সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডাদেশ পেয়েছেন ২৪ বছর বয়সী শ্রীলঙ্কান অভিবাসী তরুণ আনোজান সিভারাসা। ফেসবুকে ইসলাম ধর্ম ও মহানবী (সা.)-কে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করার অভিযোগে তাকে এই দণ্ড দেয়া হয়। দেশটির একটি আপিল আদালত শরিয়াহ আইনের আওতায় এ রায় দেন। এ রায় ঘোষণার পর শ্রীলঙ্কাজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। কান্নায় ভেঙে পড়ে ছেলের জীবন ভিক্ষা চেয়েছেন মা রাসমণিকম যোগলক্ষ্মী। একই সঙ্গে আদালতের মৃত্যুদণ্ড রদ করে আনোজানের দেশে ফেরার পথ তৈরি করতে সর্বোচ্চ কূটনৈতিক চেষ্টা শুরু করেছে শ্রীলঙ্কা সরকার। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।
এই ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে শ্রীলঙ্কার অভ্যন্তরীণ একটি ধর্মীয় বিতর্ক। গত জুন মাসের শেষের দিকে শ্রীলঙ্কায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পদযাত্রার পেছনে যাওয়া একটি কুকুরকে এক মুসলিম তরুণের লাথি মারার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে অনলাইনে দুই পক্ষের মধ্যে চরম বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। বিতর্কের একপর্যায়ে এক ব্যবহারকারী সনাতন ধর্মের এক দেবতাকে নিয়ে কটূক্তি করলে ক্ষিপ্ত হয়ে তামিল ভাষায় মহানবী (সা.)-কে অবমাননা করে পাল্টা মন্তব্য লিখে বসেন আনোজান। পরে নিজের ভুল বুঝতে পেরে তিনি দ্রুত মন্তব্যটি মুছে ফেলেন এবং একটি ভিডিওর মাধ্যমে প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। কিন্তু ততক্ষণে শ্রীলঙ্কা থেকেই সেই মন্তব্যের স্ক্রিনশট নিয়ে সৌদি আরবে তার কর্মস্থলে ইমেইল পাঠিয়ে দেয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি সৌদি পুলিশকে জানালে গত জুলাই মাসে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তার সব ডিভাইস জব্দ করে অ্যাকাউন্ট মুছে দেয়া হয়।
গ্রেপ্তারের পর শুরুতে আল-আহসা ফৌজদারি আদালত সাইবার অপরাধ আইনের আওতায় আনোজানকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং ৩০ লাখ সৌদি রিয়াল (প্রায় আট লাখ ডলার) জরিমানা করেন। তবে সাজা কমানোর আবেদন নামঞ্জুর হওয়ার পর গত ১৭ই সেপ্টেম্বর সৌদি প্রসিকিউশন সাইবার আইনের বদলে ইসলামি শরিয়াহ আইনে বিচারের আপিল করে। আপিল আদালত সেই যুক্তি গ্রহণ করে আগের রায় বাতিল করে সরাসরি মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। গত ২৮শে সেপ্টেম্বর থেকে আনোজানের সঙ্গে পরিবারের সব যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। সাধারণত দেশটিতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ফোন ব্যবহারের সুবিধা কেড়ে নেয়া হয় এবং আগে থেকে পরিবার বা দূতাবাসকে না জানিয়েই আকস্মিকভাবে রায় কার্যকর করার নজির রয়েছে সৌদিতে।
এ ঘটনা সামনে আসার পর শ্রীলঙ্কায় নজিরবিহীন ধর্মীয় সম্প্রীতি ও রাষ্ট্রীয় তৎপরতা দেখা গেছে। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের শীর্ষ ধর্মীয় গুরুরা (রামান্না ও অমরাপুরা নিকায়) হিন্দু নেতাদের সঙ্গে যৌথভাবে প্রেসিডেন্ট সচিবালয়ে গিয়ে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিশানায়েকে সম্প্রতি আনোজানের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কূটনৈতিক মাধ্যমে সাধারণ ক্ষমা পাওয়ার চেষ্টার আশ্বাস দিয়েছেন। এমনকি সৌদি আরবের দুটি আইনি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে আপিল পর্যালোচনার কৌশল ঠিক করতে চার সদস্যের একটি লঙ্কান আইনজীবী দল বর্তমানে সৌদি সফরে রয়েছে।
সৌদি আরবে সামাজিক মাধ্যমে মতপ্রকাশের দায়ে মৃত্যুদণ্ড বা চরম দণ্ড দেয়ার ঘটনা নতুন নয়। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মতে, দেশটিতে এক কোটিরও বেশি বিদেশি কর্মী রয়েছেন, যারা ভাষা ও আইনি দুর্বলতার কারণে প্রায়ই ন্যায্য বিচার থেকে বঞ্চিত হন। এর আগে ২০২৩ সালে এক্স এ সামান্য কয়েকটি পোস্টের জন্য মোহাম্মদ আল-গামদি নামের এক অবসরপ্রাপ্ত সৌদি শিক্ষককে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল। এ নিয়ে তীব্র সমালোচনার পর সাজা কমিয়ে ৩০ বছর কারাদণ্ড করা হয়। তবে মাদক বা হত্যাকাণ্ডের তুলনায় দেশটিতে ধর্ম অবমাননার দায়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা অনেকটাই বিরল।
