যুগান্তরের শিরোনাম - রাজনীতিতে নতুন উদ্বেগ। এতে বলা হয়, ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার সাম্প্রতিক মতপার্থক্য ও দ্বন্দ্বে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে ফেরার হুমকির মধ্যে যেখানে দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ থাকার কথা, সেখানে বিরোধ ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। কারণ, জামায়াত ও এনসিপির নেতৃত্বে একের পর এক লংমার্চ কর্মসূচি পালন অব্যাহত আছে।
একই সঙ্গে দলগুলোর নেতাদের পালটাপালটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে এই উত্তাপ ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই গণ-অভ্যুত্থানে পরাজিত আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের ‘সমঝোতা’ হয়েছে বলে গুঞ্জন ছড়িয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তির মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি হলে পরাজিত শক্তি তার সুযোগ নিতে পারে। তারা কেউ কেউ সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সংলাপেরও পরামর্শ দিয়েছেন।
ইমেরিটাস অধ্যাপক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আনোয়ারউল্লাহ্ চৌধুরী মনে করেন, অশুভ আঁতাতকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তবে ক্ষমতাসীন দলকে অবশ্যই আরও সতর্ক ও কৌশলী হতে হবে। তিনি বলেন, যুদ্ধের সময়ও যেমন কৌশলগত সংলাপ চলে, সরকারকে ঠিক তেমনই বিরোধী দলের সঙ্গে সংসদীয় রীতিতে সমঝোতার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাতে হবে। একই সঙ্গে বিরোধী দলগুলোকে সঙ্গে নিয়েই রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সংশোধনমূলক কাজগুলো সম্পন্ন করতে হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো দ্বন্দ্বে জড়ালে দেশের সবার ক্ষতি। সুশাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে অতীতে যে অন্যায়, অবিচার, অপকর্ম হয়েছে; সেগুলো অব্যাহত থাকলে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হব। বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে নাগরিকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় বিএনপি ব্যর্থ হলে জামায়াত বা আওয়ামী লীগ আসতে পারে। যদিও আওয়ামী লীগের আসার কোনো সম্ভাবনা আমি দেখছি না। তাই আমি বলব, সরকার ও বিরোধী দল নিজেদের মধ্যে সংলাপে বসে বিদ্যমান সমস্যা সমাধান করুক। তা না হলে পরিণতি হলো অরাজকতা এবং এর মাশুল দেবে বাংলাদেশের জনগণ। আমাদের রাজনীতিকদের দূরদর্শিতা, তাদের অপরিপক্বতা ও সীমাবদ্ধতার জন্যই আমরা অস্বস্তির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।
বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো জানাচ্ছে, জামায়াতের সঙ্গে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ‘সমঝোতার’ গুঞ্জনে দল দুটির মধ্যে সন্দেহ-অবিশ্বাস কিছুটা বেড়েছে। যদিও বিষয়টি নিয়ে জামায়াত নেতারা ভিন্নকথা বলছেন। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার যুগান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক ঢাকতে গিয়ে জামায়াতের বিরুদ্ধে সখ্য রাখার অপপ্রচার চালাচ্ছে বিএনপি।
বৃহস্পতিবার ফেনীতে এক অনুষ্ঠানে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ক্ষমতাচ্যুত বিগত সরকারের অনুসারী ও একটি ‘গুপ্ত বাহিনী’ জনগণের কল্যাণে সরকারের কর্মসূচিগুলোকে বাধাগ্রস্ত করতে আবারও হাত মিলিয়েছে। দেশে অরাজকতা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। ‘গুপ্ত রাজনীতি’ ও ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচার সরকারের রাজনীতির বিরুদ্ধে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা এর সঙ্গে জড়িত, জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনে তাদের কোনো কর্মসূচি নেই; বরং তারা কেবল ক্ষমতা দখলের রাজনীতিতেই লিপ্ত।
সূত্রমতে, নির্বাচনের মাত্র সাত মাস যেতে-না-যেতেই জামায়াত ও এনসিপির লংমার্চ কর্মসূচি নিয়েও বিএনপি ক্ষুব্ধ। তাছাড়া সরকারের মেয়াদের এত অল্প সময়ের মধ্যে লংমার্চ কর্মসূচি নিয়ে সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক মহলেও নানা আলোচনা আছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন-এত কম সময়ের মধ্যে লংমার্চের মতো বড় কর্মসূচি দেওয়া হলে ভবিষ্যতে তারা আর কী ধরনের কর্মসূচি পালন করবে? তাছাড়া অব্যাহত কর্মসূচির কারণে নতুন করে দেশ অচল হয়ে পড়লে পরিস্থিতি কী দাঁড়াতে পারে, তা নিয়েও চলছে নানা আলোচনা।