সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। অতিরিক্ত ভিড়, জনবল সংকট এবং কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনার কারণে টিকিট কাটা থেকে শুরু করে পরীক্ষা ও রিপোর্ট হাতে পেতে পুরো দিনই পার হয়ে যাচ্ছে। অসুস্থ শরীর নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে সাধারণ রোগীরা আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। গত কয়েকদিন বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
রাজধানীর শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী হাসপাতালে সকাল ১১টার দিকে পরীক্ষার নমুনা দিতে বুথের সামনে লাইনে বসে ছিলেন হামিদা বেগম। ঠিকমতো দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলেন না তিনি। লাইন ভেঙে কেউ তাকে নমুনা দিতেও দিচ্ছিল না। শেষমেশ সেখানেই বসে পড়েন তিনি। হামিদা মানবজমিনকে বলেন, সকাল ৯টার দিকে হাসপাতালে এসেছি। টিকিট কাটতে ৪০ মিনিট চলে গেছে। এরপর ডাক্তার দেখানো থেকে সবকিছুতে ২ ঘণ্টা লেগেছে। সাভার থেকে অসুস্থ শরীর নিয়ে এসেছি। কেউ সিরিয়াল ভেঙে আগে যেতেও দিচ্ছে না। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েছি। আমাদের এত টাকা নেই যে, বেসরকারি হাসপাতালে ডাক্তার দেখাবো।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা সাজ্জাদ রহমান দুপুর ৩টার দিকে টেস্টের টাকা জমা দিতে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি মানবজমিনকে বলেন, একটি টেস্টের জন্য সকাল ৮টায় লাইনে দাঁড়াই। ১০টা ৫ মিনিটে আমার সিরিয়াল আসে। তখন টাকা জমা দিয়ে স্লিপ নেই। এরপর আরেকটি টেস্টের জন্য ১১টায় এসে লাইনে দাঁড়াই। ১টা ১৫ মিনিটে দায়িত্বপ্রাপ্তরা খাবারের বিরতিতে চলে যান। বলেন, আড়াইটা থেকে টাকা জমা নেয়া হবে। ঠিক আড়াইটায় এসে ফের লাইনে দাঁড়াই। এখন ৩টা ৫ বাজে। কেউ নেই। শুধুমাত্র একজন আছেন। তিনি নারী-পুরুষের দু’টি লাইনের টাকা একাই জমা নিচ্ছেন। অথচ এখানে বুথ ৫টি। এভাবে সরকারি চাকরি করে ফাঁকি দিলে সাধারণ মানুষ কীভাবে উপকৃত হবে? আমাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে রেখে শুধু হয়রানি করা হচ্ছে। সাজ্জাদ বলেন, না ঘুমিয়ে সকালে উঠে এখানে লাইনে দাঁড়িয়েছি। সকালে টাকা জমা দিতে পারলে ৫টার মধ্যে রিপোর্ট চলে আসতো। কিন্তু এখন জমা দিলে রিপোর্ট আসবে ৮টায়। আজ টাকা জমা দিতে পারবো কিনা তারও নিশ্চয়তা নেই। চিকিৎসককে রিপোর্ট দেখাবো কীভাবে? রিপোর্ট আসতে আসতে তো কাউকে পাবো না।
শিক্ষার্থী ইমান হোসেন আদাবর থেকে ঠান্ডাজনিত সমস্যা নিয়ে সকাল ৯টায় হাসপাতালে আসেন। টিকিট কাটতে আর চিকিৎসককে দেখাতে বেজে যায় ১১টা। এরপর টেস্টের টাকা জমা দিতে লাইনে দাঁড়ান। ১টার দিকে তিনি টাকা জমা দিতে পারেন। এরপর স্যাম্পল জমা দেয়ার জন্য লাইনে দাঁড়ান। একটু পরেই সেখানকার দায়িত্বরতরা দুপুরের খাবারের বিরতিতে চলে যান। তারা ৩টার পর স্যাম্পল জমা নেয়া শুরু করেন। ইমান হোসেন মানবজমিনকে বলেন, সকাল ৯টায় এসেছি। সাড়ে ৩টায় টেস্টের জন্য স্যাম্পল জমা দিতে পেরেছি। এখন রিপোর্ট আসতে ৮টা বাজবে। আজ তো আর ডাক্তার দেখাতে পারবো না। কাল আবার লম্বা লাইন পেরিয়ে ডাক্তারকে রিপোর্ট দেখাতে হবে।
