চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় উপাচার্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। সদ্য সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে সোমবার রাত থেকে বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার সকাল থেকে তারা ক্যাম্পাসে সর্বাত্মক শাটডাউন কর্মসূচি পালন করছেন। একই দাবিতে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও মানববন্ধন করেছেন।
সোমবার রাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। প্রেসিডেন্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যের অনুমোদনক্রমে চুয়েট আইন, ২০০৩-এর ১০ (১) ধারা অনুযায়ী তাকে এ পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নতুন উপাচার্য নিয়োগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে চুয়েটের স্বাধীনতা চত্বর থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন একাডেমিক ভবন, ছাত্রী হল ও শিক্ষক আবাসিক এলাকা প্রদক্ষিণ করে রাত ১২টার দিকে স্বাধীনতা চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। পরে শিক্ষার্থীরা উপাচার্য ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেন।
মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে অবস্থান নেন। একপর্যায়ে মূল ফটকে তালা দিয়ে তারা সর্বাত্মক অবরোধ ও শাটডাউন কর্মসূচি শুরু করেন। তাদের দাবি, অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনরায় উপাচার্য পদে বহাল করতে হবে। একই সঙ্গে নবনিযুক্ত উপাচার্যের ক্যাম্পাসে প্রবেশ ঠেকাতেও অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই অধ্যাপক সায়েমকে মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় সরিয়ে দেয়া হয়েছে। যন্ত্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সাকিব হাসান বলেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাদের কর্মসূচি চলবে।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি জানিয়েছে চুয়েট শিক্ষক সমিতি। মঙ্গলবার বেলা ১১টায় প্রশাসনিক ভবনের সামনে মানববন্ধন করে সংগঠনটি অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবি জানায়। একই সঙ্গে উপাচার্য নিয়োগ ও অব্যাহতি-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে তারা। মানববন্ধনে কর্মকর্তা ও কর্মচারী সমিতির সদস্যরাও অংশ নেন। চুয়েটের স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. রাশেদুল হাসান বলেন, অধ্যাপক সায়েম দায়িত্ব নেয়ার পর এক মাস ২২ দিনের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজের গতি ও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছিল। তাকে কেন সরিয়ে দেয়া হলো, তার সুস্পষ্ট ও যৌক্তিক কারণ জানতে চান তিনি। তবে নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম চুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থী হওয়ায় তার প্রতি সম্মান রয়েছে বলেও জানান তিনি।
চুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. বশির জিসান বলেন, একজন উপাচার্যকে পদে রাখার দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নামা বিরল ঘটনা। তার ভাষ্য, শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা অধ্যাপক সায়েমের পুনর্বহাল চান এবং নতুন নিয়োগের প্রজ্ঞাপন প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়ার বিষয়টি অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমও আগে থেকে জানতেন না বলে জানিয়েছেন। ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের দাপ্তরিক কাজে গিয়ে গণমাধ্যমের মাধ্যমে তিনি নতুন নিয়োগের খবর জানতে পারেন। তিনি বলেন, ‘আমি ব্যাক করবো ক্যাম্পাসে।’ অধ্যাপক সায়েম গত ২৭শে জুলাই চার বছরের জন্য চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। তার আগে ২০২৪ সালের ৩০শে অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্যের দায়িত্ব নেন অধ্যাপক মাহমুদ আব্দুল মতিন ভূঁইয়া। সায়েমকে সরিয়ে দেয়ার ফলে দুই বছরের মধ্যে চুয়েটে তৃতীয়বারের মতো উপাচার্য পরিবর্তন হলো।
নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম এর আগে কুয়েটের উপ-উপাচার্য ছিলেন। গত ২৫শে এপ্রিল শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে তাকে কুয়েটের উপ-উপাচার্যের পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাছুদ কামালকেও পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল। চুয়েটে নতুন উপাচার্য নিয়োগের প্রজ্ঞাপনে পরিবর্তনের কারণ উল্লেখ করা হয়নি। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম যোগদানের তারিখ থেকে চার বছর অথবা অবসর গ্রহণের তারিখ-যেটি আগে হবে- সেই সময় পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন। নতুন উপাচার্য কবে দায়িত্ব নেবেন, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
এদিকে মঙ্গলবার দিনভর শিক্ষার্থীদের শাটডাউন কর্মসূচির পাশাপাশি শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মানববন্ধন এবং পুনর্বহালের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি চলেছে। ফলে উপাচার্য পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে চুয়েটে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
