বাংলাদেশ তার বিকাশমান প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা (Primary Health CareÑPHC) রূপান্তর এবং পেশাদার মিডওয়াইফারি সেবায় যুগান্তকারী বিনিয়োগকে গতকাল বৈশ্বিক পরিসরে দৃঢ়ভাবে তুলে ধরেছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের একটি পার্শ্ব-অনুষ্ঠানে বিশ্বনেতা, মন্ত্রী এবং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য উন্নয়ন অংশীদারদের একত্রিত করে বাংলাদেশ এ উদ্যোগ তুলে ধরে।
২৪শে সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের কনফারেন্স রুম-৭-এ অনুষ্ঠিত “প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়ন: প্রতিরোধযোগ্য মাতৃ ও নবজাতক মৃত্যু অবসানে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মিডওয়াইফারি অন্তর্ভুক্তকরণ” (From Commitment to Action: Integrating Midwifery into Primary Health Care to End Preventable Maternal and Newborn Deaths) শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের এই অনুষ্ঠান বাংলাদেশ ও সুইডেন সরকারের যৌথ আয়োজনে এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (টঘঋচঅ) অংশীদারত্বে অনুষ্ঠিত হয়।
উচ্চপর্যায়ের এই সমাবেশ থেকে একটি কেন্দ্রীয় বার্তা উঠে আসে: প্রতিরোধযোগ্য মাতৃ ও নবজাতক মৃত্যুর অবসান ঘটাতে হলে দেশগুলোকে বিচ্ছিন্ন ও খণ্ডিত উদ্যোগের গণ্ডি অতিক্রম করে সুশিক্ষিত, পেশাগতভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং যথাযথ সহায়তাপ্রাপ্ত মিডওয়াইফদের শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার কেন্দ্রে স্থাপন করতে হবে।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী বক্তব্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে প্রধানত রোগের চিকিৎসানির্ভর ব্যবস্থা থেকে রূপান্তর করে রোগ প্রতিরোধ, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ ও হস্তক্ষেপ এবং মানুষের ঘরের কাছাকাছি স্বাস্থ্যসেবাকে অধিকতর গুরুত্ব দেয়ার লক্ষ্যে তার সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। আমার সরকার একটি সহজ নীতিকে সামনে রেখে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার রূপান্তর ঘটাচ্ছে-‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম।’ আমরা একটি সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে স্বাস্থ্যসেবা শুরু হবে ঘর ও কমিউনিটি থেকে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কার্যক্রমের কেন্দ্রে রয়েছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, যেখানে নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন, যেখানে প্রত্যেক নারী তার বাসস্থানের কাছাকাছি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দলের অংশ হিসেবে একজন দক্ষ পেশাদার মিডওয়াইফের সেবা পাবেন। সুতরাং, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার আওতায় নারীর স্বাস্থ্যের একটি বিস্তৃত প্ল্যাটফর্মের অংশ হিসেবে মিডওয়াইফারিকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে ।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে বাস্তব ফলাফলে রূপান্তর করতে হলে দেশীয় বিনিয়োগ, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং দক্ষ সম্মুখসারির স্বাস্থ্যকর্মী প্রয়োজন। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে তার স্বাস্থ্য জনবল সম্প্রসারণে একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে ২০৩০ সালের মধ্যে ২৫,০০০ পেশাদার মিডওয়াইফের পদ সৃষ্টি ও তাদের নিয়োগ ও পদায়ন—যা দেশের ইতিহাসে মিডওয়াইফারি জনবলে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।
সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিস মারিয়া মালমার স্টেনারগার্ড উদ্বোধনী বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি সহনশীল ও ন্যায়সংগত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব, নারীর স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ এবং পেশাদার মিডওয়াইফারির গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা: প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়ন
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস. এম. জিয়াউদ্দিন হায়দার পেশাদার মিডওয়াইফারি সেবাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে একীভূতকরণ এবং বৃহৎ পরিসরে সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করার অভিজ্ঞতা ও উদীয়মান দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। বাংলাদেশের কৌশলে পেশাদার মিডওয়াইফদের শুধু প্রসবকালীন সেবাদানকারী হিসেবে নয়, বরং বহুমাত্রিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দলের অপরিহার্য সদস্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তারা গর্ভধারণ-পূর্ব সময় ও গর্ভাবস্থা থেকে শুরু করে সন্তান প্রসব এবং প্রসব-পরবর্তী সময় পর্যন্ত নারীদের ধারাবাহিক সেবা দিতে পারবেন এবং জটিলতা দেখা দিলে যথাসময়ে উপযুক্ত উচ্চতর পর্যায়ে রেফারেল নিশ্চিত করবেন। দেশের ২৫,০০০ মিডওয়াইফ নিয়োগ ও পদায়নের অঙ্গীকারের পাশাপাশি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ জোরদার, যথাযথ পদায়ন, কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং সম্মুখসারির স্বাস্থ্যসেবাকে একটি আধুনিক ডিজিটাল স্বাস্থ্য ইকোসিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
