ফ্রান্সের ডাগআউটে পরিচিত নতুন মুখ। ১৪ বছর ধরে যে চেয়ারে বসেছিলেন দিদিয়ের দেশম, বিশ্বকাপ শেষে সেই আসনে এবার জিনেদিন জিদান। উয়েফা নেশনস লীগে তুরস্কের বিপক্ষে কোচ হিসেবে অভিষেক হয় তার। আর অভিষেক ম্যাচটা জয় দিয়ে রাঙালেন এই ফরাসি কিংবদন্তি। আর সেই জয়ের নায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে।
গত জুলাইয়ে চার বছরের চুক্তিতে ফ্রান্সের দায়িত্ব নেন জিদান। যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত সবশেষ বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে দেশমের ১৪ বছরের অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। এর আগে ২০১৮ সালে তার অধীনে ২০১৮ ফিফা বিশ্বকাপ জেতে ফ্রান্স। সেই বিশ্বকাপেই ১০ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন অধিনায়ক এমবাপ্পে। জিদানের নতুন যাত্রায়ও অধিনায়কত্বের ভার এমবাপ্পের হাতে। ম্যাচের আগে স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম দেয়া সাক্ষাৎকারে এমবাপ্পে বলেন, জিদানের অধীনে খেলাটা তার কাছে ‘সিনেমার মতো’।
১৩-১৪ বছর বয়সে রিয়াল মাদ্রিদের ট্রায়ালে জিদানের সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এখন তিনিই আমার জাতীয় দলের কোচ। এটা সিনেমার মতো, কিন্তু এটা বাস্তব।’ তুরস্ক ম্যাচের আগে জ্বরের কারণে একদিন অনুশীলন করতে পারেননি এমবাপ্পে। ম্যাচে তার খেলা নিয়ে শঙ্কাও তৈরি হয়। তবে মাঠে নেমে সেই শঙ্কা উড়িয়ে দেন এমবাপ্পে। ফ্রান্সের ডাগআউটে পা রেখে দলকে ৪-৩-৩ ছকে খেলান জিদান। এই ছকে মানিয়ে নিতে শুরুতে বেশ বেগ পেতে হয় ফ্রান্সকে। দুই বছর ধরে জাতীয় দলে বাঁ প্রান্তে না খেলা এমবাপ্পে শুরুতে ছিলেন দুই ডিফেন্ডারের কড়া পাহারায় বন্দি। উসমান দেম্বেলে ফাঁকা জায়গা খুঁজে পেতে হাঁসফাঁস করেন, নিজের ছায়া হয়ে ছিলেন মাইকেল ওলিসেও। শুরুর দিকে তুরস্ক চেপে ধরে ফরাসি রক্ষণকে। চতুর্থ মিনিটে ইলমাজের শট ঠেকান গোলরক্ষক মাইক মাইনিয়ঁ, এরপর গোললাইন থেকে বল ফেরান ডিফেন্ডাররা।
২৮ মিনিটে কাদিয়োগ্লুর জোরালো শটও রুখে দেন মাইনিয়ঁ। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসে ফ্রান্স। ফাইনাল থার্ডে প্রভাব বাড়াতে থাকেন এমবাপ্পে, মাঝমাঠে জায়গা খুঁজে নিয়ে ঝলক দেখান রায়ান শেরকিও। বিরতির ঠিক আগে ওলিসের শট রুখে দেন তুর্কি গোলরক্ষক চাকির। বিরতির পর আবারও চড়াও হয় তুরস্ক, কিন্তু ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ হয়ে যায় তখনই। জুলস কুন্দে ও শেরকির সম্মিলিত প্রেসিংয়ে বল পেয়ে যান ওলিসে, সেখান থেকে বাঁ প্রান্তে এমবাপ্পেকে বাড়ানো বলে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে নিজের জাতীয় দলের ক্যারিয়ারের ৬৭তম গোলটি করেন ফরাসি অধিনায়ক। তবে সেই আনন্দ স্থায়ী হয়নি বেশিক্ষণ। গোল করার মুহূর্তেই যন্ত্রণায় মাটিতে বসে পড়েন এমবাপ্পে। ৫৯ মিনিটে খোঁড়াতে খোঁড়াতে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। তার বদলি হিসেবে নামা দেজিরে দুয়ে মাঠে নামার তিন মিনিটের মধ্যেই প্রতিপক্ষের রক্ষণে ভীতি ছড়িয়ে নিজের উপস্থিতি জানান দেন। ৬৯ মিনিটে কুন্দের শট পোস্টে লেগে ফিরে না এলে ক্যারিয়ারের প্রথম আন্তর্জাতিক গোল পেতে পারতেন এই ডিফেন্ডারও।
এরপর ব্র্যাডলি বারকোলা মাঠে নামার পর ফরাসি আক্রমণের ধার বহুগুণ বেড়ে যায়, শেষ মিনিট পর্যন্ত তুর্কি রক্ষণকে ব্যস্ত রাখে তার গতি। ম্যাচের সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্ত আসে ৮৮ মিনিটে। বারকোলা একাই রক্ষণ ভেদ করে বেরিয়ে যাওয়ার সময় ডি-বক্সের বাইরে হাত দিয়ে বল আটকে সরাসরি লাল কার্ড দেখেন তুর্কি গোলরক্ষক চাকির। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি ফ্রান্স, ১-০ ব্যবধানেই শেষ হয় ম্যাচ। জিদানের অধীনে ফ্রান্সের পরের গন্তব্য ব্রাসেলসে বেলজিয়াম, আগামী ২৮শে সেপ্টেম্বর। এরপর ২রা অক্টোবর স্তাদ দ্য ফ্রঁসে কোচ হিসেবে নিজের প্রথম হোম ম্যাচে ইতালির মুখোমুখি হবেন জিদান। তিন দিন পর একই ভেন্যুতে আবারও বেলজিয়ামের বিপক্ষে খেলবে ফ্রান্স। স্কোয়াডে এবার বেশ কিছু নতুন মুখও এনেছেন জিদান- লিভারপুলে দুর্দান্ত ফর্মের পুরস্কার হিসেবে ডাক পেয়েছেন সেন্টারব্যাক জেরেমি জ্যাকেট, গত মৌসুমে লীগ ওয়ানের সর্বোচ্চ গোলদাতা রেনের এস্তেবান লেপো এবং কোমোর মিডফিল্ডার লুকাস দা কুনিয়াও
প্রথমবারের মতো জায়গা পেয়েছেন দলে। চোটের কারণে ছিলেন না আর্সেনালের উইলিয়াম সালিবা ও রিয়াল মাদ্রিদের অরেলিয়াঁ চুয়ামেনি। খেলোয়াড়ি জীবনে ১৯৯৮ বিশ্বকাপ ও ইউরো ২০০০ জয়ী জিদান ২০০৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে মার্কো মাতেরাজ্জিকে মাথা দিয়ে গুঁতো মেরে লাল কার্ড দেখে খেলোয়াড়ি জীবনের ইতি টানেন, সেই ফাইনালে ইতালির কাছে টাইব্রেকারে হারে ফ্রান্স। দুই দশকেরও বেশি সময় পর এবার ফ্রান্সের কোচ হিসেবে নতুন এক অধ্যায় শুরু করলেন তিনি। তার সহকারী হিসেবে থাকছেন রিয়াল মাদ্রিদে তার সাবেক সহকর্মী ডেভিড বেতোনি, আর গোলরক্ষক কোচের দায়িত্বে ১৯৯৮ বিশ্বকাপজয়ী সতীর্থ ফাবিয়ঁ বার্তেজ।
