বাংলাদেশের প্রস্তাবিত সাইবার সিকিউরিটি (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট-২০২৬ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সাইবার বুলিং, যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল, ক্ষতিকর কনটেন্ট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মাধ্যমে তৈরি ভুয়া ও বিকৃত কনটেন্ট মোকাবিলায় আইনের সংশোধন প্রয়োজন।
তবে সাংবাদিক, অধিকারকর্মী ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষের সংগঠনগুলোর উদ্বেগ হলো, প্রস্তাবিত কিছু বিধান অনলাইন মতপ্রকাশ এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, গঠনমূলক সমালোচনাকে চরিত্রহনন বা আপত্তিকর রাজনৈতিক ভাষার সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়। সরকারের দাবি, ডিজিটাল পরিসরে শালীনতা ফিরিয়ে আনা এবং নারী ও তরুণদের সুরক্ষাই সংশোধনীর অন্যতম লক্ষ্য।
তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, আইনটি বাস্তবে রাষ্ট্রকে কতটা ক্ষমতা দেবে এবং সেই ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোর ব্যবস্থা কতটা কার্যকর থাকবে।
‘গুজব’ নিয়ে বড় উদ্বেগ
প্রস্তাবিত আইনে সাইবার স্পেসে ‘গুজব’ ও অপতথ্য প্রকাশ বা প্রচারকে অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
খসড়ায় অপতথ্য বলতে এমন মিথ্যা, বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর তথ্যকে বোঝানো হয়েছে, যা মানুষকে বিভ্রান্ত, প্রতারিত বা ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে তৈরি বা প্রচার করা হয়।
কিন্তু ‘গুজব’-এর সংজ্ঞা আরও বিস্তৃত। এতে এমন অপ্রমাণিত বা যাচাই না করা তথ্য, সংবাদ বা দাবিকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা জনমনে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক, উত্তেজনা বা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে বা করতে পারে। এখানে কাউকে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রতারণা করার উদ্দেশ্য থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়নি।
সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক সংকট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সাম্প্রদায়িক ঘটনা বা বড় দুর্ঘটনার মতো পরিস্থিতিতে তথ্য ধাপে ধাপে সামনে আসে। সাংবাদিকরা অনেক সময় প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন এবং পরে তা সংশোধন বা হালনাগাদ করেন।
এ অবস্থায় ‘অযাচাইকৃত তথ্য’কে অপরাধের আওতায় আনা হলে ভুল প্রতিবেদন, চলমান ঘটনা নিয়ে প্রাথমিক সংবাদ এবং অপরাধ হিসেবে গণ্য ‘গুজব’-এর মধ্যে সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) বলেছে, অযাচাইকৃত তথ্যকে মিথ্যা হিসেবে বিবেচনা করলে জরুরি পরিস্থিতি, দুর্যোগ ও মানবাধিকার সংকট নিয়ে কাজ করা সাংবাদিক ও গবেষকদের কাজ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সংগঠনটি গুজব ও অপতথ্যসংক্রান্ত প্রস্তাবিত বিধান বাদ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
মানহানি ও ‘অপমান’ নিয়েও প্রশ্ন
প্রস্তাবিত আইনে ডিজিটাল মানহানির সংজ্ঞা বিস্তৃত করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তির সুনাম, মর্যাদা বা চরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত তথ্য, বক্তব্য, অডিও, ভিডিও, ছবি বা গ্রাফিকস এর আওতায় পড়তে পারে।
এ ছাড়া ‘অপমান’কে পৃথক অপরাধ হিসেবে যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।
প্রস্তাবিত বিধানে মানহানি, অপমান ও বুলিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড এবং ২০ লাখ টাকা জরিমানার কথা বলা হয়েছে। নারী বা অপ্রাপ্তবয়স্কের বিরুদ্ধে একই অপরাধ হলে শাস্তি বেড়ে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড এবং ৪০ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে।
সমালোচকদের প্রশ্ন, রাজনৈতিক সমালোচনা, ব্যঙ্গ, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং জনস্বার্থের প্রতিবেদন কোন পর্যায়ে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে?
