শি জিনপিংয়ের ভারত সফরে কূটনৈতিক বরফ গলবে!

শি জিনপিংয়ের ভারত সফরে কূটনৈতিক বরফ গলবে!

ফন্ট সাইজ:

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বহুল প্রত্যাশিত ভারত সফর দুই বৃহৎ প্রতিবেশী দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের বরফ গলাতে আরও সহায়ক হতে পারে। তবে এ পর্যন্ত তাদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক উন্নতির তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, দুই দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখনো বিভিন্ন বাধার মুখে। এর মধ্যে রয়েছে নিয়ন্ত্রণমূলক বিধিনিষেধের কারণে বিনিয়োগ আটকে থাকা, ভিসা পেতে বিলম্ব এবং শিল্প সরঞ্জাম আমদানিতে বিধিনিষেধ। এসব বিষয় দুই দেশের কূটনৈতিক অগ্রগতি ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধানকে তুলে ধরছে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

বার্ষিক ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে শি জিনপিং নয়াদিল্লিতে উপস্থিত থাকবেন বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বেইজিং এখনো তার সফর নিশ্চিত করেনি। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে শি’র বৈঠক হবে কি না, তাও নিশ্চিত নয়। দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক কোন দিকে এগোবে, তা নির্ধারণে এই বৈঠক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

১৯৬২ সালে চীন ও ভারতের মধ্যে একটি স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধ হয়। এরপর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কে অবিশ্বাস ও সতর্কতা বিরাজ করছে। ২০২০ সালে সীমান্তে সংঘর্ষে ২০ ভারতীয় ও চার চীনা সেনা নিহত হওয়ার পর সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে ওঠে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের সম্পর্কের কিছুটা উন্নতি হয়েছে। বিশেষ করে গত বছর মোদির চীন সফরের পর এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দুই দেশেরই অস্থির সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এই উন্নতি হয়েছে।

সাংহাইয়ের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং নয়াদিল্লিতে চীনা দূতাবাসের সাবেক কূটনীতিক লিন মিনওয়াং বলেন, চীন অবশ্যই সম্পর্ক উন্নত করতে চায়। তবে ভারত আসলে কতটা সম্পর্ক উন্নত করতে প্রস্তুত, আমরা সেটিই দেখার অপেক্ষায় আছি। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের অগ্রগতি আপাতত হওয়ার সম্ভাবনা কম। নয়াদিল্লিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হর্ষ পান্ত বলেন, দুই দেশের মধ্যে আস্থার ঘাটতি অনেক বেশি। তিনি বলেন, চীনের অর্থনৈতিক সক্ষমতা রয়েছে এবং সেটি কাজে লাগিয়ে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠার ভালো সুযোগ তাদের সামনে রয়েছে। বিশেষ করে যখন দুই দেশই যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতির প্রভাবের মুখে পড়ছে।

২০২০ সালের সীমান্ত সংঘর্ষের পর চীনা বিনিয়োগের ওপর আরোপ করা কিছু বিধিনিষেধ মার্চে শিথিল করেছে ভারত। ইলেকট্রনিকস, মূলধনি পণ্য এবং সৌরকোষ খাতকে এই শিথিলতার আওতায় রাখা হয়েছে। কিছু শিল্পে ভারতীয় ও চীনা কোম্পানির যৌথ উদ্যোগের অনুমোদন দ্রুত করার বিষয়টিও বিবেচনা করছে নয়াদিল্লি। এরপর ভারত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভারতের ডিক্সন টেকনোলজিস এবং চীনের স্মার্টফোন নির্মাতা ভিভো মোবাইলের মধ্যে একটি উৎপাদন উদ্যোগ।

তবে নয়াদিল্লির বাড়তি নজরদারির মুখে ভারতে বিনিয়োগের পরিকল্পনা স্থগিত করা চীনের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোকে এখনো ফিরিয়ে আনতে পারেনি এসব পদক্ষেপ। ভারতীয় সরকারের একটি সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে রয়টার্স। এসব কোম্পানির মধ্যে রয়েছে গাড়ি নির্মাতা বিওয়াইডি এবং গ্রেট ওয়াল মোটর।

ভারতে চীনা কোম্পানিগুলোর প্রস্তাবিত বিনিয়োগ এখন বেইজিংয়ের কাছ থেকেও বাড়তি যাচাই-বাছাইয়ের মুখে পড়ছে। বিশেষ করে উন্নত উৎপাদন ও উচ্চপ্রযুক্তি জড়িত থাকতে পারে- এমন খাতে এই নজরদারি বেশি করা হচ্ছে বলে ভারতীয় সরকারের একটি সূত্র এবং আরও একজন ব্যক্তি জানিয়েছেন। সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি না থাকায় তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব তথ্য দিয়েছেন।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শি ও মোদি মনে করেন, দুই দেশ প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অংশীদার এবং একে অপরের উন্নয়নের জন্য হুমকি নয়, সুযোগ। ভারতের বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। চীনের অ্যান্ট গ্রুপের সঙ্গে সম্পর্কিত পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম আলিপে’কে ভারতের তাৎক্ষণিক অর্থপ্রদানের ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেনি নয়াদিল্লি।

জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে গত সপ্তাহে ভারত এই প্রস্তাব আটকে দিয়েছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স। ভারতীয় সরকার চীনের মোবাইল ফোন নির্মাতা শাওমি’র বিরুদ্ধে তদন্তের সুপারিশও বিবেচনা করছে। ভারতের সিরিয়াস ফ্রড ইনভেস্টিগেশন অফিস (এসএফআইও) শাওমির ভারতে ব্যবসায় কথিত অনিয়ম এবং বিদেশি বিনিয়োগ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে বিস্তারিত তদন্তের সুপারিশ করেছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স। শাওমি জানিয়েছে, তারা ভারতের সব স্থানীয় আইন মেনে চলে এবং এসএফআইও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি।