মামলা থেকে বাঁচতে ৯ লাখ টাকায় রফা

গাড়িচাপায় পথচারীকে হত্যা

মামলা থেকে বাঁচতে ৯ লাখ টাকায় রফা

ফন্ট সাইজ:

রাজধানীর বারিধারা ডিপ্লোম্যাটিক জোনে গাড়িচাপা দিয়ে নির্মাণ শ্রমিক হত্যার ঘটনায় মামলা হলেও ৯ লাখ টাকায় আপস-রফার অভিযোগ উঠেছে। প্রকাশ্য দিবালোকে শত শত মানুষের সামনে চাপা দেয়া চালকের আসনে থাকা কিশোর আজান আলী শরীফকে বাঁচাতে একের পর এক কৌশল করছে পুলিশ। এই ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় আসামির তালিকায় শরীফের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর পুলিশ শরীফকে আটকের পর কিশোর সংশোধনাগারে পাঠায়।

এদিকে আপস-রফার বিষয়টি স্বীকার করেছেন আসামি পক্ষের আইনজীবী মো. আলমগীর হোসেন। গতকাল দুপুরে আসামিপক্ষের আইনজীবী ঢাকা শিশু আদালতের সামনে সাংবাদিকদের বলেন, দাফন-কাফন বাবদ এক লাখ টাকা এবং নিহত নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসানের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে আট লাখ টাকা দেয়া হয়েছে। বাদী পক্ষের সঙ্গে বিষয়টি আমাদের মীমাংসা হয়ে গেছে। তিনি বলেন, কিশোর আজান আলী শরীফ গাড়িতে ড্রাইভারের পাশের আসনে বসা ছিল। নিহত মেহেদী একজন শ্রবণ ও বাক-প্রতিবন্ধী ছিলেন। তাকে হর্ন বাজানো সত্ত্বেও দ্রুত সরে যেতে না পারায় দুর্ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ঘটে যায়। ওই সময়ে নিহত মেহেদীর ভাই ও মামলার বাদী মোক্তাদির ইসলাম আপসের বিষয়টি স্বীকার করেন।

তবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন-অর-রশীদ বলছেন, সড়ক পরিবহন আইনে দায়ের করা মামলা আপসযোগ্য নয়। বাদী বা আসামিপক্ষের মধ্যে আপস হলে আদালত সেটা গ্রহণ করতে বাধ্য না। মানুষ মারা যাবে। সেই মামলায় আপস হলে তা গ্রহণযোগ্য নয়।

মঙ্গলবার বিকালে বারিধারার ডিপ্লোম্যাটিক জোনের ১ নম্বর সড়কের ১৪ নম্বর বাড়ির সামনের ফুটপাথে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান (২৪)। হঠাৎ দ্রুতগতির একটি প্রাইভেটকার ফুটপাথে উঠিয়ে দেয় চালক। গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। মেহেদীকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা জানান- ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়েছে। ওই সময়ে মেহেদীকে চাপা দেয়া ওই গাড়ির চালকের আসনে থাকা আজান আলী শরীফ নামে ওই কিশোরকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেন পথচারীরা। তবে ওই কিশোরকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেয় পুলিশ। এই ঘটনায় নিহত মেহেদীর বড় ভাই মোক্তাদির ইসলাম বাদী হয়ে গুলশান থানায় মামলা করেন। তবে সড়ক পরিবহন আইনে করা ওই মামলাতে মেহেদীকে চাপা দেয়া ওই গাড়ির চালক আজান আলী শরীফের নাম উল্লেখ করা হয়নি। মামলায় গাড়িটির চালক হিসেবে আকাশ মারক নামের ৪৪ বছরের এক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়।

