নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার দীর্ঘ পথচলা

নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার দীর্ঘ পথচলা

ফন্ট সাইজ:

আজ বিকেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মঞ্চে উঠে আমাদের মাতৃভাষা বাংলায় বিশ্বের উদ্দেশে বক্তব্য দেবেন, তখন তিনি একা দাঁড়াবেন না। তার পাশে থাকবে আততায়ীর গুলিতে নিহত এক পিতার স্মৃতি। তার পাশে থাকবেন সেই মা, যিনি কারাবন্দি হয়েছেন, নিগৃহীত হয়েছেন এবং জীবনের শেষ বছরগুলোতে যথাযথ চিকিৎসা ও যত্নের মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তার পাশে থাকবে সেই ছোট ভাইয়ের স্মৃতি, যিনি পরিবারের আলিঙ্গন থেকে দূরে, নির্বাসনে থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন। আর তার পেছনে থাকবে কোটি কোটি সাধারণ বাংলাদেশি, যারা দীর্ঘ ১৭টি তিক্ত বছর ধরে শুধু একটি সাধারণ অধিকারের অপেক্ষায় ছিলেন। সেটা ছিল তাদের স্বাধীনভাবে ভোট দেয়ার অধিকার।
খুব কম নেতাই এমন ভার বহন করে ওই মঞ্চে হেঁটে গেছেন। আর সেখানে পৌঁছাতে এত বড় মূল্য আরও কম নেতাকেই দিতে হয়েছে।

একটি পরিবারের গল্প যখন একটি জাতির গল্প
১৯৮০ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান জাতিসংঘের এই একই হলে দাঁড়িয়ে ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য, ক্ষুধা এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য একটি গর্বিত জাতির দৃঢ় সংকল্পের কথা বলেছিলেন। ১৯৯৩ সালে বেগম খালেদা জিয়া সেখানে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন। তিনি সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন গণতন্ত্রে নতুন করে জন্ম নেয়া একটি জাতির আশা।
আজ তাদের ছেলে একই পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে বিশ্বের সামনে বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর তুলে ধরছেন। কেউ যেন একে কোনো বংশগত উত্তরাধিকার বলে অভিহিত না করেন। এটি তিনবার অর্জন করা হয়েছে- তা কোনো ফরমানের মাধ্যমে নয়, শক্তি প্রয়োগ করে নয়; বরং জনগণের ইচ্ছায়, ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে। তবু, এটি আরও অনেক আগেই এবং এত কম মূল্য দিয়ে অর্জিত হতে পারত।

যে বছরগুলোকে কেড়ে নেয়া হয়েছে
২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। হেফাজতে থাকা অবস্থায় তার শরীরের হাড় ভেঙে দেয়া হয়। ২০০৮ সালে তিনি চিকিৎসার জন্য লন্ডনে চলে যান; ওই সময়ের নির্যাতনের ক্ষত তখনও তার শরীরে ছিল। এরপর ১৭ বছর তিনি আর নিজের দেশের মাটিতে পা রাখতে পারেননি। এই বছরগুলোতে একের পর এক মামলায় তার অনুপস্থিতিতে সাজা দেয়া হয়। পরবর্তীতে এসব রায়ের কিছু বাতিল করা হয়। তিনি বরাবরই এসব মামলাকে রাজনৈতিক নিপীড়ন বলে অভিহিত করেছেন। বেতার ও টেলিভিশনের প্রচারমাধ্যম থেকে তার নাম মুছে ফেলা হয়। এমনকি তার বক্তব্যও নিজের জন্মভূমিতে সম্প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছিল। বাংলাদেশের এক সন্তানকে বাংলাদেশের কাছেই একজন অপরিচিত মানুষে পরিণত করা হয়েছিল।