ব্লাস্টের মতে, মানহানি ইতোমধ্যে দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারায় অপরাধ। নতুন আইনে আরও একটি বিস্তৃত ডিজিটাল পথ তৈরি হলে বিদ্যমান আইনি কাঠামো আরও জটিল হতে পারে।
‘রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর’ কনটেন্ট ব্লকের প্রস্তাব
প্রস্তাবিত সংশোধনীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কনটেন্ট ব্লকের ক্ষমতা সম্প্রসারণ।
খসড়ায় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মানহানিকর এবং ‘রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর’ কনটেন্টও ব্লকের আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ নিয়ে উদ্বেগের কারণ হলো, সরকার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সরকারি নীতির সমালোচনা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক অংশ। কোনো মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি, সরকারি প্রকল্পের অপচয় বা কোনো নীতির সমালোচনা ভুল, অতিরঞ্জিত কিংবা রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে পারে। আবার তার পেছনে যথেষ্ট প্রমাণও থাকতে পারে।
তাই প্রশ্ন হচ্ছে, কোন বক্তব্য ক্ষতিকর, তা নির্ধারণের ক্ষমতা কার হাতে থাকবে এবং সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ কতটা থাকবে।
বিচারিক তদারকি কমার আশঙ্কা
বর্তমান কাঠামোয় কনটেন্ট ব্লকের ক্ষেত্রে বিচারিক তদারকির বিধান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের অনুমতি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিতে হয়। অনুমতি না পাওয়া গেলে বা ট্রাইব্যুনাল তা প্রত্যাখ্যান করলে কনটেন্ট পুনরায় চালুর বিধানও রয়েছে।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে এসব শর্ত বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে কনটেন্ট ব্লকের উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষমতা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাইরে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সরকার অনুমোদিত অন্যান্য সংস্থা বা বাহিনীর কাছেও সম্প্রসারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
ফলে নির্বাহী ক্ষমতা ও বিচারিক তদারকির ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রকৃতপক্ষে সহিংসতায় উসকানি, শিশু যৌন নির্যাতনের কনটেন্ট কিংবা জননিরাপত্তার জন্য তাৎক্ষণিক হুমকির মতো বিষয় দ্রুত সরিয়ে ফেলার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু একই ক্ষমতা যদি মানহানি বা রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর বক্তব্যের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হয়, তখন তা মতপ্রকাশের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
‘সৎ বিশ্বাসে’ কাজের দায়মুক্তি
খসড়ায় জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের সদস্য এবং অনুমোদিত কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের ‘সৎ বিশ্বাসে’ করা কাজের জন্য দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলার বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
কর্মকর্তাদের বৈধ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সুরক্ষা থাকা অস্বাভাবিক নয়। তবে একই আইনে যখন অনলাইন কনটেন্ট অপসারণ বা ব্লকের ক্ষমতা বাড়ানো হয়, তখন স্বাধীন পর্যালোচনার গুরুত্বও বেড়ে যায়।
কারণ একজন কর্মকর্তা সৎ বিশ্বাসে কাজ করেছেন কি না, সেটি সবসময় নির্ধারণ করা সহজ নয়। এ কারণেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বাধীন তদারকি গুরুত্বপূর্ণ।
ডিএসএর সঙ্গে তুলনা কেন
প্রস্তাবিত আইন নিয়ে আলোচনায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রসঙ্গও এসেছে।
ডিএসএর বিভিন্ন ধারা সাংবাদিক ও রাজনৈতিক সমালোচকদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের অভিযোগে সমালোচিত হয়েছিল। বর্তমান খসড়া ডিএসএর হুবহু পুনরাবৃত্তি নয়। তবে সমালোচকদের মতে, ফৌজদারি মানহানি, বিস্তৃত বক্তব্যসংক্রান্ত অপরাধ, অস্পষ্ট ‘ক্ষতিকর’ বক্তব্য এবং অনলাইন কনটেন্টের ওপর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মতো কিছু কাঠামোগত বিষয় আবারও সামনে এসেছে।
ডিএসএতে মানহানির সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল তিন বছর কারাদণ্ড এবং ৫ লাখ টাকা জরিমানা। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে তা বেড়ে পাঁচ বছর কারাদণ্ড এবং ২০ লাখ টাকা জরিমানার কথা বলা হয়েছে।
তাই সরকার সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইনটি ব্যবহার করবে না—এমন আশ্বাসের পাশাপাশি আইনের ভাষা, সীমা এবং জবাবদিহির কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ।
সাইবার নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশ কি একই আইনে?
