খুলনায় সক্রিয় ৯ গ্রুপ

ফন্ট সাইজ:

কিশোর গ্যাং থেকেই শুরু। এরপর মাদক ব্যবসা, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, অস্ত্রের মহড়া- সবকিছুই করে ৯টি গ্রুপ। এদের বয়স ১৬ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। ছোটখাটো অপরাধী থেকে আজ তারা গোটা খুলনা নিয়ন্ত্রণ করছে। খুলনার অপরাধের বেশির ভাগ ঘটনায় ঘুরেফিরে নয়টি সন্ত্রাসী গ্রুপের নাম এসেছে। তারা এতটাই বেপরোয়া যে, জনবহুল এলাকায়ও খুনোখুনি করতে দ্বিধা করছে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে কাগজে-কলমে সন্ত্রাসীদের তালিকা আছে। অভিযানও হয়। তবে মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন। পুলিশের পক্ষ থেকে মাঝে মধ্যে গ্রেপ্তার ও মামলার রহস্য উদ্‌ঘাটনের কথা জানানো হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরাধের নেপথ্যের ব্যক্তিরা ধরা পড়ে না। ফলে এক খুন থেকে আরেক খুনের পটভূমি তৈরি হয়।

প্রাপ্ত তথ্য বলছে, খুলনা মহানগর ও জেলায় এখন ৯টি সন্ত্রাসী গ্রুপের নাম বেশি আলোচিত। এগুলো হলো- রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর বি-কোম্পানি, শেখ পলাশের পলাশ গ্রুপ, হুমায়ুন কবীরের হুমা বাহিনী, আশিক বাহিনী, নূর আজিম গ্রুপ, টেংকি শাওন গ্রুপ, আরমান শেখের আরমান গ্রুপ, শাকিল শেখের শাকিল গ্রুপ ও নাসিমুল গণির নাসিম গ্রুপ। এর বাইরে দিঘলিয়া, আড়ংঘাটা, কয়রা, পাইকগাছা ও দাকোপ এলাকায় ছোট ছোট অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী গ্রুপ রয়েছে। এসব গ্রুপের কিছু মাদক ও অস্ত্র কারবারকেন্দ্রিক। কিছু স্থানীয় আধিপত্য, জমি, ঘের, ঘাট, পরিবহন বা ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত। দৌলতপুর-মহেশ্বরপাশা এলাকায় পুরনো চরমপন্থি ধারার সন্ত্রাসীদের কিছু উত্তরাধিকারও আছে।

সম্প্রতি গ্রেনেড বাবুর ভাই জনি চৌধুরী আলোচিত শ্রমিক দল নেতা মাসুম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হলেও আইনের ফাঁকফোকরে জামিনে মুক্ত হয়। জনি চৌধুরীর বিরুদ্ধে সিঅ্যান্ডএফ ভবন দখল করে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
খুলনার সাম্প্রতিক অপরাধজগতে সবচেয়ে আলোচিত নাম গ্রেনেড বাবু। তার আসল নাম রনি চৌধুরী ওরফে বাবু। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র বলছে, ২০০৪ সালে খুলনা সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র শেখ তৈয়েবুর রহমানের গাড়িতে গ্রেনেড হামলার পর থেকেই তার নামের সঙ্গে ‘গ্রেনেড’ শব্দটি জুড়ে যায়। বর্তমানে সেই সন্ত্রাসী গ্রুপটির নাম ‘বি-কোম্পানি’। মুম্বইভিত্তিক অপরাধজগতের ‘ডন’ দাউদ ইব্রাহিমের বাহিনীর নাম ‘ডি-কোম্পানি’। সেই অনুকরণে বি-কোম্পানি নামকরণ বলে স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে। এই সন্ত্রাসী গ্যাংয়ের নেতা নিজেকে ‘নবাব’ নামেও পরিচয় দেন। তিনি বিদেশে বসে সন্ত্রাসী দলটি পরিচালনা করেন বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক খুন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখল ও মাদক নিয়ন্ত্রণের বড় অংশেই গ্রেনেড বাবুর লোকজনের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাচ্ছে। খুলনা মহানগরের বিভিন্ন থানায় গ্রেনেড বাবুর নামে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, মারধরসহ বিভিন্ন ঘটনায় অন্তত ১৭টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে।

