অনিয়ম ঠেকাতে সরকারি বাসা বরাদ্দ অনলাইনে

অনিয়ম ঠেকাতে সরকারি বাসা বরাদ্দ অনলাইনে

ফন্ট সাইজ:

অনিয়ম ও দুর্নীতি রোধে সরকারি আবাসনের বাসা বরাদ্দ এখন থেকে পুরোপুরি অনলাইনে। ম্যানুয়াল প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি ঠেকাতেই সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ঢাকা শহরে প্রত্যাশার তুলনায় আবাসনের সংখ্যা 
অতি নগণ্য হওয়ায় বাসা বরাদ্দ নিয়ে গড়ে ওঠা দালাল সিন্ডিকেটকে রুখতেই সরকার এই পথে হেঁটেছে। চলতি মাসের ১৭ই সেপ্টেম্বর সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের আওতাধীন বাস বরাদ্দ অনলাইন পদ্ধতিতে আবেদন করার কথা উল্লেখ করে সংস্থাটির পরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম খান স্বাক্ষরিত একটি বিজ্ঞপ্তিও ইতিমধ্যে জারি করেছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সরকারি কর্মচারীদের এ দপ্তরের কার্যক্রম নিয়ে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। ঢাকা শহরে সরকারি বাসা পাওয়া যেন স্বর্ণের হরিণ। প্রত্যাশার তুলনায় আবাসনের সংখ্যা অতি নগণ্য হওয়ায় বাসা বরাদ্দ নিয়ে গড়ে উঠেছে দালাল সিন্ডিকেট। ঢাকায় চাকরিরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তুলনায় মাত্র প্রায় ৮ শতাংশ বাসা বরাদ্দের সক্ষমতা রয়েছে সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের। এই অক্ষমতার সুযোগে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটটি অসহায় সাধারণ বাসা বরাদ্দ প্রত্যাশীদের একপ্রকার জিম্মি করছে। অভিযোগ রয়েছে, তাদের তৈরি করা ঘুষ বাণিজ্যের প্রক্রিয়ার পথে না হাঁটলে বাসা মিলে না। প্রভাবশালীদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকায় এরাই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে এবং পরিদপ্তরের সৎ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নানাভাবে হয়রানি করে। পরিদপ্তরের এই অনলাইন সক্ষমতা ২০২০ সাল থেকে থাকলেও নানাবিধ চাপ আর অসাধু সিন্ডিকেটের চাপে তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। পরিদপ্তরটির সূত্র বলছে, সেবা প্রদানে স্বচ্ছতা আনয়নে সরকারি প্রথম দপ্তর হিসেবে অনলাইন পদ্ধতিতে গেলো সরকারি আবাসন পরিদপ্তরটি। সরকারি আবাসন পরিদপ্তর তার আওতাধীন সকল বাসা অনলাইনে পদ্ধতিতে বরাদ্দ প্রদান করবে, যা সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২০ সালেই পরিদপ্তরটি অনলাইনে বা ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় বাসা বরাদ্দ দেয়ার সক্ষমতা তৈরি করে। কিন্তু অনিয়মকে জিইয়ে রাখতে পরিদপ্তরের সক্রিয় একটি চক্রটি এতদিন কাজ করেছে। অনিয়ম তুলে ধরে মানবজমিনও প্রতিবেদন করেছিল। সরকারি বাসা বরাদ্দে অনিয়ম হচ্ছে বিষয়টি স্বীকার করে গত বছরের জুলাই মাসের মাঝামাঝি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত তৎকালীন উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান এ প্রতিবেদককে বলেছিলেন, কিছু অনিয়ম আছে। বিষয়টি জানি। সেই অনিয়মগুলো আমরা সমাধানে চেষ্টা করছি। এক্ষেত্রে অনলাইন প্রক্রিয়া হচ্ছে ভালো পথ। অবশেষে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর অনলাইনের যাওয়ার এই ঘোষণায় সিন্ডিকেটটির কপালে ভাঁজ পড়েছে।

পরিদপ্তর সূত্র মতে, সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের বর্তমানে সব ক্যাটাগরি মিলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসা বরাদ্দ দেয়ার সক্ষমতা আছে ১৯ হাজার ৯১টি। অন্যদিকে, ঢাকায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন ২ লাখ ৫৩ হাজারের কিছু বেশি। এতে হিসাব করে দেখা যায়, মাত্র ৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসা বরাদ্দ দেয়ার সক্ষমতা রয়েছে সংস্থাটির। আবার ঢাকার কিছু কিছু এলাকায় মাসে বাসা বরাদ্দের সক্ষমতার তুলনায় চাহিদা বা আবেদন পড়ে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশের উপরে। কিন্তু সংস্থাটির বাসা বরাদ্দের সক্ষমতা মাত্র প্রায় ৮ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি বাসা বরাদ্দ পেতে আবেদন জমা পড়ে রাজধানীর আজিমপুর এলাকায়। এই এলাকায় মাসে গড়ে ৮ থেকে ১০টি বাসা খালি হলেও গড়ে প্রতি মাসে বাসা পেতে ৭০০’র বেশি আবেদন জমা থাকে পরিদপ্তরে। এরপর বেশি চাহিদা রয়েছে মতিঝিল ও ইস্কাটন এলাকায়। এসব গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় একটি বাসা খালি হলেই বরাদ্দ পেতে হুমড়ি খেয়ে পড়েন প্রত্যাশীরা। তখন তারা বড় বড় তদবির এবং সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ঘুষ বাণিজ্যে এগুতে থাকেন বাসা পেতে।

সরকারি আবাসন পরিদপ্তর গ্রেডভিত্তিক সরকারি কর্মচারীদের বিভিন্ন শ্রেণির বাসা রয়েছে। যেমন সচিব ভবনে ১১৪টি ফ্ল্যাট গ্রেড ওয়ান ও সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য। গ্রেড ৩ তথা যুগ্ম সচিব ও তদূর্ধ্ব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য সুপিরিয়র শ্রেণির ৫৫৪টি বাসা। গ্রেড ৫ ও তদূর্ধ্ব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য এফ শ্রেণির ১৪৭৭টি বাসা, গ্রেড ৬ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য ই-শ্রেণির ১৪৭০টি বাসা, ৭/৮/৯ গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য ডি-১ শ্রেণির ২৩৮২টি বাসা, ১০/১১/১২ গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য ডি-২ শ্রেণির ৪৪৭০টি বাসা ও ১৩-২০ গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য ৭২৩২টি বাসা রয়েছে। এ ছাড়াও অস্থায়ী (পূর্ণ ও নির্ধারিত ভাড়া) ও অস্থায়ী (একক আসন) কিছু বাসা রয়েছে।

সূত্র মতে, সরকারি বাসা, অফিস কিংবা গ্যারেজ বরাদ্দ দিয়ে থাকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘সরকারি আবাসন পরিদপ্তর’। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার আজিমপুর, জিগাতলা, মিরপুর, তেজগাঁওসহ কয়েকটি সরকারি আবাসিক এলাকার কম উচ্চতার ভবন ভেঙে ২০ তলা ও ১২ তলা ভবন নির্মাণ করেছে। তবুও সংকট পুরোপুরি কাটেনি।