আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে পানি সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বেসরকারি সংস্থা প্রসপার গ্লোবালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাবুলই হতে পারে আধুনিক বিশ্বের প্রথম বড় শহর, যেখানে পানি ফুরিয়ে যাবে। পরিস্থিতি বর্তমান ধারায় চললে ২০৩০ সালের মধ্যেই সেই দিন আসতে পারে। তবে শহরের বহু বাসিন্দার জন্য সেই ‘ডে জিরো’ এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। খবর সিএনএনের।
কাবুলের খায়ের খানার বাসিন্দা ৩৪ বছর বয়সী শাজিয়া তিন সন্তান ও স্বামীকে নিয়ে থাকেন। তাদের বাড়িতে পানির সংযোগ নেই। পানির ট্যাংকার থেকে পানি কেনার সামর্থ্যও নেই। প্রতিদিন সন্তানদের নিয়ে স্থানীয় মসজিদে গিয়ে হ্যান্ডপাম্প থেকে পানি সংগ্রহ করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হয়। এরপর ভারী বালতি নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয় শাজিয়াকে।
তিনি বলেন, ‘পিঠে ব্যথা হয়। স্কুল শেষে সন্তানদের এভাবে টেনে নিয়ে বের হতে আমার ভালো লাগে না। কিন্তু আমাদের কোনো উপায় নেই।’
কাবুলে ভূগর্ভস্থ পানিই প্রধান পানির উৎস। শহরের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ এর ওপর নির্ভরশীল, আর মাত্র এক-পঞ্চমাংশ বাসিন্দার পাইপলাইনের পানি রয়েছে। কিন্তু গত এক দশকে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রায় ১০০ ফুট নিচে নেমে গেছে। শহরের প্রায় অর্ধেক গভীর নলকূপ ইতিমধ্যে শুকিয়ে গেছে।
দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনও সংকটকে তীব্র করছে। আফগানিস্তান টানা ছয় বছর খরার মধ্যে রয়েছে। গত বছরের শেষ দিকে দেশটিতে তুষারপাত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। ২০১৪ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে তুষারপাত কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ।
এ ছাড়া কাবুলের জনসংখ্যাও দ্রুত বেড়েছে। ২০০১ সালে শহরটিতে ১০ লাখেরও কম মানুষ বাস করত। বর্তমানে সেই সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ। শহরটিতে পানি সংকটের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছেন দরিদ্ররা।
বিশ্লেষকদের হিসাবে, কাবুলের দরিদ্র পরিবারগুলো আয়ের ৩০ শতাংশ পর্যন্ত পানি কিনতে ব্যয় করছে। অথচ জাতিসংঘের হিসাবে, পরিবারের আয়ের ৩ শতাংশ বা তার কম পানি বাবদ খরচ হওয়াকে সহনীয় ধরা হয়।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শহরটির অনেক এলাকার ভূগর্ভস্থ পানিও দূষিত। পয়োনিষ্কাশনের বর্জ্য ও আর্সেনিকসহ বিভিন্ন পদার্থের কারণে বড় অংশের পানি পান অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
কাবুলের পরিস্থিতিকে ‘মানবিক বিপর্যয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি, পরিবেশ ও স্বাস্থ্যবিষয়ক ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ ফাইজি। তিনি বলেন, সংকট মোকাবিলায় সময় খুবই কম।
পরিস্থিতি সামাল দিতে শাহতুত বাঁধ নির্মাণ এবং পানশির নদী থেকে ১২৪ মাইল পাইপলাইনের মাধ্যমে কাবুলে পানি আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এসব প্রকল্প এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। নির্মাণ শুরু হলেও পানি সরবরাহ চালু করতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।
কাবুলের পানি সংকট তাই শুধু একটি শহরের সমস্যা নয়। জলবায়ু পরিবর্তন ও দ্রুত নগরায়ণের কারণে বিশ্বের আরও অনেক শহর একই ধরনের ‘ডে জিরো’র দিকে এগোচ্ছে।
কাবুলের বাসিন্দা সাইদ আগা বলেন, ‘বহু বছর আগে আমরা বোমা ও রকেট থেকে বাঁচতে কাবুল থেকে পালাচ্ছিলাম। এখন পানির অভাবের কারণে হয়তো আবার পালাতে হবে।’
‘ডে জিরো’ হলো এমন একটি সংকটময় সময়, যখন কোনো শহর বা অঞ্চলের পানির উৎস এতটাই শুকিয়ে যায় বা পানির স্তর এত নিচে নেমে যায় যে বাসিন্দাদের পাইপলাইনের মাধ্যমে স্বাভাবিক পানি সরবরাহ করা আর সম্ভব হয় না।
