বয়স অল্প কিন্তু চিন্তায় পরিপক্ব। পার্ক ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা অংশ নিয়েছিল সায়েন্স ফেয়ারে। এই শিক্ষার্থীরা মেলায় উপস্থাপন করে আধুনিক সব ভাবনা। যার কেন্দ্রে রয়েছে— মানুষের নিত্যদিনের সমস্যা ও তার সম্ভাব্য সমাধান, পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন থেকে স্বাস্থ্য সুরক্ষা, যানজট নিয়ন্ত্রণ থেকে নিরাপদ সড়ক, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। আরও ছিল পানি ও জ্বালানি সংরক্ষণ— সমাজ ও মানুষের জীবনকে আরও সহজ, নিরাপদ ও টেকসই করার নানা চিন্তা। ভবিষ্যতের বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী কিংবা উদ্ভাবকদের সেই কল্পনা, কৌতূহল ও সমস্যা সমাধানের আগ্রহই যেন উঠে আসে এই বিজ্ঞান মেলায়।
শনিবার রাজধানীর মান্ডা এলাকায় পার্ক ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের স্থায়ী ক্যাম্পাসে এই ফেয়ার অনুষ্ঠিত হয়। সুন্দর ছায়াঘেরা ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা গ্রুপভিত্তিক প্রজেক্ট প্রদর্শন করে। শিক্ষার্থীদের প্রজেক্টগুলো ঘুরে ঘুরে দেখেন আমন্ত্রিত অতিথিরা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সভাপতি ব্যারিস্টার এ. এম. মাহবুব উদ্দিন খোকনসহ বিশিষ্টজনরা। অতিথিরা স্টল পরিদর্শন করে শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দেন।
সায়েন্স ফেয়ার ঘুরে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা তাদের প্রকল্পে তুলে ধরেছে একটি পরিবেশবান্ধব ও প্রযুক্তিনির্ভর শহরের চিত্র। ভবিষ্যতের নগরজীবনকে আরও নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন, সাশ্রয়ী ও টেকসই করতে প্রযুক্তির নানা ব্যবহার। তাদের তৈরি বিভিন্ন মডেলে ছিল— পরিবেশ সুরক্ষা, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, যানজট নিরসন, দুর্যোগ মোকাবিলা, পানি সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা ও মানুষের নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অর্থাৎ একটি আধুনিক শহরের দৈনন্দিন জীবনে যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলোর সমাধানে প্রযুক্তিকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তারই নানা ধারণা তুলে ধরেছে খুদে শিক্ষার্থীরা।
প্রকল্পগুলোর মধ্যে ছিল— সোলার সিস্টেম ব্যবহার করে সৌরশক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চাহিদা পূরণের ধারণা। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়টিও তাদের মডেলে গুরুত্ব পেয়েছে। একইসঙ্গে নগরের যানজট ও সড়ক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার আরও শক্তিশালী করার বিষয়টি তুলে ধরেছে শিক্ষার্থীরা। ট্রাফিকের চাপ বুঝে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, সড়কে চলাচলকে আরও নিরাপদ করা এবং সময় ও জ্বালানি সাশ্রয়ের মতো বিষয়েও তাদের প্রকল্পে নানা ধারণা দেখানো হয়েছে।