ভাবুন, কী হারিয়েছে দেশ! জীবনের সবচেয়ে কর্মক্ষম সময়ে থাকা একজন নেতাকে একটি গণতন্ত্র যে সবচেয়ে মৌলিক স্বাধীনতা দিতে পারে, তা থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছিল। সেটা হলো নিজের জনগণের সামনে দাঁড়ানো, তাদের কাছে গিয়ে নির্বাচনী প্রচার চালানো, তাদের চোখে চোখ রেখে ভোট চাওয়ার অধিকার। তার মা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। তাকে ২০১৮ সালে কারাগারে অন্তরীণ করা হন। তার ভাই আরাফাত রহমান কোকো নির্বাসনে মারা যান। দলের লাখ লাখ কর্মী মিথ্যা মামলা, গুম, নির্যাতন ও হত্যার শিকার হন। তাদের কাউকেই স্বাভাবিকভাবে রাজনীতি করার সুযোগ দেয়া হয়নি। তাদেরকে যদি অবাধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ দেয়া হতো, তাহলে বাংলাদেশ হয়তো বহু বছর আগেই আরও ন্যায়সংগত রাজনীতি, আরও স্বচ্ছ অর্থনীতি এবং আরও সমৃদ্ধ জনগণের দেখা পেত। তারেক রহমান, বেগম খালেদা জিয়া এবং বিএনপিকে যদি একটি অবাধ প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার সুযোগ দেয়া হতো, তাহলে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি কতটা ন্যায়সংগত, অর্থনীতি কতটা স্বচ্ছ এবং জনগণ কতটা সমৃদ্ধ হতে পারত- কে জানে? এর পরিবর্তে দেশকে দেয়া হয়েছিল ১৫ বছরের একতরফা শাসন।

প্রহসনকে বৈধতা দেয়ার ক্ষেত্রে অস্বীকৃতি
২০১৪ সালে যখন অবাধ ভোট অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন তারেক রহমান একটি সাজানো নির্বাচনে নিজে যুক্ত হতে অস্বীকৃতি জানান। ২০১৮ সালে বিএনপি বেগম জিয়াকে কারাগারে রেখেই প্রক্রিয়াটিকে শেষবারের মতো সুযোগ দিয়েছিল। কিন্তু তখন জাতি প্রত্যক্ষ করে, ভোটগ্রহণের আগের রাতে কথিতভাবে ব্যালট বাক্সে ব্যালট ঢোকানো হয়। ২০২৪ সালেও তিনি আবার সেই প্রহসনের নির্বাচনে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানান। বিশ্ব তাকে সমালোচনা করেছিল। ভাষ্যকাররা এসব নির্বাচন বর্জনকে ভুল সিদ্ধান্ত বলে অভিহিত করেন। কিন্তু তারেক রহমান ঠাণ্ডা মাথা ও শান্ত মন নিয়ে নিজের অবস্থানে অটল ছিলেন। কয়েক হাজার মাইল দূরে থেকেও তিনি তার দলকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছিলেন, কর্মীদের পাশে ছিলেন এবং নীতির সঙ্গে কখনো আপস করেননি। তিনি বুঝেছিলেন, তার সমালোচকরা যা বুঝতে পারেননি: গণতন্ত্রের নকল সংস্করণে অংশ নিয়ে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা যায় না।

অপেক্ষার সময়ে দেশে রক্তক্ষরণ
বিরোধীদের যখন নীরব করে দেয়া হচ্ছিল, তখন দেশকে ভেতর থেকে শূন্য করে দেয়া হচ্ছিল। সরকারের একটি শ্বেতপত্রের হিসাব অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার। এটি কোনো বিমূর্ত বিষয় ছিল না। এটি ছিল আমাদের কৃষকদের ঘাম, পোশাকশ্রমিকদের সেলাই করা প্রতিটি পোশাকের শ্রম এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর মরুভূমি থেকে প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সের অর্থ। সেই অর্থ ব্যবহার করা হয়েছে দুবাই, লন্ডন ও টরন্টোর প্রাসাদোপম বাড়িতে। অন্যদিকে আমাদের ব্যাংকগুলোকে ফাঁপা করে দেয়া হয়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিঃশেষ হয়ে গেছে। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা যখন হেলিকপ্টারে করে ভারতে চলে যান, ততদিনে ক্ষতি হয়ে গেছে এবং তার এই শাসনের শেষ ঘটাতে শত শত তরুণ বাংলাদেশি রাজপথে জীবন দিয়েছেন।

