মুন্সীগঞ্জে সাংবাদিকের পিতাকে অপহরণ করে ২ লাখ টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে রাজিব হোসেন অপুসহ উপজেলা যুবদলের দুই নেতার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় সোমবার মধ্যরাতে মুন্সীগঞ্জ সদর থানায় মামলা হয়। এরপর দু’জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সেই সঙ্গে উদ্ধার করা হয়েছে চাঁদার ২ লাখ টাকা। অভিযুক্ত রাজিব হোসেন অপু মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক। এ ঘটনায় মঙ্গলবার দুপুরে তাদের দু’জনকে যুবদল থেকে বহিষ্কার করা হয়। ভুক্তভোগী কাজীর নাম মো. হাবিবুর রহমান (৫২)। তিনি মুন্সীগঞ্জ শহরের কাটাখালী এলাকায় বসবাস করেন।
সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তসলিমউদ্দিন মানবজমিনকে বলেন, চাঁদাবাজির ঘটনায় সোমবার দিবাগত রাত ১২টার পর রাজিব অপুসহ তিনজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৪-৫ জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। ভুক্তভোগী কাজী মো. হাবিবুর রহমান দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার নাহিদ হাসানের বাবা। ভুক্তভোগী কাজী মামলাটি করেছেন। কাজীর দুই লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। আসামিদের মধ্যে রাজিব অপুসহ দু’জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় তাদেরকে আদালতে প্রেরণ করা হয়। সদর আদালতের বিচারক সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দুরদানা রহমান তাদের জামিন নামঞ্জুর করে মঙ্গলবার বিকালে জেলহাজতে প্রেরণ করেন।
অভিযোগ ও ভুক্তভোগী সূত্র জানায়, তিনি দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর ধরে কাটাখালী এলাকায় কাজী হিসেবে নিকাহ পড়ানো ও বিবাহ নিবন্ধনের কাজ করে আসছিলেন। সোমবার দুপুর ২টার দিকে তিনি নিজ বাসায় অবস্থান করছিলেন। এ সময় রাজিব, স্বপনসহ কয়েকজন তিনটি মোটরসাইকেলে তার বাসায় এসে বিয়ে পড়ানোর কথা বলে প্রথমে কাজী অফিসে এবং পরে জোরপূর্বক মুক্তারপুরে নিয়ে যান। সেখানে একটি কক্ষে তাকে আটকে রেখে স্বপন দাবি করেন, তার স্ত্রী ইতি (২৫) গত ১লা অক্টোবর কাজী হাবিবুর রহমানের অফিসে বসে তাকে তালাক দিয়েছেন এবং তিনি ওই তালাক নিবন্ধন করেছেন। এরপর অভিযুক্তরা তাকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে ২ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। লিখিত অভিযোগে ভুক্তভোগী হাবিবুর রহমান বলেন, সেখানে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে তাঁর লাইসেন্স বাতিল এবং প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হয়। নিজের প্রাণ রক্ষায় তিনি টাকা দিতে রাজি হন। পরে অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি, মুন্সীগঞ্জ শাখায় নিজের হিসাব থেকে ২ লাখ টাকা উত্তোলন করেন। এরপর স্ত্রী নাসিমা বেগমের উপস্থিতিতে অভিযুক্তদের টাকা দেয়ার পর তাকে ছেড়ে দেয়া হয়।
হাবিবুর রহমানের ছেলে মানবজমিন পত্রিকার মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার নাহিদ হাসান বলেন, বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয়। আমাকে বলা হয়, আমরা যেন বিষয়টি মেনে নেই। তারা টাকা দিয়ে দিয়েছে এবং ভবিষ্যতে আমার বাবার কাজী অফিসের দিকে তাকাবে না। একইসঙ্গে মামলা করলে পরবর্তীতে কী হতে পারে তা নিয়েও আমাকে ভয় দেখানো হয়। তবে আমি বিচারের জন্য মামলা করেছি। আমি কারও রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে কথা বলতে চাই না। আমি শুধু চাই আমার বাবাকে অপহরণ করে ভয় দেখিয়ে টাকা নেয়ার যে অভিযোগ উঠেছে, তার সুষ্ঠু তদন্ত হোক এবং দোষীদের বিচার করা হোক। তিনি বলেন, রাজিব হোসেন অপুদের একটি বড় সিন্ডিকেট রয়েছে। ওই সিন্ডিকেটে যুবদল, ছাত্রদল ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা রয়েছেন। বাবাকে তুলে নিয়ে প্রথমে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করা হয়েছিল।
পরে দর-কষাকষির মাধ্যমে দুই লাখ টাকা দিতে বলা হয়। টাকা আদায়ের পর তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। পরে রাত ১০টার দিকে মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামানের পরামর্শে থানায় যান তিনি। কিছু সময় পর অপু থানায় উপস্থিত হয়ে দুই লাখ টাকা নেয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। পরে ওসির সহযোগিতায় ওই টাকা উদ্ধার হয়। সাংবাদিক পরিবার হওয়ার পর আমাদের সঙ্গেই যেসব ঘটনা ঘটল, সাধারণ মানুষের সঙ্গে কী ঘটে, সেটা অনুমান করা যায়। আমরা ভুক্তভোগী হয়েছি, আর কেউ না হোক। তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনার দাবি জানাই।
মুন্সীগঞ্জ জেলা যুবদলের সভাপতি সোহেল আহমেদ বলেন, কোনো চাঁদাবাজ দুষ্কৃতকারীর ঠাঁই যুবদলে হবে না। তাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তাদেরকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে সদর থানা অফিসার ইনচার্জ মো. তছলিম উদ্দিন বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে রাজিব ও স্বপণকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদেরকে মঙ্গলবার বিকালে আদালত থেকে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