উল্লেখ করা হয়- ঘটনার পর থেকেই এই চালক পলাতক রয়েছে। যা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয় বিভিন্ন মাধ্যমে। এরই প্রেক্ষিতে বুধবার বিকালে ছেড়ে দেয়া ওই কিশোর আজানকে ঘটনায় সম্পৃক্ততা আছে দাবি করে সন্দেহভাজন আসামি দেখিয়ে আটক করে গুলশান থানা পুলিশ। এরপর গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আজানকে আদালতে হাজির করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গুলশান থানার উপ-পরিদর্শক মো. আরিফীন ইসলাম সংশোধনাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, মামলাটি তদন্তকালে ঘটনাস্থলসহ আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় দেখা যায় ঘটনার পরপরই প্রাইভেটকারের ডান পাশের ড্রাইভিং সিট থেকে আজান আলী শরীফকে দরজা খুলে বের হতে দেখা যায়। তদন্তকালে ঘটনার সঙ্গে ‘আইনের সংঘাতে জড়িত শিশু’ আজান আলী শরীফের জড়িত থাকার বিষয়ে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যাচ্ছে। মামলার তদন্ত অব্যাহত আছে। মামলাটি সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে অভিযুক্ত শিশুকে আটক রাখার আবেদন করছি। পরে ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮ এর বিচারক মো. আব্দুল মোক্তাদিরের আদালত শুনানি শেষে কিশোর আজান আলী শরীফকে সংশোধনাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

আপসনামায় যা আছে: এদিকে বাদীপক্ষের সঙ্গে আসামিপক্ষের করা চুক্তিপত্রে দেখা যায়, চুক্তিনামায় প্রথম পক্ষের হয়ে স্টাম্পে স্বাক্ষর করে ঘটনার মূল অভিযুক্ত কিশোর শরীফ। আর দ্বিতীয় পক্ষের হয়ে স্বাক্ষর করেছেন মোক্তাদির। যেখানে স্বাক্ষী হয়েছেন- নিহত মেহেদীর বাবা এরশাদুল, মেহেদীর মামা খাইরুল ইসলাম, মো. জিহাদুল আবেদেনী ও সাজ্জাদ আলী। চুক্তিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে- ‘১. ভিকটিম দ্বিতীয় পক্ষের ছোট ভাই মৃত, মেহেদী হাসান মিমের দাফন-কাফনসহ ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্নে প্রথম পক্ষ সহায়তা হিসেবে তাৎক্ষণিক নগদ এক লাখ টাকা প্রদান করেন।

এ ছাড়াও দ্বিতীয় পক্ষের বৃদ্ধ পিতা-মাতার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে প্রথম পক্ষ আরও নগদ আট লাখ টাকা প্রদান করলেন। ২. দ্বিতীয় পক্ষ নিকট আত্মীয়স্বজন এবং সাক্ষীগণের উপস্থিতিতে প্রথম পক্ষের নিকট হতে সর্বমোট নয় লাখ টাকা গ্রহণপূর্বক অত্র আপস-মীমাংসানামা সম্পাদন করেন। ৩. অঙ্গীকার অনুযায়ী দ্বিতীয় পক্ষ তার দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। মামলা প্রত্যাহারের লক্ষ্যে এবং প্রথম পক্ষের ছোট ভাই আজান আলী শরীফ (১৭) ও গাড়িচালক আকাশ মারক (৪৪)-এর জামিনে অনাপত্তি তথা সুপারিশ জানাতে দ্বিতীয় পক্ষ আদালতে উপস্থিত থাকিবে। মোট ৮টি শর্ত রয়েছে এতে।

তবে এসব বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ- ডিএমপি’র গুলশান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইসমাইল হোসেন মানবজমিন’কে বলেন, আমরা ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে সিসিটিভি ফুটেজে সত্যতা পেয়েই ওই কিশোরকে আটক করেছি। পরে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। আদালতে আমাদের তদন্তকারী কর্মকর্তা তাকে আটক রাখার আবেদন পর্যন্ত করেছেন। আদালত তাকে সংশোধনাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এখন আদালত যেই বিষয়ে আদেশ দিয়েছেন, সেই বিষয়ে আমাদের কথা বলা ঠিক হবে না। তবে এই আপসের সঙ্গে পুলিশের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলেও জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।