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ দেশে অরাজকতাই চাচ্ছে। অথচ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী প্রত্যাশা ছিল, সরকার ও বিরোধী দলগুলো পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বজায় রেখে দায়িত্বশীল রাজনীতির চর্চা করবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুরুতে সে ধরনের বেশকিছু ইতিবাচক উদাহরণও সৃষ্টি করেছিলেন। কিন্তু জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ নানা ইস্যুতে দলগুলোর মধ্যকার দূরত্ব এখন সুস্পষ্ট। যদিও বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে সদ্ভাব বজায় রেখে চলার কথা বলছে বিএনপি। কিন্তু এখন পর্যন্ত দলগুলোর মধ্যে নতুন করে কোনো পারস্পরিক বৈঠকের বা আলাপের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। তবে বিএনপির একটি বড় অংশের মতে, সব রাজনৈতিক দলকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং সমঝোতার ভিত্তিতে দেশ পরিচালনাই বর্তমান সরকারের জন্য টেকসই সুফল বয়ে আনবে।
ড. আনোয়ারউল্লাহ্ চৌধুরী বলেন, একটি কার্যকর সংসদীয় গণতান্ত্রিক সমাজে সংসদেই বিরোধী দলের গঠনমূলক সমালোচনা করার কথা। সরকারের বয়স মাত্র ৬-৭ মাস হওয়ার পরেই রাজপথে নামার কোনো যৌক্তিকতা নেই। সব ধরনের বিরোধ ও মতপার্থক্য জাতীয় সংসদে আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমেই সমাধান করা সম্ভব। কিন্তু সেটি না করে জামায়াত অন্য পথে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, গুপ্ত বলতে আমরা যাদের বুঝি, তারা যদি গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচারী শক্তির সঙ্গে ঐক্য করে, তাহলে দুটোই ডুববে। বাংলাদেশের জনগণ তাদের কখনোই মেনে নেবে না। জনগণ দূর ভবিষ্যতেও এ দেশে স্বৈরাচারী শক্তি বা হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের পুনরুত্থান দেখতে চায় না। এই ধরনের অশুভ আঁতাত সফল হবে না।
জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা প্রশ্নে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল যুগান্তরকে বলেন, কারও সঙ্গে দ্বন্দ্ব কিংবা সমঝোতার প্রশ্ন তো তখন আসে, যখন তার আসল চরিত্রটা বোঝা যায়। জামায়াতের আসল চরিত্র বোঝা মুশকিল। অতীতে তারা বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনের বন্ধু হয়েও আকস্মিক অবস্থান পরিবর্তন করেছে। ১৯৮৬ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপিকে না জানিয়ে হঠাৎ আওয়ামী লীগের সঙ্গে নির্বাচনে যায়।
তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকারকে হটাতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমান্তরালভাবে রাজপথে আন্দোলন করে। ১৯৯১ সালের পর দীর্ঘদিন বিএনপির পাশে থেকে ২০০১ সালে মন্ত্রিসভায় যোগ দেয়। অথচ এক-এগারোর পর আবার বিএনপির দায় নিতে অস্বীকার করে।
আলাল বলেন, ঘন ঘন দিক পরিবর্তনকারী দলকে বোঝা কঠিন বিধায় তাদের সঙ্গে সমঝোতা বা দ্বন্দ্ব-উভয় ক্ষেত্রেই গভীর বিশ্লেষণের প্রয়োজন। জামায়াত যদি সঠিক বিরোধী দলের ভূমিকা পালন না করে এবং এভাবে দিক বদলাতে থাকে, তবে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগও তাদের পুরোপুরি বিশ্বাস করবে না।
জাতীয় সংসদের হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু যুগান্তরকে বলেন, ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল এবং পরবর্তী বিভিন্ন সময় বিএনপির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও জাতীয় পার্টি একত্রে আন্দোলন করেছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অনেক জায়গায় জামায়াত ও আওয়ামী লীগ একত্রিত হয়ে আমার বিরুদ্ধে নির্বাচন করেছে।
তিনি বলেন, ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও অর্জিত গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য জামায়াতের সচেতন থাকা উচিত। জামায়াতে ইসলামী যেন কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদের সঙ্গে হাত না মেলায়। কারণ ফ্যাসিবাদের সঙ্গে সমঝোতা করলে রক্তের বিনিময়ে অর্জিত গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা বিপন্ন হবে এবং ফ্যাসিস্টরাই এতে লাভবান হবে।
এদিকে জামায়াতের সূত্রগুলো জানাচ্ছে, মূলত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন প্রশ্নে সরকারের সঙ্গে দলটির মতদ্বৈধতা রয়েছে। এছাড়া সরকারকে চাপে ফেলে তারা আরও কিছু দাবি আদায় করতে চায়। পাশাপাশি সরকারের ব্যর্থতার চিত্র জনমনে তুলে ধরে আগামী নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার পথও তৈরি করার কৌশল নিয়েছে দলটি।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার শনিবার যুগান্তরকে বলেন, বিএনপি তাদের ভারতপ্রীতি, দিল্লিপ্রীতি ঢাকতে গিয়ে অসত্য কথা বলছে। প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনার আওয়ামী লীগ সারা দেশে একদিনে মিছিল করার সুযোগ পায় কী করে? প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন এলাকায় নিষিদ্ধ দল মিছিল করার দুঃসাহস কীভাবে পায়? মানুষ কি বোঝে না? সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার কাছে কি খবর নেই?
