ক্ষমতায় এলে অভিবাসন ব্যবস্থায় নজিরবিহীন কাটছাঁটের ঘোষণা দিয়েছে অস্ট্রেলিয়ায় বিরোধী লিবারেল-ন্যাশনাল কোয়ালিশন। প্রথম দুই বছরে নিট বিদেশি অভিবাসন বা ওভারসিজ মাইগ্রেশন কমিয়ে বছরে ১ লাখে নামানোর পরিকল্পনা করেছে বিরোধী জোট। তৃতীয় বছরে এ সংখ্যা হবে ১ লাখ ৩০ হাজার এবং চতুর্থ বছরে ১ লাখ ৬০ হাজার।
বিরোধী দলীয় নেতা অ্যাঙ্গাস টেলর মঙ্গলবার এ পরিকল্পনা ঘোষণা করে একে দেশের ইতিহাসে অভিবাসন খাতে সবচেয়ে বড় সংকোচন বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর দাবি, পুরো পরিকল্পনাটি ফেডারেল বাজেটের ওপর নিরপেক্ষ প্রভাব ফেলবে। তবে অভিবাসনের এত বড় সংকোচন অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতি, শ্রমবাজার ও জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে কী প্রভাব ফেলবে, সে বিষয়ে কোনো গাণিতিক মডেল বা বিশ্লেষণ প্রকাশ করেনি কোয়ালিশন।
মার্চ পর্যন্ত এক বছরে দেশটির নিট অভিবাসন ২ লাখ ৯২ হাজার ১০০-তে নেমেছে। বিপরীতে লেবার সরকার চলতি অর্থবছরে ২ লাখ ৪৫ হাজার এবং পরবর্তী অর্থবছরে ২ লাখ ২৫ হাজারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
কোয়ালিশনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আগামী চার বছরে অস্ট্রেলিয়ার অস্থায়ী অভিবাসীর সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার কমবে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসছে ব্রিজিং ভিসায়। নতুন ভিসার জন্য আবেদন করতে অস্থায়ী ভিসাধারীদের অধিকাংশকেই অস্ট্রেলিয়া ছাড়তে হবে। এতে ব্রিজিং ভিসার সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ১৪ হাজার থেকে কমিয়ে মাত্র ২০ হাজারে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। দেশের ভেতরে আশ্রয়ের আবেদন করতে চাওয়া ব্যক্তিদের জন্য ৩০ দিনের সময়সীমাও নির্ধারণ করা হবে।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ বাড়ছে। নতুন শিক্ষার্থী ভিসা বছরে ২ লাখ ৪০ হাজারে সীমিত করা হবে। অধিকাংশ শিক্ষার্থীর সঙ্গে নির্ভরশীলদের অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশের সুযোগও সংকুচিত হবে। পিএইচডি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা বিষয়ে ডিগ্রিধারী এবং আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু ব্যতিক্রম থাকলেও সাধারণভাবে টেম্পোরারি গ্র্যাজুয়েট ভিসা বাতিলের পরিকল্পনা করেছে কোয়ালিশন।
অভিবাসন কমালেও দক্ষ কর্মী নেওয়ার পরিমাণ বাড়ানোর কথা জানিয়েছে বিরোধী জোট। বছরে অতিরিক্ত প্রায় ৬০ হাজার অস্থায়ী দক্ষ ভিসা এবং বড় প্রকল্পের জন্য ১৫ হাজার নতুন দক্ষ প্রকল্প ভিসা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
অকাস ও ফাইভ আইজভুক্ত দেশগুলোর জন্য মেধা ও উদ্ভাবনভিত্তিক ভিসার সংখ্যা দ্বিগুণ করে ৭ হাজার করা হবে। স্থায়ী অভিবাসনের ক্ষেত্রে বয়স, আয়, ইংরেজি দক্ষতা ও দক্ষ জীবনসঙ্গীর মতো বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। নির্মাণ খাতে শ্রমিক সংকট মোকাবিলা এবং আঞ্চলিক এলাকায় নিয়োগকর্তা-স্পনসরড কর্মী আনার বিষয়েও অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
