ছবির মতো বাংলাদেশ

ছবির মতো বাংলাদেশ

ফন্ট সাইজ:

‘আমাদের গ্রামখানি ছবির মতন, মাটির তলায় এর ছড়ানো রতন...’ এই কবিতাটি আমরা ছোটবেলায় পড়েছিলাম। অনেক আগে কবিতাটি লিখেছিলেন কবি বন্দে আলী মিয়া। কবি হয়তো পুরো দেশ ঘুরে দেখেননি কিন্তু তিনি তার দিব্যদৃষ্টি দিয়ে দেখেছিলেন বাংলাদেশের গ্রামের অপরূপ সৌন্দর্য। আমাদের গ্রামগুলো আসলেই অনেক সমৃদ্ধ। অন্যদেশের গ্রামের চেয়ে আমাদের গ্রামগুলো ভিন্ন। বিদেশে সাধারণত শহর থেকে বেশ দূরে গ্রামগুলোর অবস্থান হয়। কিন্তু সেই গ্রামগুলো হয় উন্নত। গ্রামে বিদ্যুৎ থাকে। বড় বড় হোটেল থাকে। বিশুদ্ধ পানি থাকে। থাকে নানারকম সুযোগ-সুবিধা। এসব গ্রামের মানুষের জীবিকার অন্যতম উৎস মাছ শিকার, কৃষিকাজ এবং নানারকম খামার করা। বাংলাদেশেও গ্রাম বলতে আমরা একসময় বুঝতাম—গ্রামের মানুষ চাষাবাদ করে, মাছ ধরে, হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগলের খামার করে। শহর জীবনের অনেক সুযোগ-সুবিধা তারা পায় না। বিদ্যুৎ পায় না, গাড়ি চলাচলের পাকা রাস্তা পায় না।

কিন্তু এখন দিন পাল্টেছে। আমাদের গ্রামগুলোর দৃশ্য এখন অনেক বদলে গেছে। গ্রামের অলিতে গলিতে পাকা রাস্তা। বিদ্যুতের আলোর ঝলকানি। নদী অঞ্চল ছাড়া এখন প্রত্যন্ত অঞ্চলেও গাড়ি নিয়ে চলে যাওয়া যায়। গ্রামেও গড়ে উঠেছে রিসোর্ট এবং পার্ক। এখানে বিনোদনের ব্যবস্থা রয়েছে। হয়তো অতি আধুনিক সুবিধা নেই কিন্তু বেশির ভাগ গ্রামেই এখন সাপ্লাই পানি পাওয়া যায়। গ্রামের বাজারে কিংবা রাস্তার মোড়ে গভীর রাত পর্যন্ত মানুষ চা-এর দোকানে আড্ডা দেয়, সিনেমা দেখে।

বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামেই মুক্তিযুদ্ধের কোনো না কোনো স্মৃতি রয়েছে। সেইসব স্মৃতির খোঁজে এখনকার তরুণরা গ্রামে যায়। কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে কাছে পেলে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনে। মুক্তিযুদ্ধের সময় বিক্রমপুরের ‘আগলা’ নামে একটা গ্রামে গিয়েছিলাম। ঢাকার খুব কাছেই। যদিও তখন এতটা কাছে মনে হয়নি। কারণ এখনকার মতো যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো ছিল না। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং হতো। খুব কাছ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। নবাবগঞ্জের খুব কাছেই এই গ্রাম। এখানে পুরো এক লঞ্চভর্তি পাক আর্মিকে ডুবিয়ে দেয়া হয়েছিল। এখনো সেই স্মৃতি জ্বলজ্বল করে। আরও মনে আছে ঢাকা থেকে আগলা যাওয়ার জন্য বুড়িগঙ্গা থেকে নৌকায় করে যেতে হয়েছিল। প্রায় ছয় ঘণ্টার জার্নি ছিল। বিক্রমপুর মানে এখনকার মুন্সীগঞ্জ জেলা। মুন্সীগঞ্জের চারদিকে বিল আর বিল। এখানকার আড়িয়ল বিল বিখ্যাত। এই বিল ব্যবহার করে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তান বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করেছে। শত্রুর মোকাবিলা করেছে। বিক্রমপুরের সেই গ্রামগুলো—ষোলঘর, আগলা, শ্রীনগর, কামারগাঁও এখন আর দূরে নয়। অতি নিকটে হয়ে গেছে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির কারণে। ঢাকা থেকে গাড়িতে করে খুব সহজে সেখানে পৌঁছানো যায়। মুন্সীগঞ্জ থেকে ঢাকায় অফিস করছে এমন লোকের সংখ্যা এখন অনেক। ঢাকার আশপাশের গ্রামের যে উন্নতি সেরকম উন্নয়ন কি একেবারে প্রত্যন্ত গ্রামেও হয়েছে? কোথাও হয়েছে আবার কোথাও হয়নি।

