রাজধানীর মিরপুরে পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফুটপাথে বসা ভাসমান ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সংঘর্ষের ঘটনায় সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। মিরপুরে উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে সবাইকে শান্ত ও ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, সবার জন্য গ্রহণযোগ্য ও উপকারী সমাধানের জন্য ধৈর্য ধরে উদ্যোগ নিতে হবে। গতকাল মিরপুরে উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতি পরিদর্শনে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, উপযুক্ত জায়গায় তারা (ব্যবসায়ীরা) যাতে ব্যবসা করতে পারে, তারা খেয়ে-পরে বাঁচতে পারে সম্মানের সঙ্গে, তারা তো বিরাট কোটিপতি হতে চায় না।
তিনি বলেন, আমরা কেউ শৃঙ্খলার বাইরে কোনো কাজ করবো না। আজকে কিছু সরকারি যানবাহন পোড়ানো হয়েছে, এটা ভাই ঠিক হয়নি। যানবাহনের কোনো দোষ নাই। দোষ করলে আমি ব্যক্তি করতে পারি, যানবাহন কোনো ব্যক্তির না। সরকারি যানবাহন, কিন্তু আপনারও ট্যাক্সের টাকা এখানে আছে। আপনিও অংশীদার। এটা যদি একবার ধ্বংস হয়, দেশের ক্ষতি হবে। সেই ক্ষতির অংশীদার আপনিও হবেন।
তিনি বলেন, সারা দেশের সমস্যার সমাধান করেন। চাঁদাবাজি বন্ধ করেন, দখলদারি বন্ধ করেন, দুর্নীতি বন্ধ করেন। বিভিন্ন জায়গায় মদ-মাদকের ব্যবসার সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত, তাদেরকে ধরেন। আর ইতিমধ্যে যারা ঢাকা মহানগরীতে অনেকগুলো বড় অপকর্ম করেছে, তাদেরকে ধরে এনে শাস্তি দেন। একজন শাস্তি পেলেই বাকিরা ঠিক হয়ে যাবে। শাস্তি না দিলে ধরে নেবো যে এর সঙ্গে সবাই জড়িত।
জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আজকে একটা স্ট্যাটাস আমি দিয়েছি। এখানে ধরেন দুইটা নির্বাচনী এলাকা পড়েছে। এই এলাকা ১৬ নম্বর, ওই এলাকা হচ্ছে ১৫ নম্বর। এখানে যারা এমপি আছেন, সংসদ সদস্য আপনারাই বানাইছেন। জনগণ আমাদেরকে বানাইছেন। আপনাদের সুবিধা-অসুবিধা দেখা আমাদের দায়িত্ব।
এ ছাড়াও দুপুরে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে জামায়াত আমীর এ আহ্বান জানান। ফেসবুক পোস্টে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, রাজধানীর মিরপুর এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চালাচ্ছে ঢাকা মহানগর পুলিশ ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। অভিযানকালে পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফুটপাথে বসা ভাসমান ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
তিনি লিখেছেন, বুধবার (৩০শে সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মিরপুর-১৩ নম্বর থেকে ১০ নম্বর এলাকার হোপ মার্কেট এলাকায় ফুটপাথে উচ্ছেদ অভিযান চলাকালে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে সিটি করপোরেশনের কিছু সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি উচ্ছেদ অভিযানে অংশ নেয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও আক্রান্ত হন। একইভাবে পুলিশের সদস্যদের সঙ্গেও সাধারণ ব্যবসায়ীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সেইসঙ্গে গণমাধ্যমকর্মীরা সংবাদ সংগ্রহে গেলে তাদেরও বাধা দেয়া হয়।
জামায়াত আমীর বলেন, এই আসনটি রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় আসন, যেখানে জনগণ তাদের মূল্যবান ভোট দিয়ে আমাকে নির্বাচিত করেছেন। সুতরাং জনগণের সুবিধা-অসুবিধাসংক্রান্ত কোনো বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের সঙ্গে পরামর্শ করা হলে বিষয়টি হয়তো আরও সমন্বিত ও ভিন্নভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতো।
ব্যবসায়ীদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে সংঘাতের পরিবর্তে বাস্তবতা উপলব্ধি করে এমন একটি ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন, যেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা অযথা ক্ষতিগ্রস্ত না হন এবং একইসঙ্গে সাধারণ জনগণের চলাচলের পথও নির্বিঘ্ন ও ব্যবহার উপযোগী থাকে। এজন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ।
চাঁদাবাজির বিষয়টি উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, তবে দুর্ভাগ্যের বিষয়, মাসের পর মাস ধরে একদল অসাধু ও চাঁদাবাজ ব্যক্তি এসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা নিয়ে তাদের এখানে ব্যবসা করার সুযোগ করে দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তারা দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক ও বার্ষিক ভিত্তিতে চাঁদা আদায় করে। এটি অত্যন্ত নিন্দনীয় কর্মকাণ্ড। ফলে শেষ পর্যন্ত এর আর্থিক বোঝা গিয়ে পড়ে সাধারণ ক্রেতা ও জনগণের ওপর।
তিনি আরও বলেন, সুতরাং বিচ্ছিন্ন কোনো পদক্ষেপ নয়; বরং সমন্বিত, সুপরিকল্পিত ও টেকসই পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন, যা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের জন্য কল্যাণকর হবে। এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়াই এখন সময়ের দাবি। এক্ষেত্রে স্থানীয় সংসদ সদস্যকে অবহিত না করে এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়টি আমাকে বিস্মিত করেছে। এ বিষয়ে আমারো দায়িত্ব রয়েছে এবং আমাকে সম্পৃক্ত করা যেতো। পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে একটি উত্তম ও কার্যকর পথ বের করা সম্ভব ছিল। কিন্তু সেই পথ অনুসরণ করা হয়নি।
শফিকুর রহমান বলেন, তবে এ ধরনের উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করতে হলে আগে বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করে তারপর সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য কোনো বিকল্প ব্যবস্থা করা হয়েছে কি না, সেটিও ভেবে দেখা দরকার। ভবিষ্যতে এ ধরনের যেকোনো পদক্ষেপ যেন সমন্বিতভাবে নেয়া হয় এবং সংসদ সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সম্পৃক্ত করা হয়, এটাই হতে পারে সমস্যা সমাধানের উত্তম পন্থা। আশাকরি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন।
জামায়াত আমীর আরও বলেন, আমি সবাইকে আপাতত শান্ত থাকার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি। যেখানেই সমস্যা রয়েছে, সেখানেই সমাধানের পথও রয়েছে। তবে সেই সমাধান হতে হবে নিরপেক্ষ, বাস্তবভিত্তিক ও মানবিক—কাউকে অযথা ক্ষতিগ্রস্ত করে নয়। তিনি উল্লেখ করেন, তবে ফ্যাসিবাদের দোসরদের কোনো জায়গা নেই।