আরেক আলোচিত নাম শেখ পলাশ। তিনি একসময় ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর পলাশ খুলনায় ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন। মিস্ত্রিপাড়া, বানরগাতি, আরামবাগ, নিরালা, পশ্চিম বানিয়াখামার, রূপসা বাগমারা ও সোনাডাঙ্গা এলাকায় তার প্রভাব ছিল বেশি। এ সময় বাবু ও পলাশ ছিলেন ‘সমানে সমান’। অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একজন আরেকজনের অনুসারীকে খুন করতে থাকেন। একপর্যায়ে বাবু কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন।

২০২৫ সালের ৩০শে মার্চ চার ঘণ্টার অভিযানে যৌথ বাহিনীর হাতে খুলনার সোনাডাঙ্গা থেকে ১০ সহযোগী এবং অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হন শেখ পলাশ। সেদিন তার দলের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোলাগুলিও হয়। পলাশ গ্রেপ্তার হওয়ার পর বাবু আবার অপরাধজগতের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি।
দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব কারাগারেও পৌঁছেছে। গত বছরের ১৭ই অক্টোবর কারাগারে দুই গ্রুপের সদস্যরা সংঘর্ষে জড়ায়। পরে লাঠিপেটা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হয়। আইনশৃঙ্খলা-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, টুটপাড়া, মহিরবাড়ি ও তালতলা এলাকায় নূর আজিম গ্রুপ এবং চানমারী, শিপইয়ার্ড রোড ও সাচিবুনিয়া এলাকায় আশিক বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। আশিকের উত্থান কিশোর গ্যাং থেকে। এ ছাড়া, লবণচরা-জিন্নাহপাড়া এলাকায় শাকিল গ্রুপ, দৌলতপুর, মহেশ্বরপাশা, দেয়ানা ও তেলিগাতি এলাকায় হুমা, আরমান ও নাসিমুল গণির নাম বেশি আলোচিত।

খুলনার অপরাধজগতের বিষয়ে খোঁজখবর রাখেন এমন একাধিক সূত্র বলছে, এখানকার অপরাধজগতের আরও কিছু মেরূকরণ হয়েছে। যেমন, হুমা গ্রুপ এখন বি-কোম্পানির সঙ্গে মিলেমিশে অপরাধে জড়াচ্ছে। আবার পলাশের সঙ্গে যোগ দিয়েছে আশিক বাহিনীর সদস্যরা। সম্প্রতি তিনটি ঠিকাদারি কাজে বাধা দেয়াসহ বেশ কয়েকটি অপরাধের ঘটনায় দুই গ্রুপের সম্মিলিত অপরাধের তথ্য পাওয়া গেছে।

বি-কোম্পানির ফেসবুক পেজে ঘোষণা দেয়া হয়, খুলনার ১ নম্বর কাস্টমস ঘাটে সাধারণ যাত্রীদের পারাপারের টোল বা ইজারার টাকা মওকুফ করা হয়েছে। আবার গত ২১শে মে ধর্ষণের বিরুদ্ধে দেশ জুড়ে প্রতিবাদের সময় ওই গ্রুপ ফেসবুকে ঘোষণা দেয়, ‘সঠিক তথ্যপ্রমাণসহ যদি কোনো ধর্ষণকারীকে খুলনায় শনাক্ত করা হয়, আমরা কথা দিচ্ছি, বি-কোম্পানির আদালতে তাকে সর্বোচ্চ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হবে।

খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে ‘ভঙ্গুর’ উল্লেখ করে মহানগর বিএনপি’র সভাপতি এডভোকেট এস এম শফিকুল আলম (মনা) বলেন, মানুষের নিরাপত্তা নেই। প্রকাশ্যে মানুষকে খুন করা হচ্ছে। যেকোনো সময় যেকোনো ব্যক্তির ওপর হামলা হচ্ছে, গুলির ঘটনা ঘটছে, চাঁদাবাজি হচ্ছে। এগুলো অবিলম্বে বন্ধ করা দরকার।

এ ব্যাপারে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার সাজ্জাদুর বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য আমাদের একাধিক টিম কাজ করছে। সন্ত্রাসীরা যে-ই হোক না কেন তাদের সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না। সন্ত্রাসীদের অবস্থান নিশ্চিত করতে আমাদের গোয়েন্দা টিম তৎপর রয়েছে।