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ঐক্য ধরে রাখতে চাইলে সরকার যদি কোনো উদ্যোগ নেয় জামায়াত সহযোগিতা করবে। তবে আওয়ামী লীগের ভোট নিয়ে ক্ষমতায় এসে তারা সেটা করবে কিনা সে সন্দেহ তো রয়েই যায়।
এনসিপি যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার শনিবার যুগান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগকে বিএনপিই আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে। আমরা বলেছি, সরকারকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে, চাঁদাবাজি, দখলদারি বন্ধ করতে হবে। তাহলে আমরা সরকারকে সহযোগিতা করব। কিন্তু সরকার সেটা না করে বিরোধী দলের মোকাবিলায় আওয়ামী লীগকে সঙ্গে নিচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের সব টার্মিনাল যাচ্ছে বিদেশিদের হাতে। আজকের পত্রিকার শিরোনাম এটি। এতে বলা হয়, দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম বন্দরের সব কনটেইনার টার্মিনাল একে একে চলে যাচ্ছে বিদেশি অপারেটরদের হাতে। চারটি টার্মিনাল বিদেশিদের কাছে ইতিমধ্যে দেওয়া বা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হওয়ার পর এখন চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি), জেনারেল কার্গো বার্থ এবং বে পোর্ট-মাল্টিপারপাস টার্মিনাল—এই তিনটিতেও বিদেশি অপারেটর নিয়োগ দেওয়া নিয়ে আলোচনা চলছে।
পতেঙ্গা, লালদিয়ার চর ও পানগাঁও আইসিডি—এই তিন টার্মিনালে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ আগেই দেওয়া সম্পন্ন হয়েছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার উচ্চপর্যায়ের সভায় আলোচিত নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে (এনসিটি) বিদেশি অপারেটর নিয়োগের বিষয়টি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে টার্মিনালগুলো হস্তান্তরের তীব্র বিরোধিতাকারী সংগঠনগুলো নতুন করে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে। বন্দর, কাস্টমস ও প্রেসক্লাব এলাকায় শ্রমিক-কর্মচারীরা একের পর এক কর্মসূচি নিচ্ছেন।
নৌপরিবহনসচিব জাকারিয়া গত শুক্রবার মোবাইল ফোনে আজকের পত্রিকাকে বলেন, বন্দরের টার্মিনালগুলোতে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ সরকারের নিয়মিত কাজ। সরকার ইতিমধ্যে তিনটি টার্মিনালে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ দিয়েছে। ইতিমধ্যে পতেঙ্গা টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অপারেশনে চলে গেছে। ডিসেম্বরে পানগাঁও আইসিডি পুরোদমে অপারেশনে যাবে। এখন আরও তিনটি টার্মিনালে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের বিষয়ে আলোচনা চলছে।
নৌপরিবহনসচিব বলেন, বিদেশি অপারেটরের মাধ্যমে টার্মিনাল পরিচালিত হলে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বন্দরের সক্ষমতা আরও বেড়ে যাবে এবং শ্রমিকেরা আন্তর্জাতিক মানের সুবিধা পাবে।
তবে সক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়ে শ্রমিক নেতারা সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন।
১৫ বছরের জন্য এনসিটি
গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ড (ওসিওয়াই) পিপিপির আওতায় পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ১৫ বছরের জন্য আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটরের কাছে দেওয়ার বিষয়টি নীতিগতভাবে অনুমোদন করে সরকার। অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রকল্প প্রোফাইলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই সরকারের মনোনীত অপারেটর হিসেবে ডিপি ওয়ার্ল্ডের নাম রয়েছে। কমিটির বৈঠকে স্বাক্ষরিতব্য কনসেশন চুক্তির খসড়া উপস্থাপন করা হয়।
প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় ৪৪% করেছে এনসিটি। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রে এটি এককভাবে সবচেয়ে বড় টার্মিনাল।
তিনটির বিষয়ে আগ্রহী সৌদি প্রতিষ্ঠান
বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, সৌদি আরবভিত্তিক রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনাল (আরএসজিটিআই) ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি), জেনারেল কার্গো বার্থ এবং বে পোর্ট-মাল্টিপারপাস টার্মিনাল পরিচালনা করতে আগ্রহ দেখিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৮ সেপ্টেম্বর নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে আরএসজিটিআইকে টার্মিনাল তিনটির অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে অনুরোধ করা হয়।
এ বিষয়ে বন্দর সচিব সৈয়দ কেফায়েত হামিম বলেন, ‘এগুলো যেহেতু সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ব্যাপার, তাই আমি কোনো মন্তব্য করছি না।’
ইউনূস সরকারের এক দিনে দুই চুক্তি
এর আগে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর এক দিনেই লালদিয়ার চর ও পানগাঁও টার্মিনাল পরিচালনার জন্য ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস এবং সুইজারল্যান্ডের মেডলগকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানীর অদূরে কেরানীগঞ্জে অবস্থিত পানগাঁও টার্মিনালের বার্ষিক হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টিইইউয়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যের চাহিদা মেটাতে মেডলগ টার্মিনালের সুবিধা বাড়াবে।
ডেনমার্কের প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালসকে ৪৮ বছরের কথা মাথায় রেখে নিয়োগ দেওয়া হয়। এপিএম ২০৩০ থেকে পরবর্তী ৩০ বছরের জন্য টার্মিনালটি চালাবে। মেয়াদ আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৩ সালের ৬ ডিসেম্বর নবনির্মিত পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার কাজ ২২ বছরের জন্য রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনালকে (আরএসজিটিআই) দিতে চুক্তি সই হয়।