প্রস্তাবিত আইনের একটি বড় প্রশ্ন হলো, এতে সাইবার নিরাপত্তা, সাইবার অপরাধ এবং মতপ্রকাশ—তিনটি পৃথক বিষয়কে একই কাঠামোর মধ্যে রাখা হচ্ছে কি না।
সাইবার নিরাপত্তার মূল বিষয় ডিজিটাল অবকাঠামো সুরক্ষা। সাইবার অপরাধের মধ্যে হ্যাকিং,র্যানসমওয়্যার, ডিজিটাল প্রতারণা ও অননুমোদিত প্রবেশের মতো অপরাধ পড়ে। অন্যদিকে মতপ্রকাশের বিষয়টি মানুষের অনলাইনে কী বলা, লেখা, প্রকাশ ও সমালোচনা করার সঙ্গে সম্পর্কিত।
একই ডিজিটাল পরিসরে এসব বিষয় ঘটলেও এগুলো একই ধরনের আইনি সমস্যা নয়।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশও বলেছে, খসড়ায় সাইবার অপরাধ, সাইবার নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে একসঙ্গে দেখা হয়েছে। এতে ভুল ব্যাখ্যা ও অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রয়োজন স্পষ্ট সংজ্ঞা
সাইবার বুলিং, যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল, প্রতিশোধমূলক পর্নোগ্রাফি, শিশু যৌন নির্যাতন এবং অনলাইন প্রতারণার মতো অপরাধ থেকে মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বড় কোনো বিতর্ক নেই।
কিন্তু এসব অপরাধের সংজ্ঞা যতটা সম্ভব সুনির্দিষ্ট হওয়া জরুরি।
কেউ সহিংসতার হুমকি দিলে বা ব্যক্তিগত ছবি ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল করলে সেটিকে বৈধ মতপ্রকাশ বলা যায় না। একইভাবে কোনো অপরাধী চক্র ব্যাংকে ম্যালওয়্যার হামলা চালালে সেটিও মতপ্রকাশের বিষয় নয়।
এআইয়ের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল বা ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য তৈরি ডিপফেক গুরুতর ক্ষতির কারণ হতে পারে। তবে এআই দিয়ে তৈরি কোনো কনটেন্ট হলেই তা বেআইনি হয়ে যাবে, এমন বিধান মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। আইনকে প্রতারণা ও বাস্তব ক্ষতির সঙ্গে ব্যঙ্গ, প্যারোডি, শিল্পকর্ম ও রাজনৈতিক বক্তব্যের পার্থক্য স্পষ্ট করতে হবে।
প্রকৃত সাইবার নিরাপত্তার দিকে নজর
মতপ্রকাশ নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রকৃত সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকিও গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যাংকিং ও পেমেন্ট ব্যবস্থা, টেলিযোগাযোগ, সরকারি ডেটাবেজ, বন্দর, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এখন ডিজিটাল ব্যবস্থার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
তাই একটি কার্যকর সাইবার নিরাপত্তা আইনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামোর সুরক্ষা ও স্থিতিস্থাপকতা। এর মধ্যে নিরাপত্তা মানদণ্ড, সাইবার হামলার তথ্য জানানোর ব্যবস্থা, দুর্বলতা ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল ফরেনসিক, হুমকি শনাক্তকরণ, সরবরাহ ব্যবস্থার নিরাপত্তা এবং হামলার পর দ্রুত পুনরুদ্ধারের মতো বিষয় থাকতে পারে।
অন্যদিকে মতপ্রকাশের বিষয়টি পৃথক ও অধিকারভিত্তিক আইনি কাঠামোর আওতায় রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
সরকারের প্রতিশ্রুতি নয়, আইনের কাঠামোই গুরুত্বপূর্ণ
সরকার বলছে, প্রস্তাবিত আইন সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করার জন্য নয় এবং অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত থাকবে। অন্যদিকে গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা আশঙ্কা করছেন, মানহানি, গুজব ও রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর বক্তব্যসংক্রান্ত বিধান সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হতে পারে।
এখানে মূল প্রশ্ন শুধু বর্তমান সরকার আইনটি কীভাবে ব্যবহার করবে, তা নয়। কারণ আইন একটি সরকারের মেয়াদের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী।
তাই গুরুত্বপূর্ণ হলো, আইনটি এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে কি না, যাতে ভবিষ্যতে কোনো সরকারও এর অস্পষ্ট বা বিস্তৃত বিধানের অপব্যবহার করতে না পারে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন থেকে সাইবার নিরাপত্তা আইন এবং বিভিন্ন সংশোধনী ও অধ্যাদেশের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে একটি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে। নতুন সংশোধনীও যদি একই ধরনের অস্পষ্টতা তৈরি করে, তাহলে বিতর্কটি আবারও ফিরে আসতে পারে।
একটি ব্যাংকে সাইবার হামলা, সরকারি সার্ভারে র্যানসমওয়্যার আক্রমণ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো থেকে তথ্য চুরি হলে শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা প্রয়োজন।
