ময়মনসিংহে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ জন নিহতের ঘটনায় মামলা

সবাইকে হারিয়ে স্তব্ধ মোবারক

ময়মনসিংহে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ জন নিহতের ঘটনায় মামলা

ফন্ট সাইজ:

ময়মনসিংহ নগরে যাত্রীবাহী বাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে ৭ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় মামলা হয়েছে। গত শুক্রবার রাতে জামালপুর সদর উপজেলার দড়িহামিদপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. মোবারক আলী বাদী হয়ে চালককে আসামি করে কোতোয়ালি মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। পরে রাত ১২টার পর সেটি মামলা হিসেবে রুজু হয়। ওই দুর্ঘটনায় মা, ভাই, ভাতিজি ও নাতিকে হারিয়েছেন মোবারক। এর আগে ওই দিন দুপুরে ময়মনসিংহ নগরীর রহমতপুর বাইপাস সড়কের দাপুনিয়া হাড়গুজির পাড় এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। ঢাকা থেকে জামালপুরের দিকে যাওয়া রাজীব পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে অটোরিকশায় থাকা ৭ জনই ঘটনাস্থলে মারা যান।

নিহত সাতজনই জামালপুর জেলার বাসিন্দা। এর মধ্যে একই পরিবারের চারজন। তারা হলেন, জামালপুর সদর উপজেলার দড়িহামিদপুর গ্রামের রাশিদা বেগম, তার ছেলে মোফাজ্জল হোসেন, মোফাজ্জলের মেয়ে মর্জিনা আক্তার ও মর্জিনার ছেলে মিনান। নিহত অন্য তিনজন হলেন, একই উপজেলার বীর গোবিন্দপুর গ্রামের অটোরিকশাচালক মো. সুজন আলী এবং বাদেচান্দি গ্রামের আকরাম আলী ও তার স্ত্রী মমতা বেগম। পরে গত শুক্রবার রাত ১০টার দিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ৭ জনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয় বলে জানান কোতোয়ালি মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রিপন সরকার। স্বজনেরা মরদেহ বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পর শনিবার সকালে পৃথক জানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন হয়।

এদিকে ঢাকা-জামালপুর রুটে চলাচলকারী রাজীব পরিবহনের বাসগুলো অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া চলাচলের কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হয় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। বাসচাপায় ৭ জনের মৃত্যুর প্রতিবাদ ও বিচারের দাবিতে গত শুক্রবার রাত ১০টার দিকে জামালপুর শহরের ফৌজদারি এলাকায় রাজীব পরিবহনের গায়েবানা জানাজা এবং প্রতীকী লাশ নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেন স্থানীয়রা। প্রতীকী লাশের গায়ে লেখা ছিল ‘আমি রাজীব পরিবহন, আমার আত্মার মাগফিরাত কামনা করুন’। এর আগে সড়কে ধারাবাহিক দুর্ঘটনার প্রতিবাদে সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা রাজীব বাস বন্ধের দাবিতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছিলেন।

সবাইকে হারিয়ে স্তব্ধ মোবারক: গত শুক্রবার সন্ধ্যায় দড়িহামিদপুর ভাটিপাড়া গ্রামে মোফাজ্জল হোসেনের বাড়িতে চলছিল। স্বজন হারানোর খবর পেয়ে আশপাশের গ্রামের মানুষও সেখানে আসেন। পেশায় রাজমিস্ত্রি মোফাজ্জল স্ত্রী ও এক ছেলেকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গাজীপুরের হোতাপাড়া এলাকায় থাকতেন। মা রাশিদা বেগম ও বিবাহিত মেয়ে মর্জিনাকে নিজের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য আগের দিন বাড়িতে এসেছিলেন মোফাজ্জল। গত শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মা রাশিদা, দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা মেয়ে মর্জিনা ও নাতি মিনালকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন মোফাজ্জল। নান্দিনা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ময়মনসিংহ যাওয়ার কথা ছিল তাদের। সেখান থেকে বাসে করে গাজীপুরে। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই ময়মনসিংহে বাসের চাপায় অটোরিকশাটি দুমড়েমুচড়ে যায়। এতে তারা নিহত হন। আল্লাহ, আমার পুড়ি (মেয়ে) কী করে খাবো, আমি কী করে খাওয়াবো? আমার জামাই মইরা গেছে। নাতিন আর পুতিও মইরা গেছে। সব হারাইছি। আমার সব শেষ গো, আল্লাহ গো।

জামাতা, বেয়াইন, নাতনি ও নাতনির ছেলেকে হারিয়ে বিলাপের সুরে কথাগুলো বলছিলেন রহিমা বেগম । গত শুক্রবার সকালে তাদের সবাইকে বিদায় দিয়েছেন। অথচ এর কিছুক্ষণ পরেই পান সড়ক দুর্ঘটনায় সবার মৃত্যুর খবর। তখন থেকেই স্বজনেরা তাকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু কোনোভাবেই থামছিল তার কান্না। মোবারক বলেন, নিহত ৭ জনের চার জনই আমার পরিবারের সদস্য। ওই দুর্ঘটনায় আমার মা রাশিদা বেগম, ভাই মোফাজ্জল হোসেন, মোফাজ্জলের মেয়ে মর্জিনা ও মর্জিনার পাঁচ বছর বয়সী ছেলে মিনাল মারা গেছেন।

আমার চার প্রজন্মের চারজন একসাথে চলে গেল। কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ শিবিরুল ইসলাম বলেন, দুর্ঘটনার পরপরই বাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি জব্দ করে থানায় নেয়া হয়। তবে, বাসের চালক ও সহযোগীরা পালিয়ে যান। অজ্ঞাতনামা চালকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।