আজকের পত্রিকার আরেকটি খবর- ট্রাম্প-প্রধানমন্ত্রীর ছবি নিয়ে অপপ্রচারের চেষ্টা চলছে: সহকারী প্রেস সচিব
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যৌথ ছবি নিয়ে একটি পক্ষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপপ্রচারের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব নাজমুল হক খান।
আজ শনিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক প্রেস নোটে তিনি এ কথা জানান। প্রেস নোটে সহকারী প্রেস সচিব বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে উপস্থিত বিশ্বনেতা ও তাঁদের সহধর্মিণীদের সম্মানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক নৈশভোজ ও রিসেপশনের আয়োজন করেন। আজ শনিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানের ওই রিসেপশনে অংশগ্রহণের একটি ছবি হোয়াইট হাউস থেকে ঢাকা কার্যালয়ে পাঠানো হয় এবং পরবর্তীতে তা জনসাধারণের জন্য প্রকাশ করা হয়।
কিন্তু রিসেপশনের এই প্রকাশিত ছবি নিয়ে একটি পক্ষ অপপ্রচার শুরু করেছে। মূল ছবিটিকে মিথ্যা প্রমাণের চেষ্টা করতে এর সঙ্গে একটি এআই-জেনারেটেড ছবি যুক্ত করা হয়েছে।
প্রেস নোটে ব্যাখ্যা করে বলা হয়, এআই-জেনারেটেড ওই বিকৃত ছবিতে কসোভোর প্রধানমন্ত্রী আলবিন কুর্তির সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি ছবিকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, যেখানে ট্রাম্পকে একটি কার্ডবোর্ডের কাটআউট বা প্রতিকৃতি হিসেবে দেখানো হয়। অপপ্রচারকারীরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অরিজিনাল ছবিটিকে মিথ্যা দাবি করে এআই-জেনারেটেড ওই ছবিটিকে সত্য বলে চালানোর অপচেষ্টা করছে।
সহকারী প্রেস সচিব আরও জানান, আলবেনিয়াভিত্তিক সংবাদ ও বিশ্লেষণধর্মী বিশ্বস্ত মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম Pamfleti.net-এ গত ২ অক্টোবর প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে কসোভোর প্রধানমন্ত্রীর কথিত ওই ছবিটি যাচাই-বাছাই করে এটিকে পুরোপুরি এআই-জেনারেটেড ও ম্যানিপুলেটেড বলে নিশ্চিত করা হয়েছিল।
অতএব, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে যে ছবিটিকে আগেই এআই-জেনারেটেড বলে প্রমাণ করা হয়েছে, সেই একই ভুয়া ছবিকে ব্যবহার করে জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ডা. জুবাইদা রহমানের উপস্থিতির আসল ছবিটিকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে প্রেস নোটে উল্লেখ করা হয়।
ইত্তেফাকের একটি শিরোনাম - এশিয়ার উত্থান,বাংলাদেশের সামনে নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ:রেহমান সোবহান। এতে বলা হয়, বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্র ক্রমেই এশিয়ার দিকে সরে আসছে। চীন ও ভারতের মতো বড় অর্থনীতির উত্থানের ফলে এশিয়ায় বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি বিনিময় বাড়ছে। এ পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য বড় অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে বলে মনে করেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান।
গতকাল শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬’-এর এক অধিবেশনে তিনি এসব কথা বলেন।
রেহমান সোবহান বলেন, চীন ও ভারতের প্রতিবেশী হওয়ায় বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে এ দুই দেশের বিশাল বাজার ও সরবরাহব্যবস্থার সুযোগ বাংলাদেশ এখনো পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। রপ্তানির বাজার কয়েকটি দেশের মধ্যে সীমিত থাকলেও বাংলাদেশের আমদানি ও মূলধনের বড় অংশ এশিয়া থেকে আসে।
তার মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে এশিয়ার আঞ্চলিক সরবরাহশৃঙ্খল ও বাজারের সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হতে হবে। একই সঙ্গে রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
রেহমান সোবহান বলেন, দীর্ঘদিন বিশ্ব অর্থনীতিতে পশ্চিমা দেশগুলোর প্রভাব বেশি থাকলেও এশিয়ার অর্থনৈতিক সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে। চীন এখন অনেক দেশের বড় বাণিজ্য অংশীদার হওয়ার পাশাপাশি ঋণ, বিনিয়োগ ও মূলধনের গুরুত্বপূর্ণ উত্স হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তি, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেও চীনের সক্ষমতা বাড়ছে।
এশিয়ার উত্থানের কারণে পশ্চিমা দেশগুলোর বাণিজ্যনীতিতেও পরিবর্তন
এসেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। শুল্কসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক নীতি এখন কৌশলগত ও রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এর ফলে বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় নতুন ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তবে এশিয়ার অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার ক্ষেত্রে ভারত ও চীনের মধ্যকার সম্পর্ককে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন রেহমান সোবহান। তার মতে, দুই দেশের সহযোগিতা বাড়লে পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাড়বে। এই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশও চীন ও ভারতের বাজার, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের সুযোগ কাজে লাগিয়ে অর্থনীতির বহুমুখীকরণে এগোতে পারে।
দেশ রূপান্তরের শিরোনাম- ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অন্যতম ভিত্তি বঙ্গোপসাগর- বিওবিসি উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী।
খবরে বলা হয়, বঙ্গোপসাগরকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলকে এমন একটি এলাকায় পরিণত করার আহ্বান জানিয়েছেন, যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্র একসঙ্গে বিকশিত হবে, পারস্পরিক সমান সুবিধা গ্রহণ করবে এবং নাগরিকরা অর্থবহ সহযোগিতার হাত প্রসারিত করবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে তার যথাযথ ভূমিকা পালনে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে গতকাল শনিবার সকালে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) আয়োজনে তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন (বিওবিসি) ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘ফ্র্যাগমেন্টস, ফ্রন্টিয়ার্স অ্যান্ড ফিউচারস : নেভিগেটিং পাওয়ার, টেকনোলজি অ্যান্ড ট্রাস্ট ইন আ ওয়ার্ল্ড রিরিটেন’। সম্মেলন আগামীকাল সোমবার পর্যন্ত চলবে। এতে শতাধিক দেশের প্রায় ২০০ জন বক্তা, ৩০০ জনের বেশি প্রতিনিধি এবং এক হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী যোগ দিচ্ছেন।
সম্মেলনে সার্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বরিস তাদিচ, মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ এবং মালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী মুসা মারাসহ বিভিন্ন দেশের সাবেক ও বর্তমান রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা, কূটনীতিক, নীতিনির্ধারক, গবেষক, ব্যবসায়ী, প্রযুক্তিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা অংশ নিয়েছেন। সংলাপের বিভিন্ন অধিবেশনে বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক রূপান্তর, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তি, গণতন্ত্র, সুশাসন এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ এখনো প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো মিয়ানমারে তাদের দ্রুত, স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা।’
এ জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত রাজনৈতিক সমর্থন ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘একইসঙ্গে সংকটের মূল কারণগুলোরও সমাধান করতে হবে। যে সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, তার সমাপ্তিও হতে হবে মিয়ানমারেই।’
বঙ্গোপসাগরকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণে ভূমিকা রেখে চলেছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে সমুদ্রবন্দর, নৌপথ ও উপকূলীয় অর্থনীতির মাধ্যমে বিশ্বের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। জাহাজ চলাচল, মৎস্যসম্পদ, পর্যটন, জ্বালানি এবং আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থায় অপার সম্ভাবনা রয়েছে। আঞ্চলিকভাবে অভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানকে অভিন্ন সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করতে হলে আরও গভীর দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘বাণিজ্য, জ্বালানি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, জলবায়ু ও সমুদ্র খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারিত করা সম্ভব। নতুন বাজার উন্মুক্ত করার পাশাপাশি তরুণদের জন্য আরও সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে। সমতা, ন্যায্যতা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে আমরা আরও শক্তিশালী সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারি।’
বাংলাদেশ সংলাপ, অংশীদারত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে বিশ্বাসী উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি বাংলাদেশ তার সব আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে কাজ করে যাবে। কারণ, শান্তি ও সম্প্রীতিই যৌথ সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের মূল ভিত্তি।’
প্রধানমন্ত্রী বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলকে এমন একটি এলাকায় পরিণত করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্র একসঙ্গে বিকশিত হবে, পারস্পরিক সমান সুবিধা গ্রহণ করবে এবং নাগরিকরা অর্থবহ সহযোগিতার হাত প্রসারিত করবে। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে তার যথাযথ ভূমিকা পালনে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।’
সিজিএস আয়োজিত এবারের বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের পাঁচটি মূল আলোচ্য বিষয় হলো ভূরাজনীতি, নিরাপত্তা ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবারস্পেস ও তথ্যক্ষমতা; বাণিজ্য, সংযোগ ও কৌশলগত প্রবৃদ্ধি; জলবায়ু, সহনশীলতা ও মানবনিরাপত্তা।
জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে দায়িত্ব পাওয়া নতুন সরকার আগামী পাঁচ বছরে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বলে সম্মেলনে জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা, নীতিমালার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার আমাদের অগ্রাধিকার। আমরা এখন প্রতিশ্রুতি থেকে সরাসরি বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশকে বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করার পাশাপাশি শক্তিশালী উৎপাদন ও বিনিয়োগের কেন্দ্রে রূপান্তরিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উৎপাদন, সেবা, রপ্তানিসহ সব খাতে আমরা ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চাই। বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতিগত নিশ্চয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালার ধারাবাহিকতাই বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনীয় নিশ্চয়তা দেবে।’