অন্যদিকে একজন সাংবাদিক কোনো অভিযোগের প্রতিবেদন করলে, কোনো নাগরিক কোনো মন্ত্রীর সমালোচনা করলে, কোনো গবেষক সৎ উদ্দেশ্যে যাচাই না হওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রাথমিক তথ্য প্রকাশ করলে কিংবা কোনো রাজনৈতিক ব্যঙ্গশিল্পী কোনো জনপরিচিত ব্যক্তিকে নিয়ে ব্যঙ্গ করলে প্রয়োজন স্পষ্ট আইনি সীমারেখা, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া এবং নির্বিচার রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ থেকে সুরক্ষা।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে এই পার্থক্য কতটা স্পষ্ট করা হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
কারণ সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নাগরিকের বক্তব্য নিয়ন্ত্রণ করা এক বিষয় নয়। দুটিকে একই আইনি কাঠামোর মধ্যে রাখা হলে সাইবার নিরাপত্তার পাশাপাশি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমা নিয়েও বিতর্ক থেকেই যাবে।
ব্যাংকে ম্যালওয়্যার হামলা চালালে সেটিও মতপ্রকাশের বিষয় নয়।
এআইয়ের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল বা ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য তৈরি ডিপফেক গুরুতর ক্ষতির কারণ হতে পারে। তবে এআই দিয়ে তৈরি কোনো কনটেন্ট হলেই তা বেআইনি হয়ে যাবে, এমন বিধান মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। আইনকে প্রতারণা ও বাস্তব ক্ষতির সঙ্গে ব্যঙ্গ, প্যারোডি, শিল্পকর্ম ও রাজনৈতিক বক্তব্যের পার্থক্য স্পষ্ট করতে হবে।
প্রকৃত সাইবার নিরাপত্তার দিকে নজর
মতপ্রকাশ নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রকৃত সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকিও গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যাংকিং ও পেমেন্ট ব্যবস্থা, টেলিযোগাযোগ, সরকারি ডেটাবেজ, বন্দর, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এখন ডিজিটাল ব্যবস্থার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
তাই একটি কার্যকর সাইবার নিরাপত্তা আইনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামোর সুরক্ষা ও স্থিতিস্থাপকতা। এর মধ্যে নিরাপত্তা মানদণ্ড, সাইবার হামলার তথ্য জানানোর ব্যবস্থা, দুর্বলতা ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল ফরেনসিক, হুমকি শনাক্তকরণ, সরবরাহ ব্যবস্থার নিরাপত্তা এবং হামলার পর দ্রুত পুনরুদ্ধারের মতো বিষয় থাকতে পারে।
অন্যদিকে মতপ্রকাশের বিষয়টি পৃথক ও অধিকারভিত্তিক আইনি কাঠামোর আওতায় রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
সরকারের প্রতিশ্রুতি নয়, আইনের কাঠামোই গুরুত্বপূর্ণ
সরকার বলছে, প্রস্তাবিত আইন সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করার জন্য নয় এবং অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত থাকবে। অন্যদিকে গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা আশঙ্কা করছেন, মানহানি, গুজব ও রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর বক্তব্যসংক্রান্ত বিধান সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হতে পারে।
এখানে মূল প্রশ্ন শুধু বর্তমান সরকার আইনটি কীভাবে ব্যবহার করবে, তা নয়।
কারণ আইন একটি সরকারের মেয়াদের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী।
তাই গুরুত্বপূর্ণ হলো, আইনটি এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে কি না, যাতে ভবিষ্যতে কোনো সরকারও এর অস্পষ্ট বা বিস্তৃত বিধানের অপব্যবহার করতে না পারে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন থেকে সাইবার নিরাপত্তা আইন এবং বিভিন্ন সংশোধনী ও অধ্যাদেশের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে একটি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে। নতুন সংশোধনীও যদি একই ধরনের অস্পষ্টতা তৈরি করে, তাহলে বিতর্কটি আবারও ফিরে আসতে পারে।
একটি ব্যাংকে সাইবার হামলা, সরকারি সার্ভারে র্যানসমওয়্যার আক্রমণ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো থেকে তথ্য চুরি হলে শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা প্রয়োজন।
অন্যদিকে একজন সাংবাদিক কোনো অভিযোগের প্রতিবেদন করলে, কোনো নাগরিক কোনো মন্ত্রীর সমালোচনা করলে, কোনো গবেষক সৎ উদ্দেশ্যে যাচাই না হওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রাথমিক তথ্য প্রকাশ করলে কিংবা কোনো রাজনৈতিক ব্যঙ্গশিল্পী কোনো জনপরিচিত ব্যক্তিকে নিয়ে ব্যঙ্গ করলে প্রয়োজন স্পষ্ট আইনি সীমারেখা, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া এবং নির্বিচার রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ থেকে সুরক্ষা।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে এই পার্থক্য কতটা স্পষ্ট করা হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
কারণ সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নাগরিকের বক্তব্য নিয়ন্ত্রণ করা এক বিষয় নয়। দুটিকে একই আইনি কাঠামোর মধ্যে রাখা হলে সাইবার নিরাপত্তার পাশাপাশি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমা নিয়েও বিতর্ক থেকেই যাবে।