হাসপাতালসহ বিভিন্ন জরুরি ও দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে ব্যবহারের জন্য সেন্সরনির্ভর যানবাহনের মডেলও তৈরি করেছে তারা। দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড বা অন্য কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছানো এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়ার ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার কীভাবে করা যেতে পারে, সেই ধারণাও রয়েছে এসব প্রকল্পে। বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে তা বারবার সঠিকভাবে ব্যবহারের প্রযুক্তি দেখানোর পাশাপাশি পানি অপচয় রোধ ও ভবিষ্যতের পানির চাহিদা পূরণে সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্ব দিয়েছে শিক্ষার্থীরা। বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য আলাদা করে সংগ্রহ ও রিসাইকেলের মাধ্যমে তা থেকে নতুন উপকরণ কিংবা শক্তিতে রূপান্তরের ধারণা রয়েছে তাদের প্রকল্পে। শহরের বিভিন্ন স্থানে থাকা ডাস্টবিনে সেন্সর ব্যবহারের মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর ও আধুনিক করার মডেলও দেখানো হয়েছে। এতে ডাস্টবিন কখন পূর্ণ হচ্ছে, কখন তা খালি করা প্রয়োজন— এ ধরনের তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যবস্থাপনার ধারণা তুলে ধরা হয়েছে।
পানি থেকে বিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন আলাদা করার প্রক্রিয়াও মডেলের মাধ্যমে তুলে ধরেছে শিক্ষার্থীরা। ভবিষ্যতে বিকল্প ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি হিসেবে হাইড্রোজেনের ব্যবহার কীভাবে বাড়ানো যেতে পারে, সেই চিন্তার প্রতিফলনও দেখা গেছে তাদের প্রকল্পে। পাশাপাশি নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে সেন্সর ও সৌরশক্তির সমন্বয়ে ডিফেন্স সিস্টেমের ধারণা তুলে ধরা হয়েছে।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের জন্য প্রযুক্তির ব্যবহারও বাদ যায়নি তাদের ভাবনায়। দৃষ্টিশক্তিহীন মানুষের চলাচলে সহায়তার জন্য সেন্সরযুক্ত চশমার মডেল তৈরি করেছে শিক্ষার্থীরা। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে সামনে থাকা বাধা সম্পর্কে ব্যবহারকারীকে সতর্ক করার ধারণা দেখানো হয়েছে। এ ছাড়া, দৃষ্টিসীমার বাইরের দৃশ্য পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষ যন্ত্র, বিভিন্ন স্থানে সেন্সর ব্যবহার, স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করার নানা প্রযুক্তিনির্ভর প্রকল্পও ছিল মেলায়।
সবমিলিয়ে, ছোট বয়সের শিক্ষার্থীদের তৈরি এসব প্রকল্পে শুধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি তাদের আগ্রহই নয়, বরং ভবিষ্যতের শহর, পরিবেশ, মানুষের নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রা নিয়ে তাদের চিন্তারও প্রতিফলন ঘটেছে। নিজেদের কল্পনা ও সমস্যা সমাধানের ভাবনাকে বাস্তব মডেলে রূপ দিয়ে তারা দেখিয়েছে, বড় কোনো পরিবর্তনের চিন্তা করতে বয়স সব সময় বাধা নয়।
প্রদর্শন শেষে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে যোগ দেন অতিথিরা। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব বলেন, এই অসাধারণ সায়েন্স ফেয়ারে উপস্থিত হতে পেরে আনন্দিত। আজকের তরুণ শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনে দেশ চালাবে। এখন অনেক প্রজেক্ট ছোট মনে হতে পারে। কিন্তু ভবিষ্যতে এটাই হবে বড় আবিষ্কার। টেকনোলজি শুধু ইন্টারটেইনমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করলে চলবে না। টেকনোলজি সেবার কাজে ব্যবহার করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আমাদের দেশে অনেক সমস্যা। তোমরা স্মার্ট আইডিয়া বের করবে। আবিষ্কার শুধু বড় বড় কাঠামো তৈরি করলেই হয় না। প্রবলেম সলভিং ও এনার্জির সঠিক ব্যবহারই হচ্ছে সব থেকে বড় আবিষ্কার। এখানে অনেক প্রজেক্ট। সব প্রজেক্ট সফল হবে না। তবে হাল ছাড়া যাবে না। এই চিন্তার শক্তিটা ধরে রাখতে হবে। নিজের দেশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে হবে। মানবকল্যাণমুখী কাজ করতে হবে।