অ্যাঙ্গাস টেলরের ভাষায়, মহামারির পর কয়েক বছর রেকর্ডসংখ্যক অভিবাসী আসার পর অস্ট্রেলিয়ার এখন ‘ব্রিদিং স্পেস’ প্রয়োজন। তাঁর মন্তব্য, ‘অস্ট্রেলিয়াকে হতে হবে একটি বাড়ি বা আবাসস্থল, কোনো হোটেল নয়।’
তাঁর দাবি, একজন শিক্ষার্থী বা অস্থায়ী গ্র্যাজুয়েট ভিসাধারী গড়ে ৭ হাজার থেকে ১৪ হাজার ডলার কর দেন। অন্যদিকে অস্থায়ী দক্ষ ভিসাধারীর করের পরিমাণ ৩০ হাজার ডলারের বেশি। এই পার্থক্যকে তিনি দক্ষ অভিবাসন বাড়ানোর পক্ষে ‘সহজ’ গাণিতিক হিসাব হিসেবে তুলে ধরেছেন। তবে পুরো পরিকল্পনার অর্থনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে কোনো মডেলিং প্রকাশ করা হয়নি। ২০২৮ সালের ফেডারেল নির্বাচনের কাছাকাছি সময়ে এ নীতির সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাব প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কোয়ালিশন। অভিবাসন কমানোর পাশাপাশি মানবিক কর্মসূচির আওতাও সংকুচিত করতে চায় কোয়ালিশন। ২০২৮ সালে ক্ষমতায় এলে শরণার্থী ও মানবিক ভিসা বছরে ২০ হাজার থেকে কমিয়ে ১০ হাজারে নামানোর ঘোষণা দিয়েছে তারা।
বিরোধী দলীয় জোটের এ সিদ্ধান্তে গভীর হতাশা প্রকাশ করেছে রিফিউজি কাউন্সিল অব অস্ট্রেলিয়া (RCOA)।
সংগঠনটির সহ-প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পল পাওয়ার বলেন, শরণার্থী কোটা কমানো লিবারেল পার্টির ৭৫ বছরেরও বেশি সময়ের মানবিক কর্মসূচির ঐতিহ্যের পরিপন্থী। তাঁর মতে, গত ২০ বছরে অস্ট্রেলিয়ার মোট অভিবাসনের মাত্র ৬ শতাংশ মানবিক কর্মসূচির আওতায় এসেছে। তাই কোটা কমানোয় সামগ্রিক অভিবাসনে বড় প্রভাব না পড়লেও নিরাপত্তার জন্য মরিয়া শরণার্থীদের ওপর এর প্রভাব হবে ‘ভয়াবহ’।
পল পাওয়ার বলেন, বিশ্বজুড়ে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে। বিশেষ করে এশিয়ার শরণার্থীদের জন্য নিরাপদ ও বৈধ পুনর্বাসনের সুযোগ কমে যাওয়ায় এই সিদ্ধান্ত তাদের ঝুঁকি আরও বাড়াবে। ১০ হাজারের মানবিক ভিসার কোটা প্রয়োজনে বাড়ানো যাবে—এমন যুক্তিরও সমালোচনা করেন তিনি।
তিনি সতর্ক করে বলেন, মানবিক কর্মসূচি সংকুচিত করার সিদ্ধান্ত শরণার্থী আশ্রয় দেওয়া এশীয় দেশগুলোর কাছে ভুল বার্তা পাঠাবে এবং শরণার্থীদের সুরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল করতে পারে। বহু-সাংস্কৃতিক শহুরে আসনে সমর্থন ফেরাতে এই নীতি লিবারেল পার্টিকে কতটা সহায়তা করবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে RCOA।
পল পাওয়ার আরও বলেন, ভোটাররা দেখবেন এই নীতি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আবাসন সংকট মোকাবিলার অংশ, নাকি অভিবাসনবিরোধী ও বৈষম্যমূলক রাজনীতির দিকে ফেরার ইঙ্গিত। তাঁর মতে, অস্ট্রেলিয়ার বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে ইতিবাচক আলোচনা, সাবেক শরণার্থী ও অভিবাসীদের সাফল্যের গল্প এবং অসহিষ্ণু ও অভিবাসীবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে স্পষ্ট দূরত্ব জরুরি।
ক্ষমতায় গেলে অস্ট্রেলিয়ায় শরণার্থী কোটা অর্ধেক, শিক্ষার্থী ও ব্রিজিং ভিসায় কঠোরতার ঘোষণা বিরোধী জোটের
আলমগীর হোসেন রুহেল, সিডনি (অস্ট্রেলিয়া) থেকে
অনলাইন
৫৪ মিনিট আগে
৬ অক্টোবর (মঙ্গলবার), ২০২৬, ১ঃ২৬ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
