ব্রাউন চুল। পায়ে কেডস, গায়ে টি-শার্ট আর জিন্স। এক হাতে সিগারেট। আরেক হাতে রামদা। দেশীয় এসব অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে মহড়া। সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীকে ভয়ভীতি প্রদর্শন। অস্ত্র ঠেকিয়ে ছিনতাই। চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, জমি দখল হরহামেশা চলছে। খুন-খারাবির তালিকায় নাম উঠেছে আরও আগে। রাজধানীর পাড়া-মহল্লার উঠতি বয়সীদের ‘গ্যাং কালচার’ বা ‘কিশোর গ্যাং’ এখন এক চরম আতঙ্কের নাম। ঢাকার প্রতিটি থানা এলাকায় গ্যাং কালচারের ভয়াল বিস্তার হয়েছে। এলাকায় এলাকায় গ্যাং গড়ে উঠছে। শুধু ঢাকা নয়, কিশোর গ্যাং সমাজের বিষফোঁড়া হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশের পাড়া-মহল্লায়। গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ৮টি ক্রাইম জোন এলাকায় ১৬০টি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। এসব গ্যাংয়ের মোট সদস্য সংখ্যা ৩ হাজারেরও বেশি। উদ্বেগের বিষয় হলো- গত বছরও ঢাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা ছিল ১১৮টি। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে রাজধানীতে গ্যাংয়ের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ। গ্যাং সদস্যরা প্রতিনিয়ত ভয়ঙ্কর সব অপরাধে জড়াচ্ছে। আর তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক নেতা ও শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। মাঝে-মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এদের গ্রেপ্তার করলেও জামিনে বেরিয়ে এসে তারা আবারো বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুযায়ী গ্যাং কালচারের সবচেয়ে ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে ডিএমপি’র ক্রাইম জোনের তেজগাঁও এবং মিরপুর বিভাগে। এই দুই বিভাগে ৭৬টি গ্যাং রয়েছে। তারমধ্যে তেজগাঁও বিভাগে ৪১টি, মিরপুর বিভাগে ৩৫টি। এর বাইরে ওয়ারী বিভাগে ২০টি, মতিঝিল বিভাগে ১৬টি, উত্তরা বিভাগে ১৫টি, রমনা বিভাগে ১২টি, গুলশান বিভাগে ১১টি, লালবাগ বিভাগে ১০টি গ্যাং রয়েছে। থানা এলাকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি গ্যাং কালচারের বিস্তার মোহাম্মদপুর থানায়। এই এলাকায় বর্তমানে ২৭টি দুর্ধর্ষ কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে, যাদের মোট সদস্য সংখ্যা ৪৮১ জন। এই গ্যাংগুলোর নামও বেশ অদ্ভুত ও আতঙ্কের। যেমন- পাটালি গ্রুপ, লেভেল হাই গ্রুপ, আনোয়ার গ্রুপ, ফরহাদ গ্রুপ, আর্মি আলমগীর ও নবী গ্রুপ, ডাইল্লা গ্রুপ, এলেক্স গ্রুপ, আকবর গ্রুপ, গাংচিল গ্রুপ, ল ঠেলা গ্রুপ, আশরাফ গ্রুপ, স্টার বন্ড, ভাইব্বা ল কিং, চেতালেই ভেজাল, টক্কর ল গ্রুপ, ঘুটা দে, লারা দে, সররাজ গ্রুপ, সুমন গ্রুপ, মাহি গ্রুপ, সাব্বির গ্রুপ, পিচ্চি হেলাল গ্রুপ, চার্লি গ্রুপ এবং বেলচা মনির গ্রুপ। এসব গ্রুপ মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন অনুমোদনহীন হাউজিং এলাকার জমি দখল, চাঁদাবাজি, প্রকাশ্যে ছিনতাই, গোলাগুলি, চুরি ও ডাকাতি করে।
গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুযায়ী, মোহাম্মদপুরের পরেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৬টি কিশোর গ্যাং রয়েছে পল্লবী এলাকায়। এখানকার সক্রিয় গ্রুপগুলো হলো- আশিক গ্রুপ, রাজু গ্রুপ, রকি গ্রুপ, পিন্টু-কাল্লু গ্রুপ, রোমান্টিক গ্রুপ, মুসা হারুনের ভাই ভাই গ্রুপ, মুরাদ গ্রুপ, আরমান গ্রুপ, জুম্মান গ্রুপ, বাহাদুর গ্রুপ, বাহাবলি গ্রুপ, ৬.৯ ইয়াসিন গ্রুপ, সোহেল গ্রুপ, আসাদ কাল্লু গ্রুপ এবং দীপ গ্রুপ। কাগজে-কলমে আশিক গ্রুপে ২৫ জন সদস্যের কথা বলা হলেও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাস্তবে এই গ্যাংয়ের সদস্য সংখ্যা শতাধিক। এ ছাড়া ৬.৯ ইয়াসিন গ্রুপে রয়েছে ২০ জন পেশাদার অপরাধী। স্থানীয় পর্যায়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে এদের রাজনৈতিক নেতারা ব্যবহার করছেন। পাশাপাশি শীর্ষ সন্ত্রাসী ফোর স্টার গ্রুপের অন্যতম ‘মামুন গ্রুপ’-এর সঙ্গেও পল্লবীর বেশ কয়েকটি গ্যাংয়ের গভীর যোগাযোগ রয়েছে।
রিপোর্টের তথ্যমতে, যাত্রাবাড়ী এলাকায় পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি এবং মাদক কারবারে কিশোর গ্যাংদের ব্যবহার করা হচ্ছে। অতীতে ভোল্টেজ, দে-দৌড় বা হ্যাঁচকা টান গ্রুপের দাপট থাকলেও বর্তমানে এখানে সক্রিয় রয়েছে ৮টি গ্রুপ। এর মধ্যে লিটন গ্রুপের ২৫ জন, জীবন গ্রুপের ২২ জন, ফাহিম গ্রুপের ২১ জন, শুভ-জাহিদ গ্রুপের ১৮ জন, সাকিব গ্রুপের ১৬ জন, ওয়ালিদ গ্রুপে ১৫ জন এবং পলাশ ও আহনাফ গ্রুপের ১২ জন করে সদস্য নিয়মিত চাপাতি, রামদা ও সামুরাই নিয়ে মহড়া দেয়। ২০১৭ সালের ৬ই জানুয়ারি উত্তরার ‘ডিসকো বয়েজ’ ও ‘নাইন স্টার’ গ্রুপের দ্বন্দ্বে স্কুলছাত্র আদনান কবির খুনের মাধ্যমে কিশোর গ্যাংয়ের ভয়াবহতা প্রথম দেশবাসীর সামনে আসে। সেই ঘটনার পর প্রশাসন নড়েচড়ে বসলেও উত্তরার গ্যাং কালচার থামানো যায়নি। বর্তমানে উত্তরা বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় ১৫টি গ্রুপ নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। যার মধ্যে উত্তরা পূর্ব থানায় ৪টি এবং দক্ষিণখানে ৫টি গ্যাং সক্রিয়। তালিকায় ঢাকার খিলগাঁও থানা এলাকায় ৭টি, হাজারীবাগে ৬টি, আদাবরে ৬টি, দারুসসালামে ৬টি, বনানীতে ৬টি, চকবাজারে ৪টি, কদমতলীতে ৪টি, শাহআলীতে ৪টি, ডেমরায় ৩টি, মুগদায় ৩টি এবং ধানমণ্ডিতে ২টি কিশোর গ্যাংয়ের সক্রিয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কিশোর গ্যাং দমনে অন্যতম বড় বাধা প্রচলিত ‘কিশোর আইন’। অপরাধ করার পর তাদের যখনই গ্রেপ্তার করা হয়, আইনি সুরক্ষার কারণে তাদের দ্রুত শিশু-কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে পাঠাতে হয় অথবা তারা খুব সহজেই আদালত থেকে জামিন পেয়ে যায়। জামিনে বের হয়েই এরা আরও বেশি প্রতিশোধ পরায়ণ ও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তাছাড়া এদের নেপথ্যে থাকা গডফাদার বা রাজনৈতিক ‘বড় ভাই’দের আইনের আওতায় না আনায় গ্যাংগুলোর দৌরাত্ম্য কমানো যাচ্ছে না।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা এক বছরে ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়া চরম সামাজিক অবক্ষয়ের লক্ষণ। