‘ওরে নবীন ওরে আমার কাঁচা
ওরে সবুজ ওরে অবুঝ
আধ-মরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।’
রবীন্দ্রনাথ যথার্থই বলেছেন। তিনি তরুণদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। যারা প্রবীণ অথবা নির্জীব হয়ে আছে তাদের জাগিয়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। যুগে যুগে তরুণরাই এগিয়ে এসেছে সমাজ, দেশ কিংবা রাষ্ট্রের যেকোনো সংকটময় মুহূর্তে। তারা সমাজের অসংগতির বিরুদ্ধে জেগে ওঠে। আমরা ইতিহাসে পড়েছি এই উপমহাদেশে তরুণরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে জেগে উঠেছিল। ক্ষুদিরাম বসু, প্রীতিলতা থেকে মাখন লাল পর্যন্ত আমাদের তারুণ্যের দীপ্ততা দেখতে পাই। তারা সংগঠিত হয়ে বৃটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। তরুণদের নেতৃত্বেই দেশ এগিয়ে যায়। প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে তরুণরাই হাসিমুখে জীবন বিলিয়ে দেয়।
বাংলাদেশের জনসংখ্যা নিয়ে প্রায়ই আমরা কথা বলি। এত জনসংখ্যা! আমাদের কী হবে। আমরা কী করবো! এই জনসংখ্যাই তো শক্তি। এই বিপুল জনসংখ্যা নিয়ে আমরা আমাদের উন্নতিকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারবো। আমাদের দেশের প্রতি ভালোবাসা আরও বেশি করে প্রকাশ করতে পারবো- এটাও আমরা ভাবতে পারি। জনসংখ্যা যে সমস্যা নয় এটা তো চীন প্রমাণ দিয়েছে, ভারতবর্ষ দিয়েছে। বাংলাদেশের জনসংখ্যাকে জনগুরুত্বপূর্ণ কাজে কিংবা জনহিতকর কাজে ব্যবহার করতে পারলে এই জনসংখ্যার সঠিক ব্যবহার হবে। আমাদের যা কিছু আছে সেগুলো নিয়েই দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেবো। এই প্রসঙ্গে-আমাদের সুবিধার আরও একটা দিক আছে। যে সুবিধার কথা কেউ কখনো চিন্তা করেছেন কিনা জানি না। বাংলাদেশ হলো পৃথিবীর সেই দেশ যে দেশে তরুণদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। কেউ যদি মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করে তাহলে দেখতে পাবেন দেশের অধিকাংশ মানুষই তরুণ। অর্থাৎ এইসব তরুণদের বয়স ২২ থেকে ৪২-এর ভেতরে। এই যে তরুণ সমাজের আধিক্য। তরুণ সমাজই সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশের এই জনসংখ্যার বিশাল একটা অংশ যদি তরুণ হয় এবং তরুণদের গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস যদি থাকে বাংলাদেশের এই বিশাল তরুণদের নিয়ে আমরা প্রমাণ করে দেবো বাংলাদেশ একটি উন্নতিশীল দেশ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জনশুমারি অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৭ শতাংশ মানুষের বয়স ২৯ বছরের কম-অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি জনগোষ্ঠীই তরুণ প্রজন্মের। রাস্তায় বেরোলে, কোনো মিছিলে-মিটিংয়ে দাঁড়ালে, বা ঘনবসতিপূর্ণ কোনো এলাকায় হাঁটলে এই সত্যিটা চোখে না পড়ে উপায় নেই। চারপাশে তাকালেই দেখা যায় তরুণ মুখের ভিড়। আর যে দেশের জনসংখ্যার এত বড় অংশ তরুণ, সেই দেশ পিছিয়ে থাকতে পারে না- এটাই স্বাভাবিক। কারণ একটা জাতির শক্তি আসলে তার তরুণদের সংখ্যা আর তাদের সামর্থ্যের গুণফল।
