মরুভূমির দেশ সৌদি আরব কীভাবে মানুষের কাছে সুপেয় পানি পৌঁছে দেয়!

মরুভূমির দেশ সৌদি আরব কীভাবে মানুষের কাছে সুপেয় পানি পৌঁছে দেয়!

ফন্ট সাইজ:

ভাবুন তো এমন একটি দেশের কথা, যেখানে বিস্তীর্ণ এলাকা ‘জ্বলন্ত’ বালিতে ঢাকা, ৯৫ শতাংশেরও বেশি ভূখণ্ড শুষ্ক মরুভূমি, বছরে বৃষ্টিপাত প্রায়ই ১০০ মিলিমিটারের নিচে এবং গ্রীষ্মে তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়। অথচ এই কঠিন ভূপ্রকৃতির নিচেই রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সম্পদের মজুত। সৌদি আরবের মাটির নিচে রয়েছে ৪০ ট্রিলিয়ন লিটারেরও বেশি অপরিশোধিত তেল। বিপুল তেলসম্পদ থাকা সত্ত্বেও দেশটিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। তাহলে নিজেদের মানুষের জন্য পর্যাপ্ত সুপেয় পানি নিশ্চিত করা। ৩ কোটি ৭০ লাখের বেশি মানুষের দেশ সৌদি আরবে জনসংখ্যার বড় অংশ লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগরের উপকূলবর্তী এলাকায় বসবাস করে। অন্যদিকে দেশের বিস্তীর্ণ অভ্যন্তরীণ অঞ্চল এখনো জনবিরল এবং অত্যন্ত শুষ্ক। এ নিয়ে একটি বিস্তারিত রিপোর্ট প্রকাশ করেছে অনলাইন এনডিটিভি।

এতে আরও বলা হয়, এত বিশাল একটি দেশকে পানির জোগান দিতে সৌদি আরব উপকূল থেকে গভীর মরুভূমি পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল অবকাঠামো নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিশাল আকারের পাইপলাইন, যেগুলোর মাধ্যমে শত শত কিলোমিটার দূরে লবণমুক্ত পানি সরবরাহ করা হয়। বিশ্বের অন্যতম শুষ্ক অঞ্চলের মধ্য দিয়ে এভাবে তৈরি হয়েছে এক ধরনের কৃত্রিম নদীব্যবস্থা। প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো এমন পাইপলাইন তৈরি করা, যা কয়েক দশক ধরে প্রচণ্ড তাপ, বালুর স্থানান্তর এবং মাটির নিচের বিপুল চাপ সহ্য করতে পারে। এগুলো সাধারণ কোনো পাইপ নয়। তেল ও গ্যাসের পাইপলাইনে ব্যবহৃত উচ্চ শক্তির কার্বন স্টিল দিয়ে এগুলো তৈরি করা হয়। প্রায় ২৫ মিলিমিটার পুরু স্টিলের পাত মাল্টি-অ্যাক্সিস রোলিং মেশিনের মাধ্যমে বাঁকিয়ে প্রায় ১ দশমিক ৮ মিটার ব্যাসের বিশাল পাইপ তৈরি করা হয়।

প্রতিটি পাইপের অংশ ১২ থেকে ১৮ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এতে পুরো পথে জোড়ার সংখ্যা কম থাকে। কারখানা থেকে বের হওয়ার আগে পাইপগুলো আল্ট্রাসনিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যায় এবং ক্ষয়রোধী আবরণ দেয়া হয়। এরপর বিশেষ ভারী ট্রাকে করে সেগুলো মরুভূমির ভেতর দিয়ে শত শত কিলোমিটার দূরে নিয়ে যাওয়া হয়। মরুভূমির ওপর দিয়ে পাইপলাইন স্থাপন করাও একটি বড় প্রকৌশল চ্যালেঞ্জ। প্রথমে জরিপকারী দল জিপিএস ও আধুনিক জরিপ সরঞ্জাম ব্যবহার করে সম্ভাব্য পথ নির্ধারণ করে। এ সময় এমন এলাকা এড়িয়ে চলা হয়, যেখানে স্থানান্তরিত বালিয়াড়ি বা অস্থিতিশীল মাটি পাইপলাইনের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। পাথুরে এলাকা বা পাহাড় সামনে পড়লে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে পাথর ভেঙে গভীর খাত তৈরি করা হয়। এরপর সেই খাতে পাইপ নামিয়ে একের পর এক অংশ জোড়া দেয়া হয়। এভাবেই শেষ পর্যন্ত মরুভূমির নিচে গড়ে ওঠে বিশাল পাইপলাইন নেটওয়ার্ক।