তিনি বলেন, সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষ অগ্রাধিকার পান। ‘ফ্যামিলি কার্ডের’ মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারের মায়ের হাতে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে। এ কর্মসূচি শুরু হবে সবচেয়ে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে দিয়ে। ‘কৃষক কার্ড’ কৃষকদের সরকারি প্রণোদনা, কৃষিসেবা ও বাজারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করবে। ‘হেলথ কার্ড’ সবার জন্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করবে। চূড়ান্তভাবে ‘ইউনিভার্সেল কার্ডের’ মাধ্যমে নাগরিকরা এক ছাতার নিচে সমন্বিত সরকারি সেবা গ্রহণ করতে পারবেন।’
স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার এক লাখ স্বাস্থ্যসেবাকর্মী নিয়োগে কাজ করছে, যাদের প্রায় ৮০ শতাংশই নারী হবেন। তারা তৃণমূল পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা, স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় রেফারেল সেবা দেবেন। মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায়ও সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।’
শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শিক্ষা শুধু সনদ অর্জনের জন্য নয়, শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত করারও মাধ্যম হতে হবে। আমরা আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিতে কাজ করছি। শিশুদের চরিত্র গঠনে পাঠ্যক্রমে সংস্কৃতি, খেলাধুলা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে। শিক্ষার্থীদের তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ দেওয়া এবং সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার ঘটানো হবে।’
শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার প্রথম শ্রেণি থেকেই বিনামূল্যে ইউনিফর্ম, স্কুলব্যাগ, মিড-ডে মিল ও বৃত্তি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। একইসঙ্গে স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষার পরিধি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘সরকার ভাষাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, প্রযুক্তিগত রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও স্টার্টআপগুলোকে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। আমরা চাই, আমাদের তরুণরা বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতা করুক এবং ব্রেইন ড্রেনকে ব্রেইন সার্কুলেশনে রূপান্তর করুক।’
কৃষিকে অর্থনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রযুক্তি, সেচ, কৃষি অর্থায়ন ও কৃষিপণ্যের বাজারসংযোগ আরও সহজলভ্য করা হচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলপথ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগ কৃষি খাতকে সহায়তা করার পাশাপাশি জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।’
পরিবেশ সুরক্ষায় সরকারের পরিকল্পনার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ করা হবে। সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণের পাশাপাশি বর্জ্য পুনর্ব্যবহার ও পরিবেশবান্ধব গ্রিন ফ্যাক্টরি স্থাপনে বাংলাদেশ অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি লিড সার্টিফায়েড ফ্যাক্টরির মধ্যে ৫৩টিই এখন বাংলাদেশে রয়েছে। পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব শহর গড়ে তোলার মাধ্যমে বর্জ্য হ্রাস, জলবায়ু সহনশীলতা অর্জন এবং দেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করা সম্ভব।’
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, আইনের শাসনসহ বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা হবে, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশের জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকবে।’
সিজিএসের প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর পারভেজ করিম আব্বাসী। অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান, বিমানমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ, সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন, স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
নিজ বাসভবনে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিলেন জাতীয় গ্রিডে : নিজ বাসভবনে উৎপাদিত সৌর বিদ্যুৎ থেকে জাতীয় গ্রিডে ১২০০ ইউনিট দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল শনিবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে সমবায় ভবনে দেশের সব উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও ডিডির (এলজি) অংশগ্রহণে ‘সৌরবিদ্যুৎ, ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও উন্নয়ন কর্মসূচি পর্যালোচনা সভা’য় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এ কথা জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে শুধু ঘোষণা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকেননি। ইতিমধ্যে রাজধানীর গুলশানের নিজ বাসভবনের ছাদে সৌর প্যানেলে উৎপাদিত বিদ্যুৎ থেকে এক হাজার ইউনিট নিজে ব্যবহার করেছেন এবং জাতীয় গ্রিডে ১২০০ ইউনিট দিয়েছেন।’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘গত তিন দিনে এই পরিমাণ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহার করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী। সমবায় ভবন থেকে শুরু করে সব জাতীয় ভবনের ছাদ ব্যবহার করে নিজস্ব চাহিদা পূরণের পাশাপাশি সরকারকে সৌর বিদ্যুৎ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়াকে ব্যবসা হিসেবে দেখা হচ্ছে।’
কালের কণ্ঠের শিরোনাম- হাসপাতালের ৬২ শতাংশ অক্সিজেন প্লান্ট অচল।
খবরে বলা হয়, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ৯৯টি অক্সিজেন প্লান্টের মধ্যে ৬১টি অকার্যকর। বর্তমানে ৩৮টি চালু।