আমি ছোটবেলা থেকে অনেক লিখেছি, অনেক অনুষ্ঠান করেছি, অনেক মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। এই এত বছরে একটা জিনিস খুব স্পষ্ট বুঝেছি-আজকের তরুণরা আগের চেয়ে অনেক বেশি সাহসী, অনেক বেশি স্বপ্নবাজ। তারা আর শুধু চাকরি খোঁজে না, তারা নিজেরাই কিছু একটা বানাতে চায়। কেউ ইউটিউবে ভিডিও বানায়, কেউ ব্যবসা শুরু করে, কেউ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হয়ে ঘরে বসে কাজ করে। নিজেই উদ্যোক্তা হয়ে সমাজ, দেশ কিংবা রাষ্ট্রে অবদান রেখে চলেছে। দেশ যে উন্নয়নের দিকে ধাবিত হচ্ছে এটা চোখে না পড়ার কোনো উপায় নেই।
সত্যি কথা বলতে, এই উন্নতি কখনোই সহজে হয়নি। এটা হয়েছে তরুণদের কঠোর পরিশ্রমে। অনেক তরুণ বিদেশে গিয়ে নানামুখী কাজ করে আমাদের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। আমাদের দেশে চাকরির বাজারে কঠিন প্রতিযোগিতা, কর্মক্ষেত্রের সুযোগ কম। এত বিপুলসংখ্যক তরুণের জন্য পর্যাপ্ত কাজের সুযোগ তৈরি করা মোটেও সহজ নয়। অনেক মেধাবী ছেলেমেয়ে চাকরি না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়ে, কেউ কেউ দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ভাবে। অনেক মেধাবী ছেলেমেয়ে বিদেশে উন্নত জীবন গড়তে পাড়ি জমাচ্ছে এটাও সত্য। এই মেধাগুলো যদি দেশে থাকতো তাহলে ভালো হতো। বিভিন্ন সেক্টরে মেধাবীদের খুবই প্রয়োজন। তাই সরকারের উচিত মেধাবীদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে তাদের দেশের জন্য কাজে লাগানো।
তরুণদের নিয়ে আমরা বরাবরই আশাবাদী। কারণ আমি দেখেছি, এই দেশের তরুণরা যখন একসঙ্গে দাঁড়ায়, তখন কতো বড় কিছু করে ফেলতে পারে। রাস্তায় নেমে ট্রাফিক সামলে দিয়েছে, বন্যার সময় নিজেদের পকেটের টাকা দিয়ে ত্রাণ নিয়ে ছুটে গেছে, কোনো অসংগতি কিছু দেখলে প্রতিবাদ করতে পিছপা হয়নি। এই তরুণরাই আমাদের ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
আমি মনে করি, তরুণদের সবচেয়ে বেশি দরকার সুযোগ। বড়রা যদি একটু হাত বাড়িয়ে দেয়, তাহলে এই তরুণরাই দেশটাকে অনেক দূর নিয়ে যাবে। শুধু বড় বড় স্বপ্নের কথা বললে হবে না, তাদের কাজ করার জায়গা করে দিতে হবে, শেখার সুযোগ করে দিতে হবে। এই বিপুল জনশক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে দেশের উন্নতি হবে। তাই সময় এখনই, সুযোগ তৈরি করার।
একটা কথা প্রায়ই আমি বলি-একটা দেশ ততটাই এগিয়ে যায়, যতটা তার তরুণরা এগিয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে যে আগুন আছে, যে জেদ আছে, তা যদি সঠিক পথে চালিত করা যায়, তাহলে এই দেশ একদিন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে বিশ্বের সামনে গর্বের সঙ্গে মাথা তুলে দাঁড়াবে।
আমি বিশ্বাস করি তরুণরাই বাংলাদেশ, আর বাংলাদেশই তরুণদের। এই সম্পর্কটা যত মজবুত হবে, দেশটাও তত সুন্দর হবে। কারণ আজকের তরুণরাই আগামীর বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে।
