কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই কি অদূর ভবিষ্যতে গোটা মানবজাতিকে সমূলে ধ্বংস করে দিতে পারে? প্রযুক্তি শিল্পের ভেতরের গবেষকদের একাংশ দাবি করছেন, আগামী এক দশকের মধ্যেই মানুষের তৈরি এই অতিবুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি গোটা মানব প্রজাতিকে বিলুপ্তির মুখে ঠেলে দিতে পারে। এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত বুদ্ধিমত্তা যদি কখনো বৈশ্বিক ব্যাংকিং খাত, বিদ্যুৎ গ্রিড, স্যাটেলাইট যোগাযোগ কিংবা জাতীয় জরুরি সেবা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ হাতিয়ে নেয়, তবে বাস্তব জগতে কোনো শারীরিক আঘাত ছাড়াই গোটা মানবসভ্যতা এক মুহূর্তে অচল হয়ে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
তবে অন্যান্য বিজ্ঞানী, মাইক্রোবায়োলজিস্ট ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, তাত্ত্বিক আশঙ্কা আর বাস্তব পৃথিবীর জটিল বৈজ্ঞানিক নিয়মের মধ্যে বিশাল ফারাক রয়েছে।
এক দশকের মধ্যে মহাপ্রলয়ের আশঙ্কা
সম্প্রতি বিশ্বখ্যাত এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের শীর্ষ গবেষক জ্যাকব কক্সন প্রযুক্তিটিকে মানবজাতির জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক আখ্যা দিয়ে চাকরি ছাড়েন। এরপর প্রতিষ্ঠানটির আরেক গবেষক ইভান হুবিঙ্গার দাবি করেন, আগামী দশ বছরের মধ্যে এআই প্রযুক্তির কারণে মানবজাতি ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কা ১০ শতাংশেরও বেশি। এছাড়া মেশিন ইন্টেলিজেন্স রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সভাপতি ও সুপারহিউম্যান এআই বিষয়ক গ্রন্থের সহ-লেখক নেট সোরেস দৃঢ়ভাবে দাবি করেন, সুপারইন্টেলিজেন্স অর্জনের পর পৃথিবীর শেষ মানুষটির নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং মানব প্রজাতি বিলুপ্ত হওয়াই সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিণতি হতে পারে। তাদের এই আশঙ্কার পেছনে মূলত তিনটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট তুলে ধরা হচ্ছে—প্রাণঘাতী জৈবাস্ত্র তৈরি, স্বয়ংক্রিয় কিলার রোবট বাহিনীর উত্থান এবং পারমাণবিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ দখল।
জৈবাস্ত্র তৈরির কল্পকাহিনী বনাম গবেষণাগারের বাস্তবতা
জৈবাস্ত্রের ক্ষেত্রে আশঙ্কাবাদীদের যুক্তি হলো, মানুষকে কৌশলে ভুল বুঝিয়ে অথবা নিজস্ব স্বয়ংক্রিয় গবেষণাগার তৈরি করে মারাত্মক ভাইরাস ছড়িয়ে দিতে পারে এআই। তবে এই দাবি নাকচ করে কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেশিন লার্নিং ও মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক এরিক শিং বলেন, ডিজিটাল জগতে কোড লেখা আর বাস্তব গবেষণাগারে কার্যকর ভাইরাস তৈরি এক বিষয় নয়। এটি কোনো নির্দেশনাবিহীন লেগো খেলনার মতো। এখানে রাসায়নিক উপাদান, সঠিক সিকোয়েন্স, তাপমাত্রা এবং সুনির্দিষ্ট পরিবেশের নিখুঁত সমন্বয় দরকার। একটি মাত্র উপাদানের হেরফের হলে পুরো প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে যায়। তাছাড়া রাসায়নিক ও জৈব অস্ত্রের বিভিন্ন কাঁচামাল এবং যন্ত্রপাতির বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বাস্তব জগতেই অত্যন্ত কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
রোবট বাহিনী ও পারমাণবিক অস্ত্রের ঝুঁকি কতটুকু
দ্বিতীয় আশঙ্কা হিসেবে স্বয়ংক্রিয় রোবট বাহিনীর কথা বলা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, ইলন মাস্কের বহু প্রচারিত অপটিমাস রোবটই এখনও নির্ধারিত সময়ে বাজারে আসতে পারেনি। সেখানে কারখানায় কোটি কোটি রোবট তৈরি হয়ে মানুষ নিধনের গল্প বর্তমান প্রযুক্তিগত বাস্তবতা থেকে বহু দূরে। অন্যদিকে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে আশঙ্কার বিষয়ে এআই নাউ ইনস্টিটিউটের প্রধান বিজ্ঞানী হেইডি খালাফ জানান, বিশ্বের পারমাণবিক উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলো পাবলিক ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত থাকে না। এগুলো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এবং এয়ার-গ্যাপড সুরক্ষিত নেটওয়ার্কে অত্যন্ত কঠোর নিয়মে পরিচালিত হয়। ফলে দূর থেকে কোনো এআই স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসব অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে না।
আবেগের মোহ নাকি তথ্যভিত্তিক নীতি প্রণয়ন
বিজ্ঞানীদের একাংশ মনে করেন, এআই গবেষকদের একাংশ সফটওয়্যার উদ্ভাবনের প্রাথমিক মোহে পড়ে ভিত্তিহীন ও অতিরঞ্জিত আশঙ্কার কথা বলছেন। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ গবেষক হার্বার্ট লিন জানান, কম্পিউটারে প্রাণ সঞ্চার করার মতো প্রযুক্তিগত সাফল্যে বিভোর হয়ে অনেকে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের বাইরে গিয়ে অসীম সম্ভাবনার সঙ্গে এমন কাল্পনিক মহাপ্রলয়কে জুড়ে দিচ্ছেন। তাই নীতিনির্ধারক ও আইনপ্রণেতাদের কাল্পনিক ভীতির বদলে বাস্তবভিত্তিক তথ্যপ্রমাণ ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য ঝুঁকির দিকেই মনোযোগ দেয়া উচিত।