অর্থাৎ ৬২ শতাংশ অক্সিজেন প্লান্ট অকার্যকর। এতে সিলিন্ডার বা তরল অক্সিজেন কিনতে সরকারকে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে।
গতকাল শনিবার রাজধানীর ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশে (আইইউবি) শুরু হওয়া দুই দিনের ‘বাংলাদেশ অক্সিজেন সামিট ২০২৬’-এর প্রথম দিন উপস্থাপিত একাধিক পর্যালোচনায় সরকারি হাসপাতালের অক্সিজেন ব্যবস্থার এ চিত্র উঠে এসেছে। আয়োজনে রয়েছে বাংলাদেশ অক্সিজেন নেটওয়ার্ক, আইইউবি ও ইমপ্লিমেন্টেশন অ্যান্ড পপুলেশন সায়েন্স।
সম্মেলনে ‘ফ্রম অক্সিজেন প্লান্টস টু রিলায়েবল অ্যাকসেস’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউনাইটেড নেশনস অফিস ফর প্রজেক্ট সার্ভিসেস (ইউএনওপিএস) বাংলাদেশের সিনিয়র অ্যানালিস্ট মারুফ হাসান। তাঁর উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৪টি জেলা হাসপাতাল, ২৮টি বিশেষায়িত হাসপাতাল ও সাতটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট ৯৯টি প্রেসার সুইং অ্যাডজর্পশন (পিএসএ) ও ভ্যাকুয়াম সুইং অ্যাডজর্পশন (ভিএসএ) অক্সিজেন প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকার নিজস্ব রাজস্ব খাত থেকে ৪০টি এবং বাংলাদেশ সরকার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণে ৩০টি—মোট ৭০টি প্লান্ট কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) মাধ্যমে ঠিকাদারদের দিয়ে সরকারি হাসপাতালে স্থাপন করে। মূল্যায়নে দেখা যায়, সিএমএসডির মাধ্যমে স্থাপিত ৭০টি প্লান্টের মাত্র ৯টি বর্তমানে চালু।
বাকি ৬১টির মধ্যে ৩১টি কারিগরিভাবে অচল এবং ৩০টি সচল থাকলেও নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে না। অন্যদিকে ইউএনওপিএস সরাসরি নকশা, নির্মাণ ও চালুর দায়িত্ব নিয়ে স্থাপন করা ২৯টি প্লান্টই বর্তমানে কার্যকর ও চালু রয়েছে।
কেন এত প্লান্ট : করোনা মহামারির সময় দেশের হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেনের সংকট দেখা দিলে কভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস (ইআরপিপি) প্রকল্পের আওতায় এসব অক্সিজেন জেনারেটর প্লান্ট স্থাপন করে সরকার। হাসপাতালে এসব অক্সিজেন প্লান্টে সরাসরি অক্সিজেন উৎপন্ন হয়। এ ক্ষেত্রে সিলিন্ডার বা তরল অক্সিজেন সরবরাহের প্রয়োজন হয় না।
প্লান্টগুলো মূলত দুই পদ্ধতিতে কাজ করে। প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে বাতাস থেকে অক্সিজেন আলাদা করা যায়। আবার বাতাসকে প্রসারিত করে অক্সিজেন আলাদা করা যায়। একটি পিএসএ, অন্যটি ভিএসএ। সরকারের পরিকল্পনা ছিল একটি অক্সিজেন প্লান্ট থেকে প্রতি মিনিটে ৫০০ লিটার পর্যন্ত অক্সিজেন উৎপাদন করা। পরে এই অক্সিজেন দিয়ে কমপক্ষে ৫০ রোগীকে মিনিটে ১০ লিটার নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহ করা।
প্লান্ট চালানোর লোক নেই : সরকারি প্লান্টগুলো সেবার বাইরে থাকার পেছনে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে দক্ষ জনবল ও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি। সিএমএসডির অধীনে থাকা সাতটি প্লান্ট এখনো হাসপাতালের কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হয়নি। স্থায়ী বাজেট ও কারিগরি টেকনিশিয়ান না থাকায় কোথাও কোথাও হাসপাতালের সাধারণ কর্মীদের দিয়েই প্লান্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। সীমিত কারিগরি জ্ঞান নিয়ে তাঁদের পক্ষে দিনে কয়েক ঘণ্টার বেশি প্লান্ট চালানো সম্ভব হচ্ছে না। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে। একই সঙ্গে প্লান্টে উৎপাদিত অক্সিজেনের বিশুদ্ধতাও চিকিৎসায় ব্যবহারের উপযোগী মাত্রার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
অক্সিজেন অবকাঠামোর সংকট এখানেই শেষ নয়। গ্লোবাল ফান্ডের অর্থায়নে স্থাপিত ২৯টি প্লান্টের কারিগরি জনবলের বেতন সহায়তার মেয়াদ গত ৩০ সেপ্টেম্বরে শেষ হয়েছে। এসব প্লান্টের রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তার মেয়াদ রয়েছে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এরপর সরকার নিজস্ব বাজেটে কারিগরি জনবল ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব না নিলে বর্তমানে সচল ২৯টি প্লান্টও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ইউএনওপিএসের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না থাকলে জাতীয় পর্যায়ের অক্সিজেন প্লান্টগুলোর ৬০ শতাংশের বেশি অচল থাকার ঝুঁকি রয়েছে।
অক্সিজেন চাহিদা ৭৫ লাখ মানুষের : ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ কমিশন অন মেডিক্যাল অক্সিজেন সিকিউরিটির কো-চেয়ার ও আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী ড. আহমেদ এহসানুর রহমান সম্মেলনের আরেক অধিবেশনে বাংলাদেশের বার্ষিক অক্সিজেনের চাহিদা নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা যায়। গুরুতর নিউমোনিয়ায় এই ঝুঁকি আরো বেশি। শরীরে অক্সিজেন কম থাকলে মৃত্যুর আশঙ্কাও প্রায় পাঁচ গুণ বেড়ে যায়। শুধু নিউমোনিয়া নয়, অপুষ্টি, সেপসিস, জরুরি চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারেও অক্সিজেন প্রয়োজন। তাই প্রয়োজনের সময় সবার জন্য সহজে ও দ্রুত মেডিক্যাল অক্সিজেন নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি বলেন, দেশে প্রতিবছর প্রায় ১৯ লাখ মানুষের জরুরি অক্সিজেন চিকিৎসার প্রয়োজন। এর বাইরে অস্ত্রোপচারের জন্য বছরে প্রায় ৫৪ লাখ এবং দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগে আক্রান্ত আরো প্রায় দুই লাখ মানুষের মেডিক্যাল অক্সিজেন প্রয়োজন হয়। তীব্র নিউমোনিয়া, হৃদরোগ, সড়ক দুর্ঘটনা বা আঘাত, সেপসিস, অপরিণত জন্ম, ডায়রিয়া, হাম-হুপিং কাশি ও ডেঙ্গুর মতো রোগের চিকিৎসায় অক্সিজেনের চাহিদা বেশি। এ ছাড়া হাঁপানি, যক্ষ্মা, এনকেফালাইটিস, টাইফয়েড, মেনিনজাইটিস ও ম্যালেরিয়ায়ও অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রয়োজনের সময় প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ মেডিক্যাল অক্সিজেন পায় না।
