তিনদিনের রাষ্ট্রীয় সফরে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন পরাশক্তি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। বিশ্বব্যবস্থায় চীন যে এখন কতোটা গুরুত্বপূর্ণ তার প্রমাণ ইতিমধ্যে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। স্থানীয় সময় বুধবার শি যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছালে বিমানবন্দরে হাজির হন ট্রাম্প। মেরিল্যান্ডে মার্কিন বিমান বাহিনীর ঘাঁটি জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে চীনের প্রেসিডেন্টকে লালগালিচা অভ্যর্থনা জানান। স্বল্প সময়ের জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা হলেও শক্তিশালী দুই নেতা ও তাদের স্ত্রীরা করমর্দন করেন এবং তাদের মধ্যে সংক্ষিপ্ত কথোপকথন হয়। এরপর মার্কিন বাহিনী অতিথিদের সম্মানে কামান থেকে গোলাবর্ষণ করে ও একটি বি-ওয়ান বোমারু বিমান উপর দিয়ে উড়ে যায়।
মার্কিন গণমাধ্যম সি-স্প্যান বলছে, ১১ বছরের মধ্যে প্রথম একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে বিদেশি নেতাকে স্বাগত জানালেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, শি’র সফর কতোটা গুরুত্বপূর্ণ, এই বিষয়টি তা তুলে ধরেছে।
বৃহস্পতিবার দুই নেতার বৈঠক ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনীতি ও পরাশক্তির এই বৈঠকে শুল্ক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ইরান যুদ্ধ এবং তাইওয়ান— এসব ইস্যু আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে।
এরই মধ্যে একটি সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন তাদের বাণিজ্য যুদ্ধ বিরতির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে। নভেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত এই বিরতি অন্তত ১০ই জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
বৈঠক হওয়ার আগেই লিখিত এক বিবৃতিতে শি বলেছেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ‘প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অংশীদার’ হওয়া।
২০১৭ সালে প্রথমবার ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করার সময়ের তুলনায় শি এখন অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থানে। সেই সময় চীন মার্কিন বাণিজ্য ও প্রযুক্তির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু গত ৯ বছরে বেইজিং এই দুই ক্ষেত্রে নিজেদের দুর্বলতা কমাতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করেছে।
বর্তমানে ১২০টিরও বেশি দেশের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার চীন। নিজেদের পণ্য বিক্রির জন্য দেশটি আর যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল নয়। ট্রাম্পের আরোপ করা বাণিজ্য শুল্কের চাপও চীন সামলে উঠেছে।
চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রযুক্তিগত ব্যবধানও অনেকটাই কমিয়ে এনেছে। বর্তমানে বিশ্বের বিপুলসংখ্যক হিউম্যানয়েড রোবট চীনে তৈরি হচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাজার হিসেবে নিজেদের অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে চীন প্রভাব বিস্তার করেছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের মধ্যেও।
বর্তমানে শি এমন একজন শক্তিশালী ও স্থিতিশীল নেতার ভাবমূর্তি তুলে ধরার চেষ্টা করছেন, যার বিপরীতে ট্রাম্পকে দেখা হয় একজন অনিশ্চিত বা অপ্রত্যাশিত নেতা হিসেবে।
শীর্ষ এই বৈঠককে ঘিরে যে বিশাল আয়োজন করা হয়েছে, সেটিও শি’র জন্য একটি কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এর মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে ট্রাম্পের সমকক্ষ নেতা হিসেবে শি’র অবস্থান আরও জোরালো হচ্ছে।
বৈঠক শুরু হওয়ার মুহূর্তে শি মনে করবেন, কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের সুবিধাজনক অবস্থানটি এখন তার হাতেই।
অন্যদিকে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে চাপের মধ্যে আছেন ট্রাম্প। ইরান যুদ্ধ ঘিরে ইতিমধ্যে দেশটিতে জ্বালানির দাম ঊর্ধগতিতে। এতে মার্কিন ভোটাররা ব্যাপক ক্ষুব্ধ।
রয়টার্স/ইপসোসের সর্বশেষ জরিপে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। সার্বিকভাবে মাত্র ৩২ ভাগ মার্কিনি তাকে সমর্থন করছেন।
এ ছাড়া শি’র সফর থেকে ট্রাম্পের তেমন বড় অর্জন হওয়ার সুযোগ খুবই কম। সেই সঙ্গে শি’র এই সফরকে কেন্দ্র করে ট্রাম্প তার ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা ‘মাগা’ সমর্থকদের একাংশের ক্ষোভের ঝুঁকিতেও রয়েছেন।
বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, দুই নেতার মধ্যে বৈঠক থেকে বাস্তবসম্মত ফলাফল খুব বেশি আসার সম্ভাবনা নেই। সীমিত যেসব ফল আসতে পারে তার মধ্যে, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধি, ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে স্থিতিশীলতা তৈরিতে নতুন পদক্ষেপ এবং এআই, ফেন্টানিলের প্রবাহ, বাণিজ্য ও সামরিক সংঘাত এড়ানোর ক্ষেত্রে কিছু ছোটখাটো উদ্যোগ।