বিশেষ অতিথি বার কাউন্সিলের সভাপতি ব্যারিস্টার এ.এম মাহবুব উদ্দীন খোকন বলেন, সারা পৃথিবীতে লোকের সংকট। আমেরিকার অনেক শহরে লোকজন না থাকায় আলো জ্বলছে না। ইংল্যান্ডের অনেক স্কুল শিক্ষার্থীর অভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ইউরোপেও একই অবস্থা। আফ্রিকাতেও লোক সংকট চলছে। আমরা যেটা পারি এসব দেশে লোক দিতে। এসএসসি রেজাল্টে দেখলাম অধিকাংশ শিক্ষার্থী ইংরেজি ও গণিতে ফেল। আমাদের শিক্ষায় এগিয়ে যাওয়ার বিকল্প নাই। এডুকেশন মানুষকে কনফিডেন্ট করে, নলেজ মানুষকে সাহসী করে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন— প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান আবদুল মতিন পাটওয়ারী, প্রিন্সিপাল মো. মহসীন মজুমদার, বোর্ড অব গভর্নেন্সের সদস্য ও প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. শাহাবুদ্দিন মোল্লা প্রমূখ।
স্ট্যান্ডার্ড ৩-৪ বিভাগ প্রথম হয়েছে- ‘ক্লগ বুস্টার’। ড্রেন ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায় জমে থাকা ময়লা-আবর্জনার কারণে সৃষ্ট জট শনাক্ত ও পরিষ্কারের প্রযুক্তিনির্ভর ধারণা তুলে ধরা হয়েছে এতে। ‘রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং’ প্রকল্প হয়েছে দ্বিতীয়। বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে সংরক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা পুনরায় ব্যবহারের কৌশল। এতে পানির অপচয় কমানোর পদ্ধতি। তৃতীয় ‘ওয়াটার পিউরিফিকেশন ওয়ার্কিং মডেল’। বিভিন্ন ধাপের মাধ্যমে দূষিত পানি পরিশোধন করে ব্যবহারযোগ্য করার প্রক্রিয়া মডেলের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে।
স্ট্যান্ডার্ড ৫-৬ বিভাগে প্রথম ‘উইন্ড ইলেকট্রিসিটি’। যা বাতাসের গতিশক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পদ্ধতি। নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের ধারণা রয়েছে এতে। দ্বিতীয় ‘গ্রিন এনার্জি’। পরিবেশের ক্ষতি কমিয়ে সৌর, বায়ু ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎস থেকে শক্তি ব্যবহারের পদ্ধতি। ‘ট্রিপল থ্রেট অ্যালার্ট সিস্টেম’ তৃতীয়। একাধিক ধরনের বিপদ বা ঝুঁকি শনাক্ত করে দ্রুত সতর্কবার্তা দেয়ার একটি ব্যবস্থা দেখানো হয়েছে প্রকল্পটিতে।
স্ট্যান্ডার্ড ৭-৮ বিভাগে প্রথম ‘নেক্সোরা’। প্রযুক্তির ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধানের উপায়। প্রকল্পটিতে স্বয়ংক্রিয় ও প্রযুক্তিনির্ভর সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় ‘ফায়ার হাইড্র্যান্ট’। অগ্নিকাণ্ডের সময় দ্রুত পানি সরবরাহ করে আগুন নিয়ন্ত্রণে সহায়তার ব্যবস্থা। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত পানি পাওয়ার ব্যবস্থা। ‘টার্ন ট্র্যাশ ইনটু ট্রেজার’ পেয়েছে তৃতীয় পুরস্কার। এতে ফেলে দেয়া বর্জ্যকে পুনর্ব্যবহার ও প্রক্রিয়াজাত করে নতুন ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী বা সম্পদে পরিণত করার ধারণা দেখানো হয়েছে। স্ট্যান্ডার্ড ৯ বিভাগে ‘শ্যাডো নোভা’ হয়েছে প্রথম। প্রকল্পটির মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভর একটি উদ্ভাবনী সমাধানের ধারণা উপস্থাপন করা হয়েছে। দৈনন্দিন কোনো সমস্যা প্রযুক্তির মাধ্যমে কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, সেটিই এর মূল ভাবনা।
