অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক। নতুন পরিকল্পনায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য পরিবারের সদস্যদের অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে আসার সুযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে অস্থায়ী ভিসার সংখ্যা কমানো, ভিসার মেয়াদ শেষ হলে দেশত্যাগ নিশ্চিত করা এবং আশ্রয়ের আবেদন ব্যবস্থায় কঠোরতা আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কারা আসে, কারা থেকে যায় এবং কারা চলে যায়- শিরোনামে জাতীয় প্রেস ক্লাবে বৃহস্পতিবার এক ভাষণে এসব সংস্কারের বিস্তারিত তুলে ধরবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক।
সরকারের লক্ষ্য, ২০২৮ সালের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার নিট বৈদেশিক অভিবাসন ৩ লাখ থেকে কমিয়ে ২ লাখ ২৫ হাজারে নামিয়ে আনা। এ লক্ষ্য অর্জনেই অভিবাসন ব্যবস্থায় একাধিক নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সংবাদমাধ্যম এবিসি জানিয়েছে, বৃহস্পতিবারের ঘোষণার আগে চলতি সপ্তাহে মন্ত্রিসভার ব্যয় পর্যালোচনা কমিটি (Expenditure Review Committee) সংশোধিত পরিকল্পনাটিতে অনুমোদন দিয়েছে।
শিক্ষার্থীদের পরিবার আনার সুযোগ সীমিত
পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হতে পারে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্যদের ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ। যদিও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মোট সংখ্যা কমানোর কোনো সিদ্ধান্ত আপাতত নেই, নতুন বিধি নিষেধের ফলে তারা অস্ট্রেলিয়ায় স্বামী-স্ত্রী, সন্তান বা অন্যান্য নির্ভরশীল সদস্যকে সঙ্গে আনার সুযোগ প্রায় হারাতে পারেন।
গত অর্থবছরে অস্ট্রেলিয়ায় মোট ৩ লাখ ৩৭ হাজার ৪২৭টি শিক্ষার্থী ভিসা অনুমোদিত হয়। এর মধ্যে ৪৫ হাজার ৯৯১টি ছিল সেকেন্ডারি অ্যাপ্লিক্যান্ট ভিসা, যা মূলত শিক্ষার্থীদের নির্ভরশীল বা পরিবারের সদস্যদের দেওয়া হয়।
এ পরিকল্পনার সঙ্গে ওয়ান নেশন পার্টির সাম্প্রতিক অভিবাসন নীতিরও কিছুটা মিল রয়েছে। দলটি আগামী তিন বছরে অস্থায়ী অভিবাসীর সংখ্যা ৭ লাখ ৫০ হাজারের বেশি কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভিসা সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো এবং পড়াশোনা শেষে অস্ট্রেলিয়ায় থেকে কাজের সুযোগ সীমিত করার প্রস্তাবও রয়েছে। অন্যদিকে বিজ্ঞান, প্রকৌশল, চিকিৎসা গবেষণা ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে উচ্চ-মেধাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ভিসা চালুর প্রস্তাব দিয়েছে দলটি। এ ভিসায় আসা শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্যদের অস্ট্রেলিয়ায় আসার সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আসন ৫ লাখ ৯০ হাজার থেকে কমিয়ে ৩ লাখ ৫০ হাজার করার প্রস্তাবও রয়েছে।
‘ভিসা হপিং’ ঠেকাতে কড়াকড়ি
সরকার বর্তমানে প্রায় ৩০ লাখ অস্থায়ী ভিসাধারী নিয়ে উদ্বিগ্ন। নতুন ব্যবস্থায় অস্থায়ী ভিসার সংখ্যা কমানোর পাশাপাশি ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অভিবাসীদের অস্ট্রেলিয়া ছাড়ার বিষয়টি আরও কঠোরভাবে নিশ্চিত করা হবে। এক ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আরেক ভিসায় পরিবর্তন করে দীর্ঘদিন অস্ট্রেলিয়ায় থাকার প্রবণতা—যাকে ‘ভিসা হপিং’ বলা হচ্ছে—বন্ধ করতেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আশ্রয় আবেদনে নতুন বিধি নিষেধ
ব্রিজিং ভিসার সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টিও সরকারের সংস্কার পরিকল্পনায় রয়েছে। আশ্রয়ের আবেদন স্বরাষ্ট্র বিভাগ প্রত্যাখ্যান করার পর যেসব অস্থায়ী অভিবাসী আপিলের সুযোগ নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছেন, তাদের কাজের অধিকার বাতিলের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানরত বিদেশিদের কাছ থেকে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১ হাজার ৫৮০টি আশ্রয়ের আবেদন জমা পড়ছে। আবেদনকারীদের বড় অংশ চীন, ভারত ও মালয়েশিয়ার নাগরিক এবং তাদের অনেকে শিক্ষার্থী বা দর্শনার্থী ভিসায় অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশ করেছিলেন।
প্রায় ৯০ শতাংশ আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলেও আবেদনকারীরা অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ রিভিউ ট্রাইব্যুনাল (ART) ও ফেডারেল কোর্টে আপিল করতে পারেন। এ প্রক্রিয়া শেষ হতে কখনো কখনো প্রায় আট বছর পর্যন্ত সময় লাগছে। এই দীর্ঘ সময়ে আবেদনকারীরা ব্রিজিং ভিসায় অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস ও কাজের সুযোগ পান।
বিদেশ থেকে আগত মানুষের সংখ্যা কমানোর চাপের মধ্যে গত জুলাইয়ে ‘ওয়ার্কিং হলিডে মেকার’ ভিসার প্রক্রিয়াকরণ ধীর বা স্থগিত করা হয়। একই সময়ে দক্ষ কর্মীদের ভিসার আবেদনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
পার্লামেন্টে প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক বলেন, সরকার আইন প্রণয়নের মাধ্যমেই প্রস্তাবিত অভিবাসন সংস্কার বাস্তবায়ন করতে চায়। তবে পার্লামেন্টে প্রয়োজনীয় সমর্থন না পাওয়া গেলে সরকারের হাতে বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
বার্ক বলেন, হক ও হাওয়ার্ড সরকারের সময় থেকেই অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন ব্যবস্থা অনেকাংশে চাহিদা নির্ভরভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে। বর্তমানে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারের হাতে যে অল্প কয়েকটি কার্যকর উপায় রয়েছে, তার মধ্যে পরিকল্পিত অভিবাসন সংখ্যা নির্ধারণ এবং ভিসা আবেদন প্রক্রিয়াকরণের গতি অন্যতম।
মন্ত্রী আরও বলেন, আমরা যদি বিষয়টির একটি কার্যকর সমাধান করতে পারি, তাহলে আইন প্রণয়নের মাধ্যমেই তা বাস্তবায়ন করা হবে—এটাই হবে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত পথ। তবে সেটি সম্ভব না হলে সরকারের হাতে আরও কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আগামীকালই আমি সেসব পদক্ষেপের বিষয়ে বিস্তারিত ঘোষণা দেবেন বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান।