দেশে ফেরা
২০২৫ সালের বড়দিনে, ১৭ বছর পর তারেক রহমান দেশে ফেরেন। বিমান থেকে নামার পর তিনি জুতা খুলে খালি পায়ে বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন। এরপর নিচু হয়ে এক মুঠো মাটি তুলে নেন- যে মাটি থেকে তাকে জীবনের অর্ধেকেরও বেশি সময় দূরে রাখা হয়েছিল। বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার সময় প্রায় ১০ লাখ মানুষ তাকে স্বাগত জানায়। এরপর তিনি সরাসরি চলে যান অসুস্থ মায়ের শয্যাপাশে। পাঁচ দিন পর বেগম খালেদা জিয়া চিরবিদায় নেন। তার ওপর চালানো নিষ্ঠুরতাু সহ্য করার পরও তিনি এতটুকু সময় বেঁচে ছিলেন, যাতে তার ছেলে দেশে ফিরে আসতে পারেন। তিনি মাকে দাফন করেন। নীরবে নিজের শোক বয়ে নিয়ে চলেন। এরপর তিনি তার দলকে নেতৃত্ব দিয়ে বিপুল বিজয় অর্জন করেন। ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর পদে শপথ নেন তারেক রহমান। আর প্রথম ভাষণেই তিনি ঘোষণা করেন- যারা বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন, যারা ভোট দেননি এবং যারা কোনো ভোটই দেননি, এই সরকারের কাছে সবার অধিকার সমান। এটি ছিল প্রতিশোধের নয়, নিরাময় ও ঐক্যের প্রতিশ্রুতি।

বিশ্বমঞ্চে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’
এর সাত মাস পর একটি সুস্পষ্ট কৌশলের সুফল দৃশ্যমান হচ্ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এখন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছেন। কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটে জয়ী হয়ে তিনি এই পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন- ইতিহাসে দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে তিনি এই দায়িত্ব পালন করছেন। এই অধিবেশনের ফাঁকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স আরও ১১টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে। চলতি বছরের ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের অর্ডারের ওপর ভিত্তি করে এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের অংশীদারিত্ব আরও গভীর করছে। একই সময়ে আমরা চীনে একটি সফল সফর শেষ করে ফিরেছি এবং ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কও ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এখনো বাংলাদেশের একক বৃহত্তম রপ্তানি বাজার।

গত অর্থবছরে দেশটি বাংলাদেশের ৭ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের পোশাক কিনেছে, আগের বছরের ৭ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় যা বেশি। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধের কঠিন সময়ের পর শুধু আগস্ট মাসেই রপ্তানি ২৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এখন রপ্তানিকারকরা ৯ বিলিয়ন ডলারের দিকে এগোনোর সম্ভাবনার কথা বলছেন। এটি সিঙ্গাপুরের মতো একটি ভারসাম্য রক্ষার কৌশল- সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও ওপর নির্ভরশীল না থাকা এবং সবসময় ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’। আর এই কৌশল বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে গ্যাস ও জ্বালানি সংকটের মধ্যেও। বছরের পর বছর ধরে সম্পদ লুটের ফলে যখন রিজার্ভ কমে গেছে, তখন সরকার স্থানীয় মুদ্রা টাকা স্থিতিশীল রাখা এবং সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের খাবারের সংস্থান নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে।

আজকের দিনের তাৎপর্য
আজকের এই ভাষণ কোনো একজন মানুষের বিজয় নয়। এটি সেই প্রতিটি দলীয় কর্মীর, যিনি কারাগারের কক্ষে রাত কাটিয়েছেন। এটি সেই প্রতিটি মায়ের, যিনি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে এমন এক ছেলের অপেক্ষা করেছেন, যে আর কখনো বাড়ি ফিরে আসেনি। এটি সেই প্রতিটি তরুণ-তরুণীর, যারা ২০২৪ সালের জুলাইয়ে রাজপথে প্রাণ হারিয়েছেন, যাতে বাংলাদেশ আবার ভোট দেয়ার সুযোগ পায়। আজ বিকেলে যখন তারেক রহমান নিউইয়র্কে বক্তব্য দেবেন, বিশ্ব একজন প্রধানমন্ত্রীকে শুনবে। আর বাংলাদেশ শুনবে আরও কিছু- দীর্ঘদিন ধরে নীরব করে রাখা একটি জনগণের কণ্ঠস্বর, যা অবশেষে মর্যাদার সঙ্গে বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছাবে।

(লেখক প্রতিষ্ঠাতা ও গ্রুপ সিইও, এমজিএইচ গ্রুপ। অনলাইন ওয়াদা থেকে অনুবাদ)