নিউইয়র্কে অবস্থিত অভিজাত কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যৌন অসদাচরণ নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। সম্প্রতি এক জনশুনানিতে বিষয়টি আলোচনায় আসে। শিক্ষার্থী সোফিয়া রাইলি সিম এ সপ্তাহে কয়েকটি ক্লাসে যাননি। কারণ, ২০২৪ সালে একটি ভ্রাতৃসংঘের (ফ্র্যাটারনিটি) কয়েকজন সদস্য এক তরুণীকে ধর্ষণ করেছে। এমন অভিযোগে দায়ের করা মামলার বিষয়টি তাকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছে। একই সঙ্গে ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে সামলেছে, তা নিয়েও তিনি উদ্বিগ্ন। বৃহস্পতিবার কর্নেলের স্টুডেন্ট অ্যাসেম্বলি আয়োজিত যৌন নিপীড়নবিষয়ক এক জনশুনানিতে তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সিম বলেন, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার অভাব এবং এই মুহূর্তে কর্নেলের শিক্ষার্থীদের পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যর্থতার কারণে কর্নেল আমাদের সম্প্রদায়ের প্রতি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় নেতৃত্ব, প্রশাসক ও শিক্ষকদের কাছ থেকে অর্থবহ যোগাযোগের ঘাটতি রয়েছে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
আইভি লিগের এই বিশ্ববিদ্যালয় ঘটনাটি যেভাবে সামলেছে, তা সমর্থন করে বলেছে, তারা ব্যাপক তদন্ত চালিয়েছে এবং অভিযোগের সঙ্গে জড়িত চি ফাই ভ্রাতৃসংঘকে ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে, বহিষ্কারসহ বিভিন্ন ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কর্নেলের একটি ঐতিহাসিক ভবনে অনুষ্ঠিত এই জনশুনানি হয় অভিযোগগুলো প্রকাশ্যে আসার কয়েক দিন পর। অভিযোগগুলো প্রকাশ্যে আসে একটি দেওয়ানি মামলা দায়েরের মাধ্যমে এবং একই সময়ে ফৌজদারি তদন্ত পুনরায় শুরুর ঘোষণা দেয়া হয়।
এই ঘটনা যৌন নিপীড়নের অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কীভাবে সামলায়, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। শিক্ষার্থীরা জানতে চাইছেন, প্রচলিত প্রক্রিয়াগুলো তাদের সুরক্ষার জন্য যথেষ্ট কি না। নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের কর্মকর্তারাও বিষয়টিতে নজর দিয়েছেন। তদন্তের জন্য তারা একজন বিশেষ কৌঁসুলি নিয়োগ করেছেন।
স্টুডেন্ট অ্যাসেম্বলির শুনানিতে বক্তারা যৌন নিপীড়নের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। কেউ কেউ কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং মর্যাদাপূর্ণ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকার সমালোচনা করেন। কর্নেলের স্নাতক শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বকারী স্টুডেন্ট অ্যাসেম্বলি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সংস্থা বা কর্মকর্তার কাছে প্রস্তাব দিতে পারে। বৃহস্পতিবার তারা সর্বসম্মতিক্রমে একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। এতে তদন্ত কীভাবে পরিচালনা করা হয়েছিল, তার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ দেয়ার জন্য কর্নেল প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কী ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল, তাও প্রকাশ করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যৌন অসদাচরণ সংক্রান্ত প্রতিটি মামলার ফলাফল নিয়ে বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশেরও দাবি জানানো হয়েছে।
শুনানির আয়োজকরা কয়েক ডজন বক্তার অনেককেই পরিচয় প্রকাশ না করতে এবং তাদের বক্তব্য রেকর্ড না করতে অনুরোধ করেন। এক শিক্ষার্থী বলেন, কর্নেলে ভর্তি হওয়ার জন্য তিনি সারা জীবন পরিশ্রম করেছেন। কিন্তু এখন তার মনে হচ্ছে, সেই পরিশ্রমের মূল্য পাওয়া যায়নি। আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, নিউইয়র্কের ফিঙ্গার লেকস অঞ্চলে অবস্থিত ২ হাজার ৩০০ একর আয়তনের ক্যাম্পাসে তারা নিরাপদ বোধ করেন না। ২০২৫ সালে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালিত একটি জরিপের ফল, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে, বলছে- কর্নেলে ভর্তি হওয়ার পর ৩৫ শতাংশ স্নাতক পর্যায়ের নারী শিক্ষার্থী জোরপূর্বক বা শারীরিকভাবে অক্ষম অবস্থায় সম্মতি ছাড়া যৌন সংস্পর্শের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। ২০২১ সালে এই হার ছিল ২০ শতাংশ।
মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, ভ্রাতৃসংঘের সদস্যরা ওই তরুণীকে যৌন নিপীড়নের আগে অ্যালকোহল, গাঁজা ও কেটামিন সরবরাহ করে। একপর্যায়ে তিনি অচেতন বা অক্ষম হয়ে পড়ার পর তাকে যৌন নিপীড়ন করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। মামলায় আরও বলা হয়েছে, অভিযুক্ত কয়েকজন শিক্ষার্থীকে কর্নেল যথাযথ শাস্তি দেয়নি এবং কিছু শিক্ষার্থীকে প্রবন্ধ লিখে শাস্তি কমানোর সুযোগ দেয়া হয়। তবে কর্নেল অস্বীকার করেছে যে প্রবন্ধ লেখাই তাদের দেয়া একমাত্র শাস্তি ছিল।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস কর্নেলের অভ্যন্তরীণ নথির বরাত দিয়ে জানিয়েছে, অভিযুক্ত পুরুষরা সবাই কোনো ধরনের অন্যায় করার কথা অস্বীকার করেছেন। তাদের কেউ কেউ বলেছেন, যৌন সম্পর্কটি সম্মতিপূর্ণ ছিল। অন্যরা ঘটনার সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথাই অস্বীকার করেছেন। কর্নেলের শিক্ষার্থীরা সোমবার একটি সমাবেশের আয়োজন করেছে। এতে যৌন নিপীড়নের শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষায় আরও ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানানো হবে। পাবলিক পলিসির শিক্ষার্থী জেন ওয়াং বলেন, তিনি নিজেও বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ জানিয়েছিলেন এবং সেই প্রক্রিয়া তার মানসিক যন্ত্রণাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