আটষট্টি হাজার গ্রাম রয়েছে বাংলাদেশে। অনেক গ্রামেই এখন পাকাবাড়ি। পয়ঃনিষ্কাশনের সুন্দর ব্যবস্থা রয়েছে। আরও একটা জিনিস, গ্রামের ভেতর এখন গ্রাম হয়েছে। সেটা আবার কেমন? গ্রামের ভেতর অনেক রিসোর্ট তৈরি হয়েছে। এই রিসোর্টগুলোর সুযোগ সুবিধা কিন্তু শহরের পাঁচ তারকা হোটেলের মতো নয়। এই রিসোর্ট গ্রামের মতোই সাজানো রয়েছে। এখানে গরুর খাঁটি দুধ পাওয়া যায়। চোখের সামনেই মাটির হাঁড়িতে রান্না হয়। এইসব রিসোর্টে এখন দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ভিড় লক্ষ্য করা যায়। এইসব রিসোর্টে গেলে গ্রামের অনুভূতি পাওয়া যায়।

গ্রামের কোনো কৃতী সন্তান বড় কোনো ব্যবসায়ী হয়েছেন কিংবা খেলোয়াড় হয়েছেন কেউবা নামী কোনো অভিনেতা-অভিনেত্রী। অনেকে সরকারের বড় পদে চাকরি করেন। গ্রামের কোন স্কুলে কেমন রেজাল্ট হয়েছে সেটারও আলোচনা হয়। কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ তার জন্ম জেলা নেত্রকোণার একটি গ্রামে স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই স্কুলে এবার এসএসসি পরীক্ষায় শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে; শুধু তাই নয়, সর্বোচ্চ জিপিএ পেয়েছে এই স্কুলের শিক্ষার্থীরা। আমাদের শহুরে ছেলেমেয়েরা এখন গ্রামের স্বাদ নিতে ছুটে যাচ্ছে বিভিন্ন রিসোর্টে। চারদিকে সবুজ গাছপালা। নদীর তীর। অবারিত ফসলের ক্ষেত। মাঝির দাড়টানা নৌকা। ছইয়ের ভেতর থেকে উঁকি দেয়া নতুন বউ। অপরূপ দৃশ্য আমাদের গ্রামগুলোর।
আমাদের মা-বোনেরা বর্ষাকালে ঘরে বসে নকশীকাঁথা বোনে। নানান রকম ফুল তোলে কাগজে। সুঁইয়ের প্রতিটি ফোঁড়ে থাকে আনন্দ-বেদনার কতো স্মৃতি! এখনো অনেক গ্রামে বেতশিল্পের প্রচলন দেখা যায়। বেত দিয়ে তারা নানা ধরনের তৈজসপত্র তৈরি করেন। মাছ ধরার জন্য তৈরি হয় চাঁই। শহরের মতো গ্রামের অনেক খালই এখন দখল হয়ে গেছে। ভরাট করে তৈরি হয়েছে ঘরবাড়ি। কিন্তু এখনো অনেক গ্রামের বিলে কিংবা ছোট্ট খালে চাঁই দিয়ে দেশীয় প্রজাতির নানারকম মাছ ধরা হয়।

তবে গ্রামের উন্নতি আমাদেরকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এখন আর গ্রামের সেই বাঁশের সাঁকো দেখা যায় না বললেই চলে। খুব কম জায়গাতেই এখন বাঁশের সাঁকো আছে। বেশির ভাগই পাকা সেতু তৈরি হয়েছে। যাতায়াত ব্যবস্থার এই উন্নতি শুধু গ্রামকেই নয়, দেশকে এগিয়ে নিয়েছে। গ্রামে এখন ব্যাটারিচালিত যানবাহন চলে। এরপরও একেবারে প্রত্যন্ত গ্রাম রয়েছে যেখানে এসব উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। কয়েকদিন আগে কসবার কাছের একটি গ্রামের খবর দেখলাম। সেই গ্রামে বিদ্যুৎ আছে কিন্তু বেশ দূর থেকে লাইন টেনে আনতে হয়। শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদেরকে একটু পরিশ্রম করে স্কুলে যেতে হয়। কিন্তু এই গ্রামে এখনো অনেক বড় বড় গাছ আছে যেখানে অনেক দূর থেকে এসে ছায়ায় বসে আড্ডা দেয় মানুষ। এখানে নদীর উপরে ছোট ব্রিজ। এই ব্রিজের নিচে ইতালির ভেনিসের মতো নৌকা চলে, লোকজন নৌকায় বসে গান গায়। আড্ডা দেয়। নদীর পাড়ে বসে মনোরম পরিবেশে আড্ডায় তরুণ, যুবা এমনকি বয়োবৃদ্ধরাও এসে শামিল হয়।

সবকিছু মিলিয়ে গ্রামগুলো যেন ছবির মতো। বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামই একেকটি বাংলাদেশ। এখন আর মাটির তলায় রতন ছড়িয়ে আছে বলা যাবে না। এখন গ্রামের পরতে পরতে মাটির উপরেও রতন ছড়িয়ে আছে। হীরে, মানিক, জহরত তো খুঁজে নেয়ার ব্যাপার! সেগুলো যদি আমরা ঠিকমতো আহরণ করতে পারি তাহলে অনেক সমৃদ্ধ হবো আমরা। একবার দুবাইতে একটি অনুষ্ঠান করতে গিয়ে আফজাল হোসেন সেটির নাম দিয়েছিল ‘মরুর বুকে বাংলাদেশ’। শুধু মরুর বুকেই নয়, বাংলাদেশের মানচিত্র সারা পৃথিবীতেই গর্ব ভরে নিয়ে যেতে পারি। বাংলাদেশ আমাদের হৃদয় পটে আঁকা এক চিরসবুজ ছবি!