আসাদের পর সিরিয়ার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা সামনে

আসাদের পর সিরিয়ার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা সামনে

ফন্ট সাইজ:

সিরিয়ায় জ্বালানির দাম আকাশছোঁয়া। জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বাড়ছে। মানুষ অস্থির হয়ে উঠছে। তার ফলে সেপ্টেম্বরের শুরুতে হাজার হাজার সিরীয় রাস্তায় নেমে আসেন। প্রায় দুই বছর আগে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পতনের পর এটাই সবচেয়ে ব্যাপক বিক্ষোভ। আসাদ পরিবারের ৫৪ বছরের পুলিশি শাসনের সময় প্রকাশ্যে সরকারের বিরোধিতা করার অর্থ হতে পারত কারাবন্দি হওয়া, নির্যাতন, গুম কিংবা মৃত্যু। কিন্তু এবার বিক্ষোভকারীদের বাড়ি ফিরে যেতে দেয়া হয়েছে। বিক্ষোভের খবর রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমেও ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়েছে। আসাদের আমলের সঙ্গে এটি সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। তখন রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিক্ষোভকারীদের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে নানা ধরনের অপপ্রচার চালাত। এমন দাবিও করা হয়েছিল যে, কাতারের দূরবর্তী স্টুডিও থেকে এসব বিক্ষোভ সাজানো হচ্ছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন সিএনএন।

সিরিয়া এখন নতুন করে পাওয়া রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং সাধারণ মানুষের জন্য এখনও হতাশাজনকভাবে দূরে থাকা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের মধ্যকার ব্যবধান সামলাচ্ছে। আর এই পরিস্থিতিতে অনেক নাগরিকের ধৈর্য ক্রমেই ফুরিয়ে আসছে। সম্প্রতি সরকারের হঠাৎ জ্বালানির দাম সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ শুরু হয়। ইরান যুদ্ধের কারণে তৈরি বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটকে এর কারণ হিসেবে দেখিয়েছে সরকার। ক্ষোভ বাড়তে থাকলে সরকার কিছু মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে এবং জ্বালানিমন্ত্রীকে সংসদে পাঠিয়ে জবাবদিহির একটি বার্তা দেয়ার চেষ্টা করে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রদেশে বিক্ষোভের কথা উঠে এসেছে।

বিশ্লেষকরা সরকারের এই প্রতিক্রিয়াকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক পরীক্ষার ক্ষেত্রে ইতিবাচক সাড়া হিসেবে দেখেছেন। তবে তারা সতর্ক করেছেন, এতে দেশটির জীবনযাত্রার ব্যয়সংকটের মৌলিক সমস্যাগুলোর পরিবর্তন হবে না। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, সিরিয়ার দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করেন। অর্থাৎ দিনে ৩ দশমিক ৬৫ ডলারেরও কম আয় করেন। হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের সিরিয়া ইন ট্রানজিশন ল্যাবের পরিচালক ইব্রাহিম আল-আসিল বলেন, আমরা বারবার এই বিক্ষোভ দেখতে পাব। সিরীয়রা যে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন, তা কাটিয়ে ওঠা প্রায় অসম্ভব। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে। এই অর্থনৈতিক চাপ নতুন সরকারের প্রতি সিরীয়দের প্রত্যাশা এবং বাস্তবতার মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধান তৈরি করছে।

ওয়াশিংটন ডিসির মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিরিয়া ইনিশিয়েটিভের পরিচালক চার্লস লিস্টার বলেন, হানিমুন পর্ব যে একসময় শেষ হবে, সেটি অবশ্যম্ভাবী ছিল। মানুষের প্রত্যাশা বাড়বে এবং সেই প্রত্যাশা পূরণ না হলে তাদের ধৈর্য কমে যাবে। আমরা মূলত এখন সেই অবস্থাতেই আছি। ধৈর্য শেষ হওয়ার আগেই অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা সিরিয়াকে পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে এই পুনর্গঠনে আনুমানিক ২১৬ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে। তিনি এমন একটি প্রায় দেউলিয়া রাষ্ট্র উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছেন, যা আসাদ ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা লুটপাট করে গেছেন। ফলে নতুন সরকারকে ব্যাপকভাবে বিদেশি বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

তার কৌশল হলো কয়েক দশকের বিচ্ছিন্নতার পর সিরিয়াকে আবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে ফিরিয়ে আনা এবং সেই আন্তর্জাতিক গতি থেকে বাস্তব অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করা। বুধবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে আল-শারা বলেছেন, সিরিয়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে তার অবস্থান পুনরুদ্ধার করেছে। এটি বিশ্বের জন্য একটি ট্রানজিট বা সংযোগপথ হয়ে উঠেছে। আমরা কূটনৈতিক সেতুও তৈরি করেছি এবং বিশ্বকে প্রমাণ করেছি যে, এই অঞ্চলের নিরাপত্তার সূচনা দামেস্ক থেকেই হতে হবে। আল-শারার প্রতি আন্তর্জাতিক বিশ্বের গ্রহণযোগ্যতার সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ সম্ভবত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার উষ্ণ সম্পর্ক। গত মে মাস থেকে ট্রাম্পের সঙ্গে চারবার সাক্ষাৎ করেছেন তিনি। এর ফল হিসেবে সিরিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সব নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়েছে, যা বিদেশি বিনিয়োগের পথ খুলে দেয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এ পর্যন্ত তুরস্ক, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সিরিয়ায় সবচেয়ে বেশি বিদেশি বিনিয়োগ করেছে। গত বছর সিরিয়ার হিসাব অনুযায়ী, এসব বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলার।