাংলাদেশ
নতুন আরও ১০ উড়োজাহাজ কিনছে সরকার। প্রতিদিনের বাংলাদেশ এর খবর। এতে বলা হয়, বোয়িংয়ের পর এবার ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কিনছে সরকার। এজন্য রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও এয়ারবাসের মধ্যে বুধবার চুক্তি সই হবে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, রাজধানীর একটি হোটেলে বুধবার ‘স্প্রেডিং আওয়ার উইংস টুগেদার’ শিরোনামে চুক্তি সই অনুষ্ঠান হবে। তবে ১০টি উড়োজাহাজ কিনতে মোট কত অর্থ ব্যয় হবে, সে বিষয়ে এখনও কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি বিমান কিংবা এয়ারবাস।

প্রস্তাবিত চুক্তির আওতায় এয়ারবাস থেকে চারটি এ৩৫০-৯০০ এবং ছয়টি এ৩২১নিও উড়োজাহাজ কিনবে বিমান। এর মধ্যে প্রশস্ত কাঠামোর এ৩৫০-৯০০ উড়োজাহাজ দূরপাল্লার আন্তর্জাতিক রুটে এবং সরু কাঠামোর এ৩২১নিও আঞ্চলিক ও মাঝারি দূরত্বের রুটে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এয়ারবাসের উড়োজাহাজ সরবরাহ শুরু হতে পারে ২০৩৩ সালে। পর্যায়ক্রমে ২০৩৬ বা ২০৩৭ সাল পর্যন্ত এসব উড়োজাহাজ বিমানের বহরে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তির আগে চলতি বছর মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে মোট ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে বিমান। গত ৩০ এপ্রিল প্রথম দফায় প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হয়। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর মূল্য প্রায় ৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। চুক্তির আওতায় রয়েছে আটটি ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি ৭৮৭-৯ এবং চারটি ৭৩৭-৮ উড়োজাহাজ।

এরপর গত ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে নিউইয়র্কে বোয়িংয়ের সঙ্গে আরও ১১টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি সই হয়। এর মধ্যে রয়েছে পাঁচটি ৭৮৭-১০ এবং ছয়টি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ সরবরাহ শুরু হতে পারে ২০৩১ সালে। সব উড়োজাহাজ পেতে সময় লাগতে পারে ১১ থেকে ১২ বছর। চুক্তি সই হলেও উড়োজাহাজগুলোর পুরো মূল্য এখনই পরিশোধ করতে হবে না বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।