সৌদির কাছে ট্রাম্পের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির পরিকল্পনা কেন বিতর্কিত

সৌদির কাছে ট্রাম্পের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির পরিকল্পনা কেন বিতর্কিত

ফন্ট সাইজ:

সৌদি আরবের কাছে প্রায় ৫০টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির পরিকল্পনায় অনুমোদন দিয়েছে ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতিতে এই পরিবর্তনকে ঘিরে কংগ্রেসের কয়েকজন সদস্য উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

শত্রুর রাডার এড়িয়ে চলতে সক্ষম অত্যাধুনিক স্টেলথ প্রযুক্তির কারণে এফ-৩৫কে বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই যুদ্ধবিমান কেনার চেষ্টা করে আসছিল সৌদি। তবে এতদিন রিয়াদের সেই প্রচেষ্টায় বাধা দিয়ে এসেছে ওয়াশিংটন। এর অন্যতম প্রধান কারণ ইসরাইল।

যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরাইলের কাছেও এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান রয়েছে। মার্কিন আইনে ইসরাইলকে ‘কোয়ালিটেটিভ মিলিটারি এজ’ বা আঞ্চলিক সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ, মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কোনো দেশকে যুক্তরাষ্ট্র যেসব অস্ত্র সরবরাহ করে, ইসরাইলকে তার চেয়ে উন্নত সামরিক সক্ষমতা পাওয়ার সুযোগ রাখতে হয়।

২৪ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি

রিয়াদের কাছে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের এই অস্ত্র বিক্রির পরিকল্পনা পর্যালোচনা কিংবা আটকে দেয়ার জন্য কংগ্রেসের হাতে ৩০ দিন সময় রয়েছে। সৌদি যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের অন্যতম বৃহৎ ক্রেতা।

ইলিনয়ের ডেমোক্রেট প্রতিনিধি রাজা কৃষ্ণমূর্তি বৃহস্পতিবার প্রস্তাবিত অস্ত্র বিক্রির বিরোধিতা করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, এর মাধ্যমে মার্কিন সামরিক প্রযুক্তির ‘রত্নভাণ্ডার’ চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নাগালের মধ্যে চলে যেতে পারে।

অন্যান্য ডেমোক্রেট আইনপ্রণেতা এবং কয়েকজন মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাও সৌদিকে এফ-৩৫ দেয়ার বিষয়ে একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

তাদের আশঙ্কা, চীন ও সৌদি আরবের মধ্যকার নিরাপত্তা সহযোগিতার কারণে রিয়াদ সংবেদনশীল এ সামরিক প্রযুক্তির কোনো অংশ চীনের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে পারে।
তবে অস্ত্র বিক্রির ঘোষণা দেয়ার সময় যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট বলেছে, এই চুক্তি ওয়াশিংটনের ‘পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার লক্ষ্যগুলো’ এগিয়ে নেবে।

এক বিবৃতিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, প্রস্তাবিত এই চুক্তি ‘ন্যাটো-বহির্ভূত একটি প্রধান মিত্র দেশের নিরাপত্তা জোরদার করবে’। একই সঙ্গে সৌদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, প্রস্তাবিত অস্ত্র ও সহায়তা সরবরাহের ফলে ওই অঞ্চলের সামরিক ভারসাম্যে কোনো পরিবর্তন আসবে না।

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। গত নভেম্বরে সৌদি যুবরাজ হোয়াইট হাউস সফর করেন। এর আগে গত বছরের মে মাসে রিয়াদে দুজনের বৈঠক হয়েছিল।

ওই বৈঠকের পর ১৪২ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্র চুক্তি সই হয়। হোয়াইট হাউস তখন এটিকে ‘ইতিহাসের বৃহত্তম প্রতিরক্ষা বিক্রয় চুক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছিল।
সৌদির জন্য এবার যে অস্ত্র বিক্রির প্রস্তাব দেয়া হয়েছে, তাতে মার্কিন অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিনের তৈরি ৪৮টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান রয়েছে।

চুক্তিটি কার্যকর হলে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের সংখ্যার দিক থেকে সৌদি ইসরাইলের বর্তমান বহরের কাছাকাছি চলে যাবে। ইসরাইলের হাতে বর্তমানে প্রায় ৫০টি এফ-৩৫ রয়েছে।
তবে ইসরাইলও তাদের বহর বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। গত মে মাসে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, তারা এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের আরও একটি স্কোয়াড্রন কিনবে।
জেরুজালেম পোস্ট-এর তথ্য অনুযায়ী, নতুন চুক্তি কার্যকর হলে ইসরাইলের এফ-৩৫ বহরের সংখ্যা ১০০-তে পৌঁছাতে পারে।

লকহিড মার্টিনের একটি এফ-৩৫এ যুদ্ধবিমানের দাম প্রায় ৮ কোটি ২৫ লাখ ডলার।
সৌদির কাছে এফ-৩৫ বিক্রির বিষয়টি নতুন নয়। ২০১৮ সালে সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যার পর রিয়াদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আগের অস্ত্র চুক্তিগুলো নিয়েও কংগ্রেসে প্রশ্ন উঠেছিল।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনও সৌদিকে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করেছিল। তবে শর্ত ছিল, রিয়াদকে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হবে। শেষ পর্যন্ত সেই কূটনৈতিক উদ্যোগ সফল হয়নি।

সৌদি যখন ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতিদের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে আছে, তখনই এফ-৩৫ বিক্রির এই প্রস্তাব সামনে এসেছে। হুতিরা ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলের বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে।

সম্প্রতি সৌদি-সমর্থিত সরকারপন্থি বাহিনীর কাছ থেকে লোহিত সাগরের উপকূলবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকার নিয়ন্ত্রণও হুতিরা নিজেদের হাতে নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত দুটি সূত্রের বরাত দিয়ে বিবিসির মার্কিন মিডিয়া পার্টনার সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, সৌদি যুবরাজ ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পকে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার জন্য চাপ দিয়েছেন।

তবে সূত্রগুলোর দাবি, ট্রাম্প এখন পর্যন্ত হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি মার্কিন সামরিক বাহিনীকে যুদ্ধে জড়ানো থেকে বিরত রয়েছেন।

ফলে সৌদির কাছে এফ-৩৫ বিক্রির পরিকল্পনাটি শুধু একটি বড় অস্ত্র চুক্তিই নয়; এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের সামরিক সুবিধা, চীনের সঙ্গে সৌদির নিরাপত্তা সম্পর্ক, ইয়েমেনের সংঘাত এবং ওয়াশিংটন-রিয়াদ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়েও একাধিক প্রশ্ন জড়িয়ে আছে।