ভিসার মেয়াদ শেষ হলেই ছাড়তে হবে অস্ট্রেলিয়া—না হলে আটক

অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে ঘোষণা

ভিসার মেয়াদ শেষ হলেই ছাড়তে হবে অস্ট্রেলিয়া—না হলে আটক

ফন্ট সাইজ:

অস্ট্রেলিয়ায় ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও থেকে যাওয়ার দিন ফুরাচ্ছে। বৈধ ভিসা ছাড়া দেশটিতে অবস্থানকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে দেশটির সরকার। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্য নিয়ে আসার সুযোগ সীমিত করা, এক ভিসা থেকে আরেক ভিসায় যাওয়ার প্রবণতা বন্ধ করা এবং ব্যাকপ্যাকারদের দ্বিতীয়-তৃতীয় বছর অবস্থানের সুযোগে লাগাম টানার ঘোষণা এসেছে।

বৃহস্পতিবার ক্যানবেরার ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে দেয়া ভাষণে এসব পরিবর্তনের রূপরেখা তুলে ধরেন অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক। তার ভাষায়, অভিবাসন কর্মসূচির ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’ ফিরিয়ে আনতেই এই সংস্কার। পাশাপাশি চাহিদা-নির্ভর অভিবাসন ব্যবস্থার ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো হবে। বার্কের বার্তা স্পষ্ট-সাময়িকভাবে এলে সাময়িক ভিসা, স্থায়ীভাবে এলে স্থায়ী ভিসা, আর বৈধ ভিসা না থাকলে অস্ট্রেলিয়া ছাড়তে হবে।

এনওএম-এ লাগাম


অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের এই উদ্যোগের কেন্দ্রে রয়েছে নিট ওভারসিজ মাইগ্রেশন বা এনওএম। চলতি বছরে এর সংখ্যা ২ লাখ ৪৫ হাজার এবং আগামী অর্থবছরে ২ লাখ ২৫ হাজার নির্ধারণ করেছে সরকার।

অস্ট্রেলিয়ান ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকসের সর্বশেষ হিসাবে মার্চ পর্যন্ত এক বছরে দেশটির নিট অভিবাসন কমে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৯২ হাজার ১০০-তে।
আবাসন সংকটের কথা বিবেচনায় নিয়ে বাজেটে নির্ধারিত এনওএম-এর সংখ্যাকে এখন সরকার শুধু পূর্বাভাস হিসেবে নয়, অর্জনযোগ্য লক্ষ্য হিসেবেও দেখছে। তবে বার্কের বক্তব্য, অভিবাসন অনেক নিচে নামিয়ে আনার পদক্ষেপ অস্ট্রেলিয়ার পরিষেবা খাত ও অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

‘ভিসা হপিং’ বন্ধ

সরকারের চোখে অভিবাসন ব্যবস্থার অন্যতম বড় সমস্যা ‘ভিসা হপিং’। অর্থাৎ একটি ভিসার মেয়াদ শেষ হলে আরেকটি ভিসা নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান দীর্ঘায়িত করা।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অভিযোগ, কিছু মানুষ স্থায়ী বসবাসের যোগ্যতা অর্জনের সম্ভাবনা না থাকা সত্ত্বেও এক ভিসা থেকে অন্য ভিসায় যেতে থাকেন এবং আপিল প্রক্রিয়ার সুযোগ নিয়ে যতটা সম্ভব দীর্ঘ সময় দেশে অবস্থান করেন। এই প্রবণতা ঠেকাতে ভিসা ব্যবস্থায় নতুন বিধিনিষেধ আনা হচ্ছে। ভিজিটর ভিসাতেও সাধারণভাবে ‘নো ফারদার স্টে’ শর্ত যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে পর্যটক হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় এসে দেশটির ভেতরে থেকেই অন্য ভিসায় যাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হবে।

শিক্ষার্থীদের পরিবারে নতুন নিয়ম

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্যও আসছে বড় পরিবর্তন। সাধারণভাবে নতুন শিক্ষার্থী ভিসার সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের অস্ট্রেলিয়ায় আনার সুযোগ থাকবে না। তবে বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় থাকা পরিবারগুলোকে বিচ্ছিন্ন করা হবে না। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও আসিয়ানভুক্ত দেশের নাগরিক এবং পিএইচডির মতো নির্দিষ্ট কিছু কোর্সের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রাখা হবে।

কোর্স পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও কঠোরতা বাড়ছে। কোনো শিক্ষার্থী একটি কোর্স শেষ করার পর নতুন ভিসা ছাড়া অন্য কোর্সে যেতে পারবেন না। নতুন কোর্সটি হতে হবে আগেরটির চেয়ে উচ্চতর যোগ্যতার স্তরের।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঘুরে ঘুরে পড়াশোনার নামে অস্ট্রেলিয়ায় দীর্ঘ সময় অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষাব্যবস্থাকে অভিবাসনের পথ হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করাই এর উদ্দেশ্য।