ড. হায়দার মিডওয়াইফদের জন্য এই বিনিয়োগকে শুধু স্বাস্থ্য খাতের বিনিয়োগ নয়, বরং এর চেয়েও বিস্তৃত একটি জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একটি জাতি যখন মিডওয়াইফদের জন্য বিনিয়োগ করে, তখন সেই জাতি সুস্থতর গর্ভাবস্থা, নিরাপদ প্রসব, শক্তিশালী পরিবার এবং আরও উৎপাদনশীল সমাজে বিনিয়োগ করে। এই উদ্যোগ বাংলাদেশের বৃহত্তর লক্ষ্যের অংশ—একটি প্রতিরোধকেন্দ্রিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের আরও কাছাকাছি নিয়ে যাবে এবং হাসপাতাল নির্ভর সেবার ওপর অপ্রয়োজনীয় নির্ভরতা কমাবে।
স্বাস্থ্য জনবল বৃহৎ পরিসরে সম্প্রসারণ নিয়ে মন্ত্রীদের অভিজ্ঞতা বিনিময়
ড. হায়দার “স্বাস্থ্য জনবল বৃহৎ পরিসরে সম্প্রসারণের নতুন যুগ” (A Nwe Era of Health Workforce Scaling) শীর্ষক মন্ত্রী পর্যায়ের প্যানেল আলোচনাও সঞ্চালনা করেন। এতে নেপাল, স্লোভেনিয়া, থাইল্যান্ড এবং মেক্সিকোর বিশিষ্ট মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
আলোচনায় সরকারগুলো কীভাবে নীতিগত অঙ্গীকার থেকে বৃহৎ পরিসরে বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যেতে পারে, সে বিষয়গুলো উঠে আসে। এর মধ্যে ছিল টেকসই দেশীয় অর্থায়ন, স্বাস্থ্য জনবল পরিকল্পনা, মানসম্মত শিক্ষা ও পেশাগত নিয়ন্ত্রণ, কার্যকর নিয়োগ ও কর্মস্থলে ধরে রাখা এবং জাতীয় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কৌশলে মিডওয়াইফদের একীভূতকরণ।
বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয় যে, সম্মুখসারির স্বাস্থ্য জনবল শক্তিশালী করা কোনো একটি অঞ্চল বা নির্দিষ্ট আয়ের দেশের বিষয় নয়; বরং এটি একটি অভিন্ন বৈশ্বিক অগ্রাধিকার।
আলোচনাকে আরও সমৃদ্ধ করেন যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের উইমেন অ্যান্ড গার্লস বিভাগের প্রধান কেমি উইলিয়ামস; ইন্দোনেশিয়ার হারাপান কিতা উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন হাসপাতালের মানবসম্পদ, শিক্ষা ও গবেষণা বিভাগের পরিচালক ডা. আরিয়ানি দেউই উইদোদো; এবং লারডাল গ্লোবাল হেলথের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ক্যারোলিন মাইক্লেবুস্ট লিন্ডে।
বক্তারা সম্মিলিতভাবে মিডওয়াইফ এবং অন্যান্য সম্মুখসারির স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, অর্থায়ন, উচ্চমানের শিক্ষা ও দক্ষতা, উদ্ভাবন, অংশীদারত্ব এবং সহায়ক স্বাস্থ্যব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
প্রতিরোধকে কেন্দ্রে রেখে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার পুনর্বিন্যাস
সমাপনী বক্তব্যে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ এবং জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান জোর দিয়ে বলেন, পেশাদার মিডওয়াইফরা জীবন রক্ষা করেন; তবে তাদের পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে এমন স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে তারা কার্যকর, ন্যায়সংগত ও টেকসইভাবে কাজ করতে পারেন। তিনি বাংলাদেশের বৃহত্তর স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কর্মসূচির প্রেক্ষাপটে মিডওয়াইফারি সম্প্রসারণের বিষয়টি তুলে ধরেন। একটি সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ গড়ার আমাদের লক্ষ্য হলো চিকিৎসাকেন্দ্রিক ব্যবস্থা থেকে এমন একটি ব্যবস্থায় উত্তরণ, যেখানে রোগ প্রতিরোধ, প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ এবং ধারাবাহিক সেবার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা মানুষের ঘরের আরও কাছাকাছি পৌঁছে দেওয়া হবে। ডা. রহমান প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার কেন্দ্রে পেশাদার মিডওয়াইফদের স্থান দেয়া এবং কমিউনিটি থেকে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত নারী ও নবজাতকের জন্য ধারাবাহিক সেবাব্যবস্থা গড়ে তোলার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানের সমাপ্তিতে জাতিসংঘের আন্ডার-সেক্রেটারি-জেনারেল এবং UNFPA-এর নির্বাহী পরিচালক ডা. দিয়েনে কেইতা বক্তব্য দেন। তিনি মিডওয়াইফদের জন্য বিনিয়োগ এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা পরিবর্তনে রূপান্তর করার বৈশ্বিক গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেন।
বৈশ্বিক অগ্রগামী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উত্থান
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের এই উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব-অনুষ্ঠান মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্য বিষয়ে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। একটি শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সঙ্গে একীভূত করে ২০৩০ সালের মধ্যে ২৫,০০০ পেশাদার মিডওয়াইফের পদ সৃষ্টি, নিয়োগ ও পদায়নের বাংলাদেশের অঙ্গীকার সীমিত ও ধাপে ধাপে সম্প্রসারণের পরিবর্তে জাতীয় পর্যায়ে বৃহৎ পরিসরে স্বাস্থ্য জনবল উন্নয়নের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রতিনিধিত্ব করে।
জাতিসংঘে রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী, জাতিসংঘের সংস্থা, দ্বিপাক্ষিক উন্নয়ন অংশীদার, স্বাস্থ্য পেশাজীবী এবং বেসরকারি খাতের উদ্ভাবকদের একত্রিত করার মাধ্যমে এই অনুষ্ঠানটি প্রমাণ করেছে যে, বাংলাদেশ শুধু নিজের স্বাস্থ্যব্যবস্থার রূপান্তরই করতে চায় না; বরং শক্তিশালী ও প্রতিরোধমুখী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তোলার বৈশ্বিক আন্দোলনে নিজের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে অবদান রাখতেও আগ্রহী।
