মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের শক্তিমত্তা কত?

গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার ইনডেক্স

মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের শক্তিমত্তা কত?

ফন্ট সাইজ:

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সংঘাতের আঁচ ছড়িয়েছে আশেপাশের দেশগুলোতেও। ইরান একা যেমন হামলা চালিয়েছে গাল্ফের দেশগুলোতে তেমনি সক্রিয় হয়েছে তার প্রক্সি বাহিনীগুলো। এতে বড় ধাক্কা লেগেছে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে। আঞ্চলিক শক্তিকে পুনরায় সংহত করতে সক্রিয় হচ্ছে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সমন্বয়ে গঠিত ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’। অতিদ্রুতই সৌদিতে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান ও তুরস্ক। এতে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে এই জোটের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে।

গত ৭ই আগস্ট সৌদির পবিত্র নগরী মক্কায় স্বাক্ষরিত এ চুক্তিতে অংশ নেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার ইনডেক্স ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, এই তিন সদস্য দেশের সম্মিলিত বার্ষিক সামরিক ব্যয় প্রায় ১২ হাজার ৪৪০ কোটি ডলার। এর মধ্যে সৌদির প্রতিরক্ষা বাজেট সবচেয়ে বেশি— ৬ হাজার ৩৯০ কোটি ডলার, তুরস্কের ৫ হাজার ১৪০ কোটি ডলার এবং পাকিস্তানের ৯১০ কোটি ডলার। সামরিক জনবলের দিক থেকেও এই জোট বেশ সমীহ জাগানিয়া। তিন দেশের মোট নিয়মিত সক্রিয় সেনাসদস্যের সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ, যেখানে সর্বোচ্চ ৬ লাখ ৬০ হাজার সক্রিয় সেনা নিয়ে শীর্ষে রয়েছে পাকিস্তান। এছাড়া তুরস্কের ৪ লাখ ৮১ হাজার এবং সৌদি আরবের রয়েছে ২ লাখ ৪৭ হাজার নিয়মিত সেনা।

জোটের আকাশসীমা সুরক্ষায় যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার ও প্রশিক্ষণ বিমান মিলিয়ে তিন দেশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মোট ৩ হাজার ৪১৫টি সামরিক উড়োজাহাজ। এর মধ্যে পাকিস্তানের ১ হাজার ৩৯৭টি, তুরস্কের ১ হাজার ১০১টি এবং সৌদির রয়েছে ৯১৭টি যুদ্ধবিমান। স্থলভাগে এই তিন শক্তির অধীনে রয়েছে ৬ হাজার ৪৬টি ট্যাংক এবং ১ লাখ ৭৯ হাজারের বেশি সাঁজোয়া যান। ট্যাংক বহরে পাকিস্তানের সংখ্যা ২ হাজার ৬৭৭টি, তুরস্কের ২ হাজার ২৮৪টি এবং সৌদি আরবের রয়েছে ১ হাজার ৮৫টি। সমুদ্রসীমায় জোটের সম্মিলিত নৌবহরে রয়েছে মোট ৩৪৪টি যুদ্ধজাহাজ ও নৌযান। যার মধ্যে ৩৩টি ফ্রিগেট, ২৪টি কর্ভেট এবং ২২টি সাবমেরিন অন্তর্ভুক্ত।

নৌ শক্তিতে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা তুরস্কের রয়েছে ১৯২টি নৌযান, পাকিস্তানের ১২০টি এবং সৌদি আরবের রয়েছে ৩২টি। পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র পাকিস্তান, ন্যাটো সদস্য তুরস্কের ড্রোন ও আধুনিক সামরিক প্রযুক্তি এবং সৌদি আরবের অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের সমন্বয় এই জোটকে অঞ্চলের অন্যতম পরাশক্তিতে রূপ দেয়ার সক্ষমতা রাখে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে সৌদি আরবের ওপর হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ জানিয়েছিলেন, সৌদি আরবের ওপর কোনো ধরনের অযাচিত আগ্রাসন বা ইয়েমেন সংকটের প্রভাব সৌদিতে পড়লে নিশ্চিতভাবেই মক্কা চুক্তি কার্যকর করা হবে।

এতদিন পর্যন্ত মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা বজায় রাখার স্বার্থে তুরস্ক ও পাকিস্তান কোনো সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেয়া থেকে বিরত ছিল। তবে সৌদি আরবের তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে হুতিদের নতুন দফার হামলা পরিস্থিতিকে চুক্তি বাস্তবায়নের দিকে ঠেলে দিয়েছে। গাল্ফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের গবেষক আব্দুল আজিজ আলঘাশিয়ান জানান, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হুতিদের আক্রমণ ও উসকানি এই সামরিক জোটের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া আরও ত্বরান্বিত করেছে। তার মতে, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি কেবল একটি চুক্তি নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের ফাঁকা কথার ‘আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোকে’ এবার একটি বাস্তব সামরিক রূপ দিতে চলেছে, যা এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতির ইতিহাসে একটি অত্যন্ত সংকটময় ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়।

সূত্র: আল জাজিরা, গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার ইনডেক্স