বিশ্বে বছরে প্রায় ৩৮ কোটি ৭৮ লাখ মানুষের চিকিৎসায় অক্সিজেন প্রয়োজন। জিবিডি ২০২১-এর হিসাবের তুলনায় নতুন হিসাবে এই সংখ্যা এক কোটি ৪২ লাখ বেশি। এর মধ্যে তীব্র রোগে ১১ কোটি ৩১ লাখ, অস্ত্রোপচারে ২৬ কোটি ৫৩ লাখ এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে ৯৩ লাখ মানুষের অক্সিজেন প্রয়োজন। দেশে প্রতিবছর মোট প্রায় দুই কোটি ৩৮ লাখ ঘনমিটার অক্সিজেনের প্রয়োজন হলেও উৎপাদন হয় প্রায় দুই কোটি ২০ লাখ ঘনমিটার। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় উৎপাদনেও ঘাটতি রয়েছে।
বড় হাসপাতালেও সক্ষমতার ঘাটতি : অক্সিজেনের চাহিদা অনুযায়ী সব হাসপাতালের প্লান্টের সক্ষমতাও যথেষ্ট নয়। মূল্যায়নে দেখা গেছে, বর্তমানে চালু ৩৮টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩১টির অক্সিজেনের চাহিদা প্রতি মিনিটে ৫০০ লিটার (এলপিএম) বা তার কম। এসব প্রতিষ্ঠানে ৫০০ এলপিএম সক্ষমতার একটি মানসম্মত প্লান্ট দিয়েই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। তবে সাতটি বড় প্রতিষ্ঠানের চাহিদা ৫০০ এলপিএমের বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানে একাধিক প্লান্ট বা বড় সক্ষমতার প্লান্টের পাশাপাশি তরল অক্সিজেনের বড় ব্যাকআপ প্রয়োজন।
সবচেয়ে বেশি অক্সিজেন ব্যবহার করছে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল—তিন হাজার ১৬৫ এলপিএম। এরপর রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এক হাজার ৭৫০, মেহেরপুর ২৫০ শয্যা হাসপাতাল এক হাজার ৫৯২, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় এক হাজার ৫৫৩, বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এক হাজার ১০০, শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, দিনাজপুর ৭৬৩ এবং কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ৭০০ এলপিএম অক্সিজেন ব্যবহার করছে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেশির ভাগ জেলা ও ২৫০ শয্যার হাসপাতালের চাহিদা ৫০০ এলপিএমের একটি প্লান্টেই পূরণ করা সম্ভব, কিন্তু বড় হাসপাতালগুলোর ক্ষেত্রে একই সক্ষমতা যথেষ্ট নয়। এসব প্রতিষ্ঠানে একাধিক প্লান্ট বা বড় সক্ষমতার প্লান্টের পাশাপাশি তরল অক্সিজেনের ব্যাকআপ রাখার প্রয়োজন হতে পারে। অর্থাৎ সমস্যা শুধু প্লান্টের সংখ্যা নয়; হাসপাতালের প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী সক্ষমতা নির্ধারণ, প্লান্ট চালানোর জনবল, রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ।
অক্সিজেন উৎপাদনেও নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি : সম্মেলনে দেশের বেসরকারি অক্সিজেন উৎপাদন ও মান নিয়ন্ত্রণ নিয়েও উদ্বেগের বিষয়টি উঠে আসে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৪৯টি অক্সিজেন প্লান্ট উৎপাদনে থাকলেও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকে মাত্র আটটি প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স নিয়েছে। মান বজায় রাখতে না পারায় একটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বন্ধ করা হয়েছে। ২০২৩ সালের ঔষধ ও কসমেটিকস আইন এবং ১৯৮২ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী অক্সিজেন একটি ওষুধ। তবে বেশির ভাগ উৎপাদক এখনো নিয়ন্ত্রনব্যবস্থার আওতার বাইরে রয়েছে।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলমগীর হোসেন বলেন, অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থায় গুণগত মান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ, মনিটরিং ও মূল্যায়নের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ও জরুরি। তিনি বলেন, অক্সিজেন প্রকল্পের শুরু থেকেই নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে যুক্ত করতে হবে। ধারণাগত নকশা থেকে বিস্তারিত কাঠামোগত নকশা পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে যাচাই প্রয়োজন। বায়োমেডিক্যাল, সিভিল ও ফার্মাসিউটিক্যাল বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কারিগরি উপকমিটিও করা যেতে পারে। অক্সিজেনের মান পরীক্ষায় কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, আর্দ্রতাসহ বিভিন্ন অমিশ্রণ নির্ধারিত মাত্রায় আছে কি না, তা পরীক্ষা করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন। এসব উপাদান নির্ধারিত মাত্রার বেশি হলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
প্রথম আলোর খবর- সরকারি ১৬ মেডিকেলে সংকট, আসছে আরও। খবরে বলা হয়, দেশের ৩৭টি সরকারি মেডিকেল কলেজের মধ্যে ১৬টিতে জমি, ভবন, শিক্ষক ও আবাসনসহ নানা সংকট রয়েছে। পাঁচটি কলেজের নিজস্ব জমি নেই, ফলে নিজস্ব ভবনও হয়নি। হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম চলছে সদর হাসপাতালের ভবনে, সীমিত শ্রেণিকক্ষ ও ল্যাব সুবিধা নিয়ে।সব কটি কলেজেই শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে। মাগুরা মেডিকেল কলেজে ৬২ শতাংশ শিক্ষক পদ খালি। পটুয়াখালীতে আবাসন না থাকায় ৬৭ জন ছাত্রী অব্যবহৃত একটি ভবনে থাকছেন। হাসপাতাল ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের সুযোগও অনেক কলেজে পর্যাপ্ত নয়।সংকটের মধ্যেই নতুন নতুন মেডিকেল কলেজ অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পর অন্তর্বর্তী সরকার এবং বর্তমান বিএনপি সরকারও নতুন কলেজ প্রতিষ্ঠার পথে এগোচ্ছে। ফলে নতুন কলেজ বাড়ানোর আগে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর সংকট দূর করা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
