চবি থেকে স্নাতকোত্তর মিজান থাকেন সরকারি আশ্রয়ণের ঘরে

চবি থেকে স্নাতকোত্তর মিজান থাকেন সরকারি আশ্রয়ণের ঘরে

ফন্ট সাইজ:

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে স্নাতকোত্তর মিজান মিয়ার বসবাস সরকারি আশ্রয়ণের ঘরে। সেখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে নক্ষত্র হলেও তার পুরো জীবনই ঢেকে আছে গাঢ় অন্ধকারে। দৃষ্টিহীনতা-দরিদ্রতা তার শিক্ষাগ্রহণে বাধা হতে পারেনি। কিন্তু দুঃখ-কষ্টের পথ পাড়ি দেয়া শেষ হয়নি এখনো তার। নিজের জন্য উপযুক্ত চাকরি মিলছে না। হাসপাতালে স্ত্রী’র আয়ার চাকরিতে চলছে সংসার। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সাদেকপুর ইউনিয়নের আদমপুর গ্রামের মৃত খোরশেদ মিয়ার ছেলে মিজান মিয়া (২৫)। তিন ভাই ও চার বোনের মধ্যে ষষ্ঠ। জন্ম থেকে দৃষ্টিশক্তি না থাকলেও সাত ভাইবোনের মধ্যে একমাত্র মিজানই উচ্চ মাধ্যমিক শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়েছেন। ২০১৭ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৪.৬৪ পান মিজান।

২০১৯ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় মিরপুরের সরকারি বাংলা কলেজ থেকে জিপিএ-৪.১৭ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন। ২০২৩ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইআর বিভাগ থেকে সিজিপিএ-২.৭৭ পেয়ে স্নাতক এবং ২০২৫ সালে একই বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। প্রথম শ্রেণিতে পড়ার সময়ে তার মা আয়েশা খাতুন এবং একাদশ শ্রেণিতে পড়াকালীন সময়ে তার বাবা খোরশেদ মিয়া মারা যান। বাবা পেশায় একজন রিকশাচালক ছিলেন। মিজান ২০২৩ সালে জেলা শহরের ভাদুঘরের হাবিবা বেগমকে বিয়ে করেন।

তাদের ঘরে একটি সন্তানের জন্ম হলেও চারদিন পরই মৃত্যু হয় নবজাতকের। ২০২৪ সালে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে সুহিলপুর ইউনিয়নের ঘাটুরা গৌতমপাড়ায় সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পে একটি ঘর বরাদ্দ নেন। বর্তমানে সেখানেই স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করছেন তিনি। তার স্ত্রী বেসরকারি ব্রাহ্মণবাড়িয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করেন। মাসে বেতন পান ৮ হাজার টাকা। এতেই টানাপড়নে চলে তাদের সংসার। মিজান চবি’র এফ রহমান হলে থাকতেন। দুইবার চাকসু’র নির্বাচনে সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) প্রকৌশল দপ্তরে টেলিফোন অপারেটর পদে বিশেষ বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়ার আবেদন করেছেন তিনি। গত ৬ই সেপ্টেম্বর উপাচার্যের কাছে চাকরির জন্য করা এই আবেদনে মিজান বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ না পাওয়ায় পরিবারকে নিয়ে অত্যন্ত কষ্ট ও আর্থিক সংকটের মধ্যে জীবনযাপন করছেন। দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতার কারণে উপযুক্ত চাকরি পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। শিক্ষাগত যোগ্যতা, যোগাযোগ দক্ষতা ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা বিবেচনায় টেলিফোন অপারেটর পদে নিয়োগের সুযোগ তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হবে।

মিজান মিয়া বলেন, বাবা যতদিন বেঁচে ছিলেন, তিনিই ততদিন আমার পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছেন। বাবার মৃত্যুর পর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষকরা সহায়তা করেছেন। পাশাপাশি স্নাতক সম্পন্ন করা পর্যন্ত ডাচ্‌- বাংলা ব্যাংক থেকে প্রতি মাসে তিন হাজার টাকা করে শিক্ষাবৃত্তি পেয়েছি। তিনি বলেন, আমি পুরোপুরি বর্তমানে স্ত্রী’র আয়ের উপর নির্ভর। তার আয়ে চলে সংসার। কিন্তু স্ত্রী অসুস্থ। বেশিদিন সেই চাকরিটি করতে পারবেন না। তাই আমার একটি চাকরি খুব প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে যদি চাকরিই না পাই তাহলে বাকি জীবন কীভাবে চলবো। ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রতিবন্ধী গ্রাজুয়েট পরিষদের একজন সদস্য মিজান। তিনি বলেন, কোনো করুণা নয়, মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরির প্রার্থনা করছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে টেলিফোন অপারেটর পদে আমাকে নিয়োগের বিবেচনা করলে বাকি জীবনটা স্বাচ্ছন্দ্যে কাটাতে পারবো।