তবে উপকূল থেকে দেশের অভ্যন্তরে পানি পৌঁছে দেয়া চ্যালেঞ্জের মাত্র অর্ধেক। বড় প্রশ্ন হলো, এই পানি আসছে কোথা থেকে? পুরো প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বিস্ময়কর অংশটি ঘটে উপকূলীয় এলাকায় থাকা লবণমুক্তকরণ বা ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টে। সমুদ্রতীর থেকে কয়েকশ মিটার দূরে বড় বড় পানি সংগ্রহের পাইপ বসানো হয়। এসব পাইপের মাধ্যমে সমুদ্রের পানি প্ল্যান্টে আনা হয়। একটি ৬৩ সেন্টিমিটার ব্যাসের পাইপ দিনে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ লিটার পানি পরিবহন করতে পারে বলে জানা গেছে। মাছ, কাঁকড়া ও জেলিফিশের মতো সামুদ্রিক প্রাণী যাতে পানির সঙ্গে সিস্টেমে ঢুকে না পড়ে, সে জন্য সুরক্ষামূলক স্ক্রিন ব্যবহার করা হয়। প্রথমে সমুদ্রের পানি গ্র্যাভিটি স্যান্ড ফিল্টারের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করা হয়। এ সময় ফেরিক ক্লোরাইড ও সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইটের মতো রাসায়নিক যোগ করা হয়, যাতে পানির অপ্রয়োজনীয় অংশ একত্রিত হয়ে নিচে জমে যায়।

এরপর পানি আল্ট্রা-ফাইন কার্টিজ ফিল্টারের মধ্য দিয়ে যায়। এসব ফিল্টার ১ থেকে ৫ মাইক্রন পর্যন্ত ক্ষুদ্র কণাও আটকে দিতে পারে। এরপর আসে মূল ধাপ। উচ্চচাপের পাম্প প্রায় ৬০ বার চাপ প্রয়োগ করে পানিকে রিভার্স অসমোসিস বা আর-ও মেমব্রেনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করে। এই চাপ বায়ুমণ্ডলীয় চাপের প্রায় ৬০ গুণ। এতে মূলত পানির অণুগুলো মেমব্রেন অতিক্রম করতে পারে, অন্যদিকে লবণ ও অন্যান্য উপাদান আটকে যায়। আরও বিশুদ্ধ করার জন্য পানি দ্বিতীয়বার রিভার্স অসমোসিস প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েও যেতে পারে। তবে এখানে একটি সমস্যা রয়েছে। এতটা বিশুদ্ধ করা পানিতে খনিজের পরিমাণ খুবই কম থাকে এবং এর স্বাদ অনেকটা পানসে লাগতে পারে। তাই ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামের মতো প্রয়োজনীয় খনিজ আবার পানিতে যোগ করা হয়। একই সঙ্গে পানির পিএইচ মাত্রা সতর্কতার সঙ্গে সমন্বয় করা হয়, যাতে পানি পানযোগ্য ও স্বাদে গ্রহণযোগ্য হয়।

এত বিশাল পানি সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। পাইপলাইন নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে কয়েক মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে। অন্যদিকে বড় আকারের ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট নির্মাণে শত শত মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। প্রযুক্তি, জ্বালানির দাম ও প্ল্যান্টের দক্ষতার ওপর নির্ভর করে এক ঘনমিটার পানি উৎপাদনে কয়েক ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে। তবে সৌদি আরবের জন্য হিসাবটা শুধু অর্থের নয়। যে দেশে প্রাকৃতিকভাবে সুপেয় পানির সংকট রয়েছে এবং লাখ লাখ মানুষ নির্ভরযোগ্য পানি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করে ব্যবহারযোগ্য পানি তৈরি করা জাতীয় অবকাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।