কবিরহাটে মৎস্য খামারি ও যুবদলের কর্মী মিজানুর রহমান রনি হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী সব আসামিকে দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে নিহতের পরিবার। একইসঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের ফাঁসির দাবিও করেছেন তারা।
গতকাল জেলা শহর মাইজদীর টাউন হল মোড়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে নিহত যুবদল কর্মী মিজানুর রহমান রনির পরিবারের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন তার মা লাইলী বেগম, স্ত্রী সীমা আক্তার, মামা মোশাররফ হোসেন ও বোন শ্রাবণী আক্তার।
নিহতের পরিবার ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, মিজানুর রহমান রনি কবিরহাট উপজেলার নরোত্তমপুর ইউনিয়নের কালিরহাট বাজার এলাকার মৃত মো. শহিদ উল্লার ছেলে। তিনি মাছের প্রজেক্ট ও মুরগির খামারের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং স্থানীয় ইউনিয়ন যুবদলের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। এলাকায় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালানো, ফসলি জমির মাটি বিক্রি ও জমি-জমা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে আওয়ামী সরকার পতনের পর তার বিরোধ দেখা দেয়।
সংবাদ সম্মেলনে পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক কারণে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয় এবং তিনি কারাগারে ছিলেন।
৫ই আগস্টের পর কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি এলাকায় ফিরে আসেন। ওই সময় কবিরহাট উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব মো. আব্দুল বাছেত হিরণ ও নরোত্তমপুর ইউনিয়ন বিএনপি’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক এনামুল হক মাসুদসহ কয়েকজন বিএনপি’র নাম ব্যবহার করে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাটি কাটা ও সালিশ-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন। পরিবারের দাবি, এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করতেন মিজানুর রহমান রনি। এমনকি স্থানীয় বিএনপি কার্যালয়েও কথিত ‘হাইব্রিড বিএনপি’র বিরুদ্ধে তিনি বক্তব্য দেন। এ কারণে হিরণ ও মাসুদসহ একটি পক্ষ তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, গত ১০ই জানুয়ারি জমি নিয়ে বিরোধের জেরে রনির শ্বশুর ও শ্যালক আরাফাত হোসেন ওরফে জামালের সঙ্গে একই এলাকার নূর মোহাম্মদ ওরফে বাচ্চুর বিরোধ সৃষ্টি হয়। পরে বিরোধ মীমাংসার কথা বলে তাদের ডেকে নিয়ে মারধর করা হলে তারা গুরুতর আহত হন। এ ঘটনার প্রতিবাদ করায় রনির সঙ্গে অভিযুক্তদের বিরোধ আরও বেড়ে যায়।
তারা জানান, ১৭ই জানুয়ারি সন্ধ্যায় অজ্ঞাতনামা দুই ব্যক্তি মাছের প্রজেক্টের কাজের কথা বলে রনিকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায়। ওই দিন রাত ৯টা ৫৯ মিনিটের দিকে রনির ভায়রা আবু তাহেরকে ফোন করে মাসুদ হুমকি দেন বলে অভিযোগ করা হয়। রনিকে কোনো ধরনের বাধা দিতে নিষেধ না করলে তাকে হত্যা করে লাশ গুম করার হুমকি দেয়া হয় বলেও সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, রনির মাছের প্রজেক্টের স্ট্যাম্প এনামুল হক মাসুদের কাছে ছিল। ওই স্ট্যাম্প ফেরত চাওয়া এবং তা ফেরত না দিলে বিনিয়োগ করা ১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা ফেরত দেয়ার দাবি করাকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়।
একপর্যায়ে স্থানীয় ‘আলেম’ নামের এক ব্যক্তি রনিকে মারধর করেন। পরিবারের দাবি, মারধরের পর প্রাণ বাঁচাতে রনি কালিরহাট বাজারের পেছনের উত্তর পাশের সড়কের দিকে দৌড়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় পূর্বপরিকল্পিতভাবে হিরণ ও মাসুদের যোগসাজশে একটি পক্ষ তার মাথা ও মুখমণ্ডলে এলোপাতাড়ি আঘাত করে। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পরে ঘটনাটিকে গণপিটুনি হিসেবে প্রচার করা হয়। তাদের আরও দাবি, রনির মাথা ও মুখমণ্ডল ছাড়া শরীরের অন্য কোথাও আঘাতের চিহ্ন ছিল না। এমনকি তার পরনের শার্টের বোতামও ছেঁড়া ছিল না। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী সীমা আক্তার বাদী হয়ে ১৯শে জানুয়ারি কবিরহাট থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। সংবাদ সম্মেলনে নিহতের পরিবারের সদস্যরা হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান। একইসঙ্গে আব্দুল বাছেত হিরণ ও এনামুল হক মাসুদসহ হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা এবং আদালতের মাধ্যমে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।
অভিযোগ অস্বীকার করে নরোত্তমপুর ইউনিয়ন বিএনপি’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক এনামুল হক মাসুদ বলেন, ‘ভুক্তভোগী পরিবারের আইনি আশ্রয় নেয়ার অধিকার আছে। তবে আমার বিরুদ্ধে করা অভিযোগ মিথ্যা।’
কবিরহাট উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব মো. আব্দুল বাছেত হিরণ বলেন, ‘এ ঘটনায় আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আমি চেয়ারম্যান প্রার্থী। একটি পক্ষ রাজনৈতিক ফায়দা নিতে এসব মিথ্যা অভিযোগ উত্থাপন করাচ্ছে।’ এ বিষয়ে কবিরহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রোমেল বড়ুয়া বলেন, মামলাটি বর্তমানে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তদন্ত করছে। তদন্ত শেষে তারা আইনগত ব্যবস্থা নেবেন।
