মরিয়মকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন এমপি নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা
ছবি: এমপি গাজী নজরুল ও ইনসেটে নিহত মরিয়ম

মামলার এজাহারে বাবার অভিযোগ

মরিয়মকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন এমপি নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা

ফন্ট সাইজ:

রাজধানীতে ন্যাম ভবনের বাসা থেকে দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের ঘটনায় এমপি গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ওই মামলার এজহারে মরিয়মকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ এনেছেন নিহতের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ।

মামলার এজাহারে বাবা মাসুম বিল্লাহ অভিযোগ করেছেন, গত জুনে তার শ্যালক ওবায়দুর রহমানের ‘প্রত্যক্ষ প্ররোচনায়’ এমপি গাজী নজরুলের সঙ্গে বাদীর বড় মেয়ে মরিয়মের (১৯) বিয়ে হয়। সংসদ ভবনের বিপরীত পাশে ৫ নম্বর ন্যাম ভবনের ২০৩ নম্বর বাসায় এমপি নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদার সঙ্গে থাকতেন মরিয়ম।

আরও বলা হয়, বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নজরুল ও মাকছুদা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন বলে মরিয়ম তার পরিবারকে জানিয়েছিলেন। এর মধ্যে রোববার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে নজরুল মোবাইল ফোনে বাদীকে দ্রুত বাসায় যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে মরিয়মকে গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলে থাকতে দেখেন বাবা মাসুম বিল্লাহ।
তিনি এজাহারে আরও লিখেছেন, লাশ উদ্ধারের সময় মেয়ের বিছানার ওপরে তার লেখা ‘সুইসাইড নোট’ দেখতে পান।

একটি চিরকুটে লেখা আছে, ‘শুধু মায়ায় পড়েছি বলে বারবার তোমার কাছে নত হই…তা না হলে যতটা সস্তা ভাবছো ততটা সস্তা আমি নই…।’
আরেকটিতে লেখা, ‘আমি অতি বিশ্বাস করে যুদ্ধে নেমেছিলাম তার সাথে, জিততে পারিনি হেরে গেলাম ময়দানে। জিতবইবা কেমনে, যুদ্ধের শেষ প্রান্তে যেয়ে দেখি তুমিতো ছিলে বিপক্ষের সেনাপতি।’
‘আমি হেরেছি তুমি জিতেছো, কারণ আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম বলেই তো ঠকিয়ে জিততে পেরেছো। আমি ধ্বংসের শেষ দাঁড়িয়েও মুখে হাসি রেখেছি। ভেবে নাও এই হাসির কারণই হবে তোমার ধ্বংসের কারণ।’—এটি লেখেন আরেকটি চিরকুটে।
আরেকটি চিরকুটে আছে দু‘টি লেখা। একটিতে আছে, ‘সে ছিলো অন্য নারীর স্বামী। কাগজে কলমে অধিকার ছিল তার বউ এর…!!! আর আমি ছিলাম বোকা…!!!অন্য কারো স্বামীকে বানিয়েছিলাম নিজের শখের পুরুষ…!!!’
অপরটিতে লেখা আছে, ‘কাউকে অর্ধেক পাওয়ার চেয়ে হারিয়ে ফেলা বেশির সম্মানের। কারণ ভালোবাসা কখনোই ভাগ করে নেয়ার বিষয় নয়…ভালোবাসা হয় সম্পূর্ণ, না হয় অপূর্ণ!’

উল্লেখ্য, গতকাল রোববার সন্ধ্যায় সংসদ ভবনের উল্টোদিকের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে এমপি গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদাকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। 

এর আগে গত জুলাইয়ে মরিয়মের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসের শূরা সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের একান্ত মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের মিডিয়া সেল থেকে দাবি করা হয়- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি করা একটি ভুয়া ভিডিও। পরদিন কয়েকটি ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান দাবি করে, ভিডিও এআই দিয়ে বানানো নয়। এসব নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই গাজী নজরুল নিজেই দাবি করেন, ভিডিওতে দেখা যাওয়া ওই তরুণী (মরিয়ম) তার দ্বিতীয় স্ত্রী এবং তাকে তিনি তার প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে বিয়ে করেছেন।

আলোচনার মাঝেই গত ২২শে জুলাই অনৈতিক সম্পর্কের প্রতিবাদ ও ভিডিও ফাঁসের সন্দেহে নজরুল তার গাড়িচালক ওবায়দুর রহমানকে মারধর ও শ্বাসরোধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে গাজী নজরুলসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে রাজধানীর পল্লবী থানায় মামলা দায়ের হয়। ওই মামলায় গ্রেপ্তার এক আসামিকে কারাগারেও পাঠায় আদালত। তবে নজরুল হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন নেন। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তখন দলটি দাবি করে, তাকে ঘিরে সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন ঘটনার বিষয়ে সাংগঠনিক তদন্তে তার ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হয়েছে। সেজন্য গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বহিষ্কারের পর গাজী নজরুল আর দলের কেউ নন। তাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত জানিয়ে সংসদ সচিবালয় ও নির্বাচন কমিশনে (ইসি) চিঠি দেয়া হয়েছে।