শুক্রবার থেকে তিন দিনের পার্লামেন্ট নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে রাশিয়ায়। ইউক্রেনের কাছ থেকে যে অঞ্চল দখল করে নিয়েছে রাশিয়া, সেখানেও হচ্ছে এই ভোট। যুদ্ধ শুরুর পর এটিই রাশিয়ার প্রথম যুদ্ধকালীন পার্লামেন্ট নির্বাচন। এই নির্বাচনে কার্যত কোনো বিরোধী দল নেই এবং ক্রেমলিনের রাজনৈতিক আধিপত্য আরও সুদৃঢ় হওয়া প্রায় নিশ্চিত বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এপি। এতে বলা হয়, ভোটগ্রহণ চলবে রোববার পর্যন্ত। ভোটারদের উপস্থিতি বাড়াতে কর্তৃপক্ষ সপ্তাহজুড়ে ভোটের ব্যবস্থা করেছে। একই সঙ্গে অনলাইনে ভোট দেয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে। দেশটির ১১ কোটি ১০ লাখ যোগ্য ভোটারের মধ্যে শুক্রবার শেষ নাগাদ প্রায় ৩০ শতাংশ ভোট দিয়েছেন বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন। এই হিসাবের মধ্যে অনলাইন ভোটও রয়েছে।
ক্রেমলিন চাইছে, ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর প্রথম এই পার্লামেন্ট নির্বাচন যুদ্ধের প্রতি জনগণের সমর্থন তুলে ধরুক এবং তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য এক ধরনের বৈধতার আবরণ তৈরি করুক। রাজনৈতিক ঝুঁকি এড়াতে কর্তৃপক্ষ সামান্যতম ভিন্নমতের প্রকাশও দমন করেছে। ভোটের আগে জাতির উদ্দেশে দেয়া বক্তব্যে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেন, আপনাদের পছন্দ ও দৃঢ়তা আবারও প্রমাণ করবে যে লাখ লাখ মানুষ আমাদের যোদ্ধাদের পাশে রয়েছে। আমরা একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি, অভিন্ন মূল্যবোধ, ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসায় আবদ্ধ। ক্রেমলিন জানিয়েছে, পুতিন শুক্রবার অনলাইনে ভোট দিয়েছেন। এ সময় কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে তার ছবি প্রকাশ করা হয়।
ক্রেমলিনের প্রধান রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড রাশিয়া নিম্নকক্ষ স্টেট ডুমা’য় তাদের বিপুল নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখবে, এমনটা প্রায় নিশ্চিত বলে মনে করা হচ্ছে। ‘সিস্টেমিক অপোজিশন’ বা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে থাকা কয়েকটি ছোট দলও পার্লামেন্টে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব দল গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব ইস্যুতেই সরকারের সঙ্গে একই অবস্থানে ভোট দিয়ে থাকে। নির্বাচনে ভোটাররা দুটি পৃথক ব্যালটে ভোট দিচ্ছেন। ডুমার মোট ৪৫০টি আসনের অর্ধেক পূরণ করা হচ্ছে ব্যালটে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভোট দিয়ে। বাকি অর্ধেকে একক আসনভিত্তিক নির্বাচনী এলাকায় সরাসরি প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে।
নির্বাচন নিয়ে এপির সঙ্গে কথা বলা রুশ নাগরিকদের প্রত্যাশা ছিল ভিন্ন ভিন্ন। মস্কোর বাসিন্দা দিমিত্রি কিরিলিন চলতি সপ্তাহের শুরুতে বলেন, তিনি কিছু পরিবর্তন দেখতে চান। নেতৃত্বে অন্য কোনো দলকে দেখতে চান। তবে মস্কোর আরেক বাসিন্দা আলেকজান্ডার ভার্তুখিন মনে করেন, ইউনাইটেড রাশিয়া এবং কমিউনিস্টরা যা করছে, তা যথেষ্ট। তাদের কর্মসূচিতে সবকিছুই আছে। শুক্রবার মস্কোর একটি ভোটকেন্দ্রে কথা বলেন পেনশনভোগী গালিনা ভাভিলোভা। তার মতে, ইউক্রেনের যুদ্ধের অবসান ঘটানোই এখন প্রধান বিষয়। আরেক পেনশনভোগী লিউদমিলা কালিনিনা আশা প্রকাশ করেন, জীবন যেন আরও ভালোভাবে স্থিতিশীল হয় এবং অতি ধনী ও অত্যন্ত দরিদ্রদের মধ্যে যে বিশাল ব্যবধান, তার অবসান ঘটে। ৭২ বছর বয়সী অধ্যাপক ভ্লাদিমির চুবারেভ আশা প্রকাশ করেন, আমাদের সরকার যেসব গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিচ্ছে, সেগুলো সফল হবে। তিনি আরও বলেন, আর অবশ্যই বিজয় হবে।
যুদ্ধের সমালোচনা করার সাহস দেখানো একমাত্র নিবন্ধিত রাজনৈতিক সংগঠন ইয়াবলোকো পার্টিকে গত মাসে রাশিয়ার সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচনের ব্যালট থেকে বাদ দিয়েছে। একক আসনের নির্বাচনী এলাকাগুলোতে দলটির মাত্র কয়েক ডজন প্রার্থী রয়েছে। এ ছাড়া কয়েকজন যুদ্ধবিরোধী রাজনীতিককে নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর আগেই কারাগারে পাঠানো হয়েছে অথবা বিদেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। এই নির্বাচন এমন এক সময় অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন গ্রীষ্মজুড়ে ইউক্রেনের দূরপাল্লার ড্রোন হামলায় রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দেশজুড়ে ব্যাপক জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। অনলাইন খুচরা বিক্রেতা ওয়াইল্ডবেরিজ ও ওজোন-এর গুদামেও হামলা হয়েছে। এসব হামলার কারণে রাশিয়ার অর্থনীতির বিদ্যমান সমস্যাগুলো আরও বেড়েছে এবং দেশটির লাখ লাখ মানুষের জীবনে যুদ্ধের প্রভাব আরও সরাসরি পৌঁছে গেছে।
