খাদ্যে অনিয়মের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’, এক আমলার ভয়ে কাঁপছে মুম্বাই

খাদ্যে অনিয়মের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’, এক আমলার ভয়ে কাঁপছে মুম্বাই

ফন্ট সাইজ:

ছবিগুলো এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়। রান্নাঘরের মেঝেতে ছুটে বেড়াচ্ছে তেলাপোকা। দেয়ালে জমে আছে মাকড়সার জাল। এক কোণে পচে যাচ্ছে সবজি। খাবার রাখার কাউন্টারেও দেখা যাচ্ছে পোকামাকড়ের উপদ্রবের চিহ্ন।
দৃশ্যগুলো দেখে মনে হতে পারে, কোনো দুরবস্থায় থাকা রেস্তোরাঁর ছবি এগুলো। কিন্তু ছবিগুলো ভারতের আর্থিক রাজধানী মুম্বাইয়ের একটি সদস্যভিত্তিক ক্লাবের। মুম্বাই ভারতের সবচেয়ে ধনী রাজ্য মহারাষ্ট্রের রাজধানীও।
মহারাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) রাজ্যজুড়ে রেস্তোরাঁ, ক্যাফে ও অন্যান্য খাদ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিক পরিদর্শন শুরু করার পর মে মাস থেকে এমন ডজন ডজন ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এই অভিযানের কেন্দ্রে রয়েছেন ৫১ বছর বয়সী সরকারি কর্মকর্তা ও রাজ্যের নতুন খাদ্য কমিশনার তুকারাম মুন্ধে।

মে মাসে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে মুন্ধে হাজার হাজার পরিদর্শনের তদারকি করেছেন। তার বক্তব্য, কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কত বড়, কতটা প্রভাবশালী কিংবা কতটা খ্যাতনামা- তা বিবেচনা না করে খাদ্য নিরাপত্তা আইন কার্যকর করতে হবে।
তার দপ্তর কয়েকটি কুইক-কমার্স গুদামের লাইসেন্স স্থগিত করেছে। পাশাপাশি নিষিদ্ধ পণ্যের পরোক্ষ প্রচারে সন্দেহজনকভাবে যুক্ত বিজ্ঞাপন করায় বলিউডের কয়েকজন তারকাকেও নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
বিবিসিকে মুন্ধে বলেন, জনস্বাস্থ্যের স্বার্থেই এসব ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। নিয়ম লঙ্ঘন হলে আমরা ব্যবস্থা নেয়া অব্যাহত রাখব। এই অভিযান মুন্ধেকে পুরো ভারতেই পরিচিত মুখে পরিণত করেছে।

তার পরিদর্শন ও সংবাদ সম্মেলনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। বিভিন্ন রিলস ও পডকাস্টের মাধ্যমে তিনি এখন অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবেই তারকাখ্যাতি পেয়েছেন।
ভারতের প্রশাসনিক সার্ভিসের (আইএএস) এই কর্মকর্তা দুই দশকের বেশি সময় ধরে চাকরি করছেন। এ সময়ে তাকে এতবার বদলি করা হয়েছে যে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার বদলির সংখ্যা চাকরির বছরের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। তবে মুন্ধে নিজে এ সংখ্যা নিশ্চিত করতে চাননি। বিবিসিকে তিনি বলেন, আমি আমার বদলির সংখ্যা গোনা বন্ধ করে দিয়েছি।

মুন্ধের স্থানীয় মারাঠি ভাষায় জীবনী লিখেছেন সাংবাদিক শফি পাঠান। তিনি বলেন, মহামারির সময় নাগপুর থেকে তাকে বদলি করা হলে হাজার হাজার মানুষ তার বাড়ির বাইরে জড়ো হয়ে বিদায় জানিয়েছিলেন। নিজের গাড়িতে পৌঁছাতেই তার এক ঘণ্টা লেগেছিল।
তবে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে সাম্প্রতিক অভিযানই মুন্ধেকে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এনেছে।
ভারতে খাদ্য নিরাপত্তার সমস্যা যে কতটা গুরুতর, তার কিছুটা ধারণা পাওয়া যায় জুলাইয়ে দেশটির পার্লামেন্টে উপস্থাপিত পরিসংখ্যানে। ২০২৫ ও ২০২৬ সালে ভারতে পরীক্ষা করা ২ লাখ ২৩ হাজার ৮০৮টি খাদ্য নমুনার প্রায় পাঁচটির একটিতে সমস্যা পাওয়া গেছে। এই পরিস্থিতিতে মহারাষ্ট্রে মুন্ধে অস্বাভাবিকভাবে কঠোর অভিযান শুরু করেন।
জুলাইয়ের শেষ নাগাদ তার দপ্তর রাজ্যজুড়ে ৩ হাজার ১০০টির বেশি অভিযান চালিয়েছে। মুন্ধের ধারণা, এরপর সেই সংখ্যা ৪ হাজার ছাড়িয়ে গেছে ।

ভারতের খাদ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার সাবেক প্রধান পবন আগরওয়াল বিবিসিকে বলেন, এখানে স্বাস্থ্যবিধির সমস্যা সবসময়ই ছিল। মুন্ধে যে কাজটি ভিন্নভাবে করেছেন, তা হলো বিষয়টিকে দৃশ্যমান করে তুলেছেন।
এই অভিযান মুন্ধেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তারকাতেও পরিণত করেছে। ইনস্টাগ্রামে তার অনুসারীর সংখ্যা এখন ৩৮ লাখের বেশি। তবে ভোক্তারা তার পদক্ষেপের গতি ও দৃশ্যমানতাকে স্বাগত জানালেও খাদ্য ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অনেকেই এতে খুশি নন।
রেস্তোরাঁ মালিকদের বিভিন্ন সংগঠনের অভিযোগ, মুন্ধে আইন নির্ধারিত প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন। আদালতও তার কিছু পদক্ষেপকে ‘হাই-হ্যান্ডেড’ বা অতিরিক্ত কঠোর বলে মন্তব্য করেছেন।
সমালোচনার জবাবে মুন্ধে বলেছেন, তার অভিযান আইনসম্মত এবং কেবল গুরুতর ক্ষেত্রেই লাইসেন্স স্থগিত করা হয়।