পশ্চিম তীরে ইসরাইলি অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাদের অত্যাচারে ফিলিস্তিনিদের নাভিশ্বাস। প্রতিদিনই তাদের ওপর হামলা চালাচ্ছে এসব বসতি স্থাপনকারীরা। তার ওপর ইসরাইল কর্তৃপক্ষ ফিলিস্তিনিদেরকে তাদের ভূমি থেকে উচ্ছেদের হুমকি দিয়েছে।
ওদিকে ফিলিস্তিনে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হয়েছে। কিন্তু অভিভাবকরা সন্তানদেরকে স্কুলে পাঠানোর সাহস পাচ্ছেন না। একদিকে ইসরাইলের হামলা, অন্যদিকে বসতি স্থাপনকারীদের অত্যাচার। আর আন্তর্জাতিক দুনিয়া শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। এই অবস্থায় পশ্চিমতীর, গাজা সহ ফিলিস্তিনিদের জীবনে নেমে এসেছে ঘোর অমানিশা। এর মধ্যে নতুন ফিলিস্তিনি শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনে আল-মুঘাইয়ির বালক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাসাম আল-আসাফ ভোর হওয়ার আগেই স্কুলে পৌঁছান। গ্রামের চারপাশের জলপাইগাছ। তার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো উঁকি দিচ্ছিল। এমন সময় তিনি সদ্য স্থাপন করা কাঁটাতারের বেড়া ও শক্তিশালী করা স্কুলের ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢোকেন। অধিকৃত পশ্চিম তীরের গভীরে অবস্থিত এই গ্রামটি এখন নিরাপত্তাহীনতার চাপে। অনলাইন বিবিসি বলছে, এ বছর আল-মুঘাইয়িরে ছয়জন নিহত হয়েছেন। তার মধ্যে বিদ্যালয়টির তিন শিক্ষার্থীও রয়েছে। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বৃদ্ধির মধ্যেই এসব প্রাণহানি ঘটেছে। নিহতদের একজন ১৪ বছর বয়সী আওস আল-নাসান। এপ্রিলে স্কুলের ফটকের বাইরে এক বসতি স্থাপনকারীর গুলিতে সে নিহত হয়।
ইংরেজির শিক্ষক ওয়াহিদ আবু নাঈম বলেন, আমি শ্রেণিকক্ষের ভেতরে ছিলাম। হঠাৎ ছোট দুই শিক্ষার্থী ছুটে এসে জানায়, স্কুলের দেয়ালের কাছে বসতি স্থাপনকারীরা। তারা হামলা চালায়। ইসরাইলি এক সেনার গুলিতে নিহত হয় জিহাদ নামে এক শিশু। ওয়াহিদ বলেন, বসতি স্থাপনকারী গুলি চালানোর সময় তিনি শিক্ষার্থীদের স্কুলের ফটকের ভেতরে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভিডিওতে আওসকে গুলি করার মুহূর্ত দেখা যায়। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী বিবৃতিতে জানায়, রিজার্ভ সেনাসহ বেসামরিক নাগরিকদের বহনকারী একটি গাড়িতে পাথর ছোড়া হয়েছিল। এরপর ওই রিজার্ভ সেনা গাড়ি থেকে নেমে সন্দেহভাজনদের লক্ষ্য করে গুলি চালান। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই রিজার্ভ সেনাকে পরে দায়িত্ব থেকে সাময়িকভাবে সরিয়ে দেয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। সেই ঘটনার পর থেকে হতাহতের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে অভিভাবকদের উদ্বেগও। গ্রীষ্মকালেই বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ও গ্রামে প্রবেশের সময় ইসরাইলি বাহিনীর গুলিতে আরও দুই শিক্ষার্থী নিহত হয়। এ ছাড়া সদ্য স্কুল শেষ করা ১৯ বছর বয়সী এক তরুণও নিহত হন।
আল-মুঘাইয়িরের একেবারে প্রান্তে অবস্থিত বিদ্যালয়টি রামাল্লার উত্তর-পূর্বের একটি বিচ্ছিন্ন গ্রামে। গ্রামটি এখন ক্রমেই ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের বিভিন্ন আউটপোস্টে ঘিরে যাচ্ছে। ইসরাইলি বাহিনী প্রায়ই গ্রামের প্রবেশপথ বন্ধ করে দেয় এবং সেখানে নিজেদের মতো করে অস্থায়ী চেকপোস্ট বসায়। অভিভাবকদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা হিসেবে বাসাম আল-আসাফ স্কুল চত্বর ঘিরে দীর্ঘ কাঁটাতারের বেড়া স্থাপন করেছেন এবং স্কুলের ফটক আরও শক্তিশালী করেছেন। এখন স্কুলের বাইরের সড়কে অ্যাম্বুলেন্সের কর্মীরাও অবস্থান করছেন। কয়েকজন অভিভাবক সুরক্ষার অতিরিক্ত ব্যবস্থা হিসেবে সারা দিন স্কুলের বাইরে অপেক্ষা করতে স্বেচ্ছাসেবীর দায়িত্ব নিয়েছেন। তাদের একজন হারুন বিশারা। তিনি বলেণ, আমি এসেছি, কারণ এতে শিশুরা অনুভব করে যে তাদের বাবা-মা তাদের সঙ্গে আছেন, তারা নিরাপদ। হারুন বিশারা দুই ছেলে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রথম সমাবেশে শিক্ষার্থীরা মাঠে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ায়। সারা দিন শিক্ষকরা তাদের বারবার একই নির্দেশনা দেন। বলেন, সেনা বা বসতি স্থাপনকারীরা স্কুলের কাছে এলে চিৎকার করা যাবে না, তাদের কাছে যাওয়া যাবে না এবং কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানো যাবে না। ক্লাস শুরুর মাত্র এক ঘণ্টার কিছু বেশি সময় পর স্কুলের জানালা দিয়ে বসতি স্থাপনকারীদের দেখা যায়। দু’জন ব্যক্তি স্কুল থেকে কয়েক শ মিটার দূরে ফিলিস্তিনিদের কৃষিজমির মধ্য দিয়ে ভেড়া নিয়ে যাচ্ছিলেন। কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলেন ইসরাইলি সেনারা। কয়েক মিনিট পর ভেড়ার পাল নিয়ে আরও এক বসতি স্থাপনকারীকে দেখা যায়। এপ্রিলের পর থেকে তারা গ্রামের আরও কাছে চলে এসেছে বলে মন্তব্য করেন আবু নাঈম। তিনি বলেন, আগে তারা ওই পাহাড়ের পেছনে ভেড়া রাখত। এখন সেনারা বসতি স্থাপনকারীদের গ্রাম পর্যন্ত নিয়ে আসে।