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, পারিবারিক নজরদারির অভাব, ইন্টারনেটের অপব্যবহার, খেলার মাঠের সংকট এবং সুস্থ বিনোদনের অনুপস্থিতির কারণে কিশোররা অপরাধচক্রে জড়িয়ে পড়ছে। এ ছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর মিছিল-মিটিংয়ে সস্তায় জনবল পাওয়ার জন্য এই কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে, যা তাদের অপরাধের বড় ঢাল হিসেবে কাজ করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিশোরদের যারা অস্ত্র, অর্থ ও রাজনৈতিক আশ্রয় দিচ্ছে সেই বড় ভাইদের আগে চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
সমাজ ও অপরাধ বিজ্ঞানী ড. তৌহিদুল হক মানবজমিনকে বলেন, ঢাকা শহরে প্রায় ১৬০টির মতো কিশোর গ্যাং নানা ধরনের অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং তারা এই অপরাধগুলো করছে কোনো রাজনৈতিক অথবা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে। কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি, তার রাজনৈতিক কোনো ইচ্ছা-স্বার্থ পূরণ করার জন্য কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ব্যবহার করেন। কোনো কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির একাধিক কিশোর গ্যাং রয়েছে এবং যারা রাজনৈতিক স্বার্থ আদায় করা, ব্যবসায়িক স্বার্থ দেখা, আধিপত্য বিস্তারে ব্যবহার করা, দখলবাজি, চাঁদাবাজিসহ নানা ধরনের অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত করছে। তিনি বলেন, শীর্ষ এই অপরাধগুলোর সঙ্গে মাদকের বাজার নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রেও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা ব্যবহৃত হচ্ছে। আর শীর্ষ সন্ত্রাসীদের আশ্রয়ে কিংবা নির্দেশনায় তারা বিভিন্ন ধরনের কাজ চুক্তিভিত্তিক পদ্ধতিতে নেয়। তারা অস্ত্র ব্যবহার করে, অস্ত্রের প্রদর্শন করে কিংবা গুলি করে ভয় দেখিয়ে আক্রমণ, ভাঙচুর, দখল, হত্যা, চাঁদাবাজির মতো অপরাধ করছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না বিষয়টি এমন নয়। অপরাধের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী আসলে অপ্রতুল এবং যথাযথ না। তাই যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার, যে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্যদিয়েই এই ধরনের অপরাধীরা ভয় পাবে। পাশাপাশি যারা পৃষ্ঠপোষক বা মূলহোতা তাদেরকে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। এই কাজটি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে সম্পন্ন করতে পারলে কিশোর গ্যাং যারা তৈরি করেছেন, তাদের টনক নড়বে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র মো. আকতার হোসেন মানবজমিনকে বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ডিএমপি প্রতিনিয়ত অভিযান পরিচালনা করছে। এর পাশাপাশি ডিবিও অভিযান পরিচালনা করছে। রাজনৈতিক শেল্টার নিয়ে তিনি বলেন, ডিএমপি সুনির্দিষ্ট তথ্য যাচাই বাছাই করে অপারাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। সেক্ষেত্রে কারও রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করে না।