ব্যাকপ্যাকারদের দ্বিতীয়-তৃতীয় বছরেও লটারি


‘ওয়ার্কিং হলিডে মেকার’ কর্মসূচির ব্যাকপ্যাকারদের জন্যও বড় পরিবর্তন। দ্বিতীয় বছর অস্ট্রেলিয়ায় থাকার সুযোগ সর্বোচ্চ ৪৫ হাজারে সীমাবদ্ধ করা হবে। এ সুযোগ পেতে আবেদনকারীদের আগে আঞ্চলিক এলাকায় ৮৮ দিন কাজ করতে হবে। এরপর লটারি বা ব্যালটের মাধ্যমে নির্বাচিত হতে হবে। তৃতীয় বছরের জন্য সুযোগ থাকবে মাত্র ৫ হাজার জনের। যোগ্যতার জন্য আঞ্চলিক এলাকায় ছয় মাস কাজ করতে হবে।

গত বছর প্রায় ৫৭ হাজার ব্যাকপ্যাকার দ্বিতীয় বছর এবং প্রায় ৩১ হাজার তৃতীয় বছর অস্ট্রেলিয়ায় ছিলেন। সরকারের যুক্তি, প্রথম বছরের পর সবাইকে থেকে যাওয়ার সুযোগ দিলে কর্মসূচিটির ওপর প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তবে যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের জন্য নিয়ম আলাদা। অস্ট্রেলিয়া-যুক্তরাজ্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আওতায় তাদের আঞ্চলিক এলাকায় কাজের বাধ্যবাধকতা নেই। তাই তাদের আবেদন দ্রুত প্রক্রিয়াকরণের আওতায়ও আসবে না।
দক্ষ কর্মীদের জন্য অগ্রাধিকার অভিবাসন কমানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মীদের দ্রুত আনার উদ্যোগও নিয়েছে সরকার।

দক্ষ কর্মীদের স্থায়ী অভিবাসনের গুরুত্ব বাড়াতে ‘পয়েন্টস টেস্ট’ পুনর্বিন্যাসের পরিকল্পনা রয়েছে। আবাসন নির্মাণ খাতের পেশাগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির সমতুল্য গুরুত্ব দেয়ার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া ‘মিনিস্টেরিয়াল ডিরেকশন ১১৯’ পরিবর্তন করে নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, মৎস্য ও শিক্ষকতা খাতের আবেদনকে অগ্রাধিকার দেয়ার ঘোষণা এসেছে। আগের নির্দেশনার কারণে বিদেশ থেকে করা কিছু দক্ষ কর্মীর ভিসা আবেদন প্রক্রিয়াকরণের তালিকার শেষ দিকে চলে গিয়েছিল। ফলে কোনো কোনো আবেদন নিষ্পত্তিতে এক বছরেরও বেশি সময় লেগেছিল।

ভিসা শেষ হলেই আটক?


ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানকারীদের ধরতে সরকারের সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। নিয়োগ করা হবে ১০০ জন অতিরিক্ত কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তা। আটকের জন্য যুক্ত হবে ২৫০টি নতুন শয্যা। মেলবোর্নের সাবেক কোয়ারেন্টাইন কেন্দ্রটিও এ কাজে ব্যবহার করা যায় কি না, তা খতিয়ে দেখছে সরকার। টনি বার্ক ২০১৫ সালের আগের একটি ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার কথাও বলেছেন। ওই ব্যবস্থায় ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া ব্যক্তিদের আটক করে ব্রিজিং ভিসা দেয়া এবং দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেয়া হতো। তার দাবি, এর উদ্দেশ্য ছিল আচরণগত পরিবর্তন ঘটানো-যাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত নিজের উদ্যোগেই অস্ট্রেলিয়া ছেড়ে যান।

আশ্রয় আবেদনে কড়াকড়ি

অভিবাসন সংস্কারের আরও দু’টি অংশ বাস্তবায়নে নতুন আইন প্রয়োজন হবে। একটি হলো ‘এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট’ ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে সরকার আবেদনকারীর চাহিদার ওপর নির্ভর না করে শিক্ষার্থীসহ নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের আগমন নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। অন্যটি হলো ভিত্তিহীন বা দুর্বল ‘প্রোটেকশন ভিসা’ আবেদন ঠেকানো। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি, কিছু মানুষ অন্য ভিসার সুযোগ শেষ হওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ায় দীর্ঘ সময় থাকার উদ্দেশ্যে দুর্বল আশ্রয় আবেদন করেন। এতে প্রকৃত আবেদনকারীদের আবেদন নিষ্পত্তিতেও বিলম্ব হয়।

তিনি জানান, এমন কিছু দেশ রয়েছে যেখান থেকে করা প্রোটেকশন ভিসা আবেদনের ৮৫ শতাংশের বেশি প্রত্যাখ্যাত হয় এবং এসব দেশের আবেদনকারীরাই মোট প্রক্রিয়াধীন আবেদনের প্রায় ৮০ শতাংশের জন্য দায়ী।