সরকারের চাপ নয়, শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষা ও সামগ্রিক বাস্তবতা বিবেচনায় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সূচিতে পরিবর্তন আনছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নভেম্বর-ডিসেম্বরে নির্বাচন আয়োজনের পরিবর্তে আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে ধাপে ধাপে ইউপি নির্বাচন শুরুর পরিকল্পনা করছে কমিশন। তবে এখনো কোনো নির্দিষ্ট তারিখ চূড়ান্ত হয়নি।
বৃহস্পতিবার আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার এসব কথা জানান। জানুয়ারি থেকে ইউপি নির্বাচন শুরু হতে পারে কিনা জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার বলেন, সাধারণত বার্ষিক পরীক্ষা নভেম্বর-ডিসেম্বরের মধ্যে হয়। সেই বিবেচনা করেই সময়সূচি নির্ধারণ করা হবে। পরীক্ষাগুলো ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হয়ে গেলে জানুয়ারির দিকে নির্বাচন করা সম্ভব হবে।
ইসি কি সরকারের চাপে নির্বাচন পিছিয়ে দিচ্ছে— এমন প্রশ্নের জবাবে আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘মোটেই না। ইসি সংবিধান ও আইনের বাইরে গিয়ে কোনো কাজ করে না। সংবিধান, আইন এবং বাস্তবতা বিবেচনা করে কমিশন সিদ্ধান্ত নেয়। বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষিতে আমাদের কোমলমতি লাখ লাখ ছাত্র-ছাত্রীর যাতে লেখাপড়ায় বিঘ্ন সৃষ্টি না হয়, সেই দিক বিবেচনায় আমরা সম্ভাব্য তারিখ বলেছিলাম। তা একটু সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।’
এর আগে আগামী ১২ই নভেম্বর প্রথম ধাপসহ চলতি বছর দুই ধাপে ইউপি নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাব্য সময়ের কথা বলা হয়েছিল। সেই সময় পরীক্ষা ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় নেয়া হয়নি কেন— এমন প্রশ্নের জবাবে আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, অনেকগুলো বিষয় বিবেচনা করে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে ইসি। ইসি’র কাজ হলো আইনের মধ্যে থেকে সংবিধান অনুযায়ী কাজ করা।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সম্ভাব্য একটি তারিখ ঘোষণা করেছিলাম। পরে দেখা গেল, ১২ তারিখের পরই প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হবে। বন্যায় ইন্টারমিডিয়েটের কিছু পরীক্ষা পিছিয়ে যাওয়ায় সেগুলোর সমন্বয় ও সিলেবাস শেষ করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বাড়তি চাপ নিতে হচ্ছে। কিছু এলাকায় বন্যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাস্তাঘাটও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
তার ভাষ্য, সব মিলিয়ে পরীক্ষার আগে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা শুরু হলে শিক্ষার্থীরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়বে। লাখ লাখ প্রার্থীর সন্তানরাও পরীক্ষার্থী। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ডিসেম্বরের বিষয়টিও আরও নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করেছে নির্বাচন কমিশন।
আগামী বছরের শুরুতে রমজান, ঈদ এবং বিভিন্ন পরীক্ষা থাকায় কীভাবে তফসিল করা হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, রমজান মাস, ঈদ, পূজা, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা—এসব খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সবকিছুর জন্য সময়ের মধ্যে উপযুক্ত ‘স্লট’ বের করে নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে কমিশন চিন্তাভাবনা করছে।
জানুয়ারিতে নির্বাচন শুরু করে আগামী ৬ই জুনের মধ্যে ইউপি নির্বাচন শেষ করা সম্ভব কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সবকিছুই সম্ভাব্য। ৬ই জুনের মধ্যে নির্দিষ্টভাবে শেষ করার বিষয় নয়, একটি সময়সীমা ধরে আমরা চিন্তাভাবনা করছি।’ তিনি আরও বলেন, এর মধ্যে মামলা-মোকদ্দমা নিষ্পত্তি হলে ইউনিয়নের সংখ্যা আরও বাড়বে। সীমানা-সংক্রান্ত বিরোধ, নতুন ইউনিয়ন সৃষ্টি ও অন্যান্য আইনি জটিলতা রয়েছে। সবকিছু হিসাবনিকাশ করেই ধাপে ধাপে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা করা হবে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের চিঠি পাওয়ার পরই ইসি ভোটের উদ্যোগ নেবে কিনা, এমন প্রশ্নে আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের চিঠি চালাচালির কোনো রেওয়াজ তিনি দেখেননি। মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে বলে সরকারের একাধিক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী যে মন্তব্য করেছেন, সে বিষয়ে কথা বলতে চাননি তিনি। তবে তথ্য আদান-প্রদান হবে বলে জানান নির্বাচন কমিশনার। ইউনিয়নগুলো নির্বাচন উপযোগী কিনা, মামলা-মোকদ্দমা, সীমানা নির্ধারণ ও মেয়াদ পূর্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় তথ্য চাইলে সংশ্লিষ্টরা তা দেবে বলে জানান তিনি। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই কর্মপরিকল্পনা তৈরি হবে।
এর আগে ১২ই নভেম্বর শুরু করে সাত ধাপে ইউপি নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সূচি ঘোষণা করেছিল ইসি। ১৭ই সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে এ পরিকল্পনা নিয়ে মতবিনিময় করে ইসি। সেখানে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, নভেম্বর-ডিসেম্বরে নির্বাচন করার সুযোগ তারা দেখছে না। পরে ইসি জানায়, আরও আলোচনা করে নির্বাচনের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করা হবে।