সকাল ১০টায় কচুক্ষেত থেকে আসেন মো. সুমন। স্ত্রীকে হাসপাতালে ভর্তি করেছেন। চিকিৎসক কিছু টেস্ট দিয়েছেন। রিপোর্ট দেখে চিকিৎসা শুরু করেন। কিন্তু টেস্টের টাকা ৩ ঘণ্টায়ও জমা দিতে পারেননি তিনি। এ বিষয়ে সুমন মানবজমিনকে বলেন, আমার স্ত্রীকে জরুরি বিভাগে চিকিৎসককে দেখালে হাসপাতালে ভর্তি করে। এরপর কিছু টেস্ট দেন। ১১টার দিকে টাকা জমা দেয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছি। ৩টার পরেও জমা দিতে পারিনি। টেস্টের রিপোর্ট দেখে ডাক্তার চিকিৎসা দেবে। অথচ আজ টেস্ট করাতে পারবো কিনা তার নিশ্চয়তা নেই।
কল্যাণপুর থেকে শরীফ আসেন আউটডোরে চিকিৎসক দেখাতে। তিনি মানবজমিনকে বলেন, টিকিটের সিরিয়াল পেতে লেগেছে ১ ঘণ্টা। ডাক্তার দেখাতে চলে গেছে আধা ঘণ্টা। এরপর টেস্টের টাকা জমা দিতে লাগে ২ ঘণ্টা। ৫টি বুথ আছে। এরপরও দীর্ঘ সময় লাগছে। অনেক বেশি মানুষ এসেছেন। তাহলে বুথের সংখ্যা বাড়ান। মানুষের সময়ের মূল্য আছে। তিনি বলেন, যারা এসেছেন সবাই অসুস্থ। সুস্থ হতে এসে মানুষ আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছে।
রোগ ছড়ায় শৌচাগার থেকে: শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনদের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। সুস্থ হতে হাসপাতালে এলেও এখানকার চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ মানুষকে আরও বেশি অসুস্থ করে তুলছে।
সরজমিন দেখা যায়, হাসপাতালের টয়লেটগুলো ব্যবহার করার মতো অবস্থা নেই। সবগুলো অপরিষ্কার, দুর্গন্ধযুক্ত। যেন ময়লার ভাগাড়। এ ছাড়া হাসপাতালের অনেক শয্যা ভেঙে গেছে। ভাঙা শয্যায় টুল লাগিয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে। ৫৩০ নম্বর ওয়ার্ডের ২১ নম্বর শয্যায় ভর্তি আছেন আমজাদ হোসেন (৪৮)। ফেনী থেকে এসেছেন তিনি। আমজাদ হোসেন মানবজমিনকে বলেন, পুরো হাসপাতাল ছাড়পোকা ও তেলাপোকার আস্তানা হয়ে আছে। কোথাও হাত বাড়ালেই এসব সামনে আসে। কোনো খাবার খোলা রাখা যায় না। টয়লেট তো ব্যবহার করার মতো নয়। আমি ১২ দিন থেকে ভর্তি আছি। ঠিকমতো টয়লেটে যেতে পারি না। গোসল করারও ইচ্ছে হয় না। তিনি বলেন, হাসপাতালে পর্যাপ্ত গামলা নেই। ভর্তির ৫ দিন পরে আমি গামলা পেয়েছি।
পটুয়াখালী থেকে এসে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মাওলানা জাকির হোসেন (৬০)। ৫৩০ নম্বর ওয়ার্ডের ২০ নম্বর শয্যায় ভর্তি আছেন তিনি। জাকির হোসেন মানবজমিনকে বলেন, এত নোংরা টয়লেট জীবনেও দেখিনি। সকালে নামকাওয়াস্তে পরিষ্কার করে। একটু পরেই এসব আগের মতো অবস্থায় চলে যায়। বেসিনগুলো সব নষ্ট।
ওই ওয়ার্ডের ২০ নম্বর শয্যার রোগীর স্বজন মো. সোহেল মানবজমিনকে বলেন, এমনিতেই টয়লেটগুলো ব্যবহার করার মতো না। টয়লেটে এখন পা ফেলা যায় না। সবাই পাশের ওয়ার্ডের টয়লেট ব্যবহার করছে। এজন্য সেখানে অতিরিক্ত চাপ পড়েছে। সকালে উঠে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সিরিয়ালে থাকতে হয়।
