যুক্তরাষ্ট্রের টানা অবরোধের কারণে ইরানের আর্থিক আয়ের প্রধান উৎস তেল রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে। ফলে দেশটির নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে আত্মবিশ্বাসী মনোভাব দেখালেও সাধারণ মানুষের জীবন দিন দিন কঠিন হয়ে পড়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিংবা বাড়িভাড়া পরিশোধের সামর্থ্যও হারাচ্ছেন অনেকে।
তেহরানে ক্যামেরার সামনে কথা বলার সময় রেস্তোরাঁর মালিক বেহনাম রিয়াজি বলেন, ‘আমি বাধ্য হয়ে খুব সামান্য ও নগণ্য লাভে পণ্য বিক্রি করছি। কিন্তু ব্যবসা বন্ধও করতে পারছি না। কারণ তাহলে আমি বেকার হয়ে যাব।’
রিয়াজি বলেন, তিনি খাবারের দাম বাড়াতে পারছেন না। কারণ তাঁর ক্রেতাদের বাড়তি দাম দেয়ার সামর্থ্য নেই।
ইরানের অর্থনৈতিক সংকট দেশটিকে কূটনৈতিক সমঝোতার দিকে কতটা ঠেলে দিতে পারে, তা স্পষ্ট নয়।
তবে যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্য ও ইরানের সূত্রগুলো গত সপ্তাহে জানিয়েছে, সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতার পেছনে আংশিকভাবে অর্থনৈতিক সংকটও কাজ করেছে।
ইরানি কর্মকর্তারা বারবার দেশে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এবং ভিন্নমতের সামান্য প্রকাশও কঠোরভাবে দমন করেছেন।
তবে রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা এখন সবাই জানিয়েছেন, প্রতিদিনের এত বেশি সমস্যা তাদের ঘিরে ধরেছে যে বিক্ষোভ করার কথা ভাবারও সময় বা মানসিক অবকাশ নেই।
উত্তর ইরানের ষাটোর্ধ্ব গৃহিণী হেদিয়ে তার স্বামীর সরকারি চাকরির পেনশনের ওপর নির্ভর করে চলেন। কিন্তু এখন তার নিজের ওষুধ তো দূরের কথা, আলঝেইমার রোগে আক্রান্ত বৃদ্ধা মায়ের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাপ্তবয়স্কদের ডায়াপার কেনার সামর্থ্যও প্রায় নেই।
রয়টার্স যেসব ইরানির সঙ্গে ফোনে কিংবা মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে কথা বলেছে, তাদের বেশির ভাগই নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি। বিদেশি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার কারণে শাস্তির আশঙ্কা থেকেই তারা পরিচয় গোপন রাখতে বলেছেন।
এ.জে. নামের এক শিক্ষকও শুধু তার নামের আদ্যক্ষর প্রকাশ করার অনুমতি দিয়েছেন। তিনি জানান, মায়ের প্রয়োজনীয় ওষুধও তিনি সবসময় কিনে দিতে পারেন না।
যুদ্ধের কারণে স্কুলগুলো অনলাইনে পাঠদান শুরু করার পর তিনি তেহরান ছেড়ে উত্তরের একটি গ্রামে মা ও ভাইবোনদের সঙ্গে থাকতে শুরু করেছেন।
কুর্দিস্তান প্রদেশের রাজধানী সানান্দাজে ৩৪ বছর বয়সী সাইকোথেরাপিস্ট নাজানিন জানিয়েছেন, আগে বহুবার চেষ্টা করেও ধূমপান ছাড়তে পারেননি তিনি। কিন্তু এবার সিগারেটের দাম বেড়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে ধূমপান ছেড়ে দিয়েছেন।
কালোবাজার ও ঘুষের বিস্তার
যাদের সামর্থ্য আছে, তারা প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে কালোবাজারের মাধ্যমে পণ্য ও সেবা সংগ্রহ করছেন। এতে কালোবাজার আরও বিস্তৃত হয়েছে, তবে খরচও বেড়েছে।
এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, একটি অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এড়িয়ে যেতে তিনি একজন সার্জনকে নগদ ২০০ ডলার দিয়েছেন।
আরেকজন জানিয়েছেন, পুলিশ কর্মকর্তাদের ঘুষ চাওয়ার ঘটনা এখন আরও ঘন ঘন ঘটছে। পরিচয়পত্র ছাড়া একটি চেকপোস্টে আটক হওয়ার পর আগের তুলনায় বেশি ঘুষ দিতে হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বেসরকারি খাতে চাকরি কমছে
এএ নামে পরিচয় দেয়া এক স্থপতি জানিয়েছেন, তুলনামূলকভাবে সচ্ছল ইরানিরাও এখন খরচ কমিয়ে দিচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘তারা সবাই আগের জীবনযাত্রার তুলনায় এখন দরিদ্র হয়ে গেছেন।
গত সপ্তাহে তার গাড়ির একটি টায়ার পাংচার হয়। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে নতুন টায়ার কেনার সামর্থ্য তার নেই। ইরানে জ্বালানি সংকট দেখা দিতে পারে বলেও তিনি উদ্বিগ্ন।
তার আশঙ্কা, এতে সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হয়ে আরও ব্যাপক অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে।
এরই মধ্যে যুদ্ধের কারণে বেসরকারি খাতে ব্যাপক হারে চাকরি হারানোর ঘটনা ঘটছে। তেহরানের এমএইচ নামে এক নারী জানিয়েছেন, চলতি মাসে স্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠানের ক্রয় বিভাগে তার চাকরি চলে গেছে।
তিনি বলেন, ‘সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ, আমরা এখনো ইন্টারনেটের খরচ বহন করতে পারছি। ফলে অনলাইনে যোগাযোগ রাখতে পারছি, হয়তো একটি সিনেমাও দেখতে পারছি।’
৪০ বছর বয়সী বিজান একসময় প্রকৌশলী ছিলেন। এখন অর্থ উপার্জনের জন্য শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়ান। তিনি ও তার স্ত্রী তেহরানের ফ্ল্যাট ছেড়ে রাজধানীর বাইরে এমন একটি এলাকায় চলে গেছেন, যেটিকে তিনি ‘অর্ধেক বস্তির মতো’ বলে বর্ণনা করেছেন।
এই দম্পতি তাদের সঞ্চয়ের প্রায় পুরোটাই শেষ করে ফেলেছেন। এখন তারা অন্য একটি শহরে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, যেখানে তুলনামূলক কম খরচে জীবনযাপন করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন।
ইরানে বর্তমানে জীবনযাত্রার মান কতটা নেমে গেছে, তা সবচেয়ে ভালোভাবে বুঝতে পারছেন দোকানিরা।
তেহরানে ক্যামেরার সামনে কথা বলার সময় রামিন ইউসেফনিয়া জানান, তার মুদি দোকানের সব ক্রেতাই কেনাকাটা কমিয়ে দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘কেউ যে জিনিস আগে পাঁচ বা ১০টি করে কিনতেন, এখন তারা সেটি মাত্র দুটি কিনতে পারছেন।’ এরপর তিনি বলেন, সঞ্চয়ের কথা আর বলবেন না। এটাই এখন বাস্তবতা।
