গুরুতর অসুস্থ ও মুমূর্ষু রোগীদের বহনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ ট্রলি ও হুইলচেয়ার। সব সরকারি হাসপাতালে রোগীদের জন্য ট্রলি ও হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু এই সুবিধা পেতেও দিতে হয় টাকা। অসুস্থ রোগীর অসহায়ত্বকে পুঁজি করে সরকারি হাসপাতালে গড়ে উঠেছে ট্রলি, স্ট্রেচার ও হুইলচেয়ার বাণিজ্য।
গত মার্চে দেশের সব সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে হুইলচেয়ার-ট্রলি সরবরাহের নির্দেশ দেয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ। একই সঙ্গে দালালের দৌরাত্ম্য বন্ধে সাত দফা নির্দেশনা দেয়া হয়। বলা হয়েছিল, ‘হাসপাতালে বিনামূল্যে হুইলচেয়ার-ট্রলি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কাছাকাছি দৃশ্যমান স্থানে হুইলচেয়ার-ট্রলি রাখতে হবে এবং বিনামূল্যে প্রদানের লিখিত নির্দেশনা টাঙাতে হবে। নির্দিষ্ট ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় হাসপাতালের সেবাকর্মী বা ওয়ার্ডবয় হুইলচেয়ার-ট্রলি বহন করবে। এবং বহিরাগত কেউ হুইলচেয়ার-ট্রলি বহন বা টাকার বিনিময়ে হুইলচেয়ার-ট্রলি সরবরাহ কিংবা সেবা প্রদান করতে পারবে না।’ কিন্তু বাস্তবে এর ছিটেফোঁটাও নেই। দেয়ালে বিনামূল্যে প্রদানের লিখিত নির্দেশনা টাঙানো থাকলেও নেই প্রয়োগ।
সরকারি তিনটি বড় হাসপাতাল সরজমিন অনুসন্ধানে উঠে আসে, টাকা ছাড়া ট্রলি অথবা হুইলচেয়ার পাওয়া দুরূহ। টাকা নির্ধারণ করা হয় মিনিট হিসেবে। ২০ মিনিটের জন্য ট্রলি বা হুইলচেয়ার নিতে গুনতে হয় ২০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত।
২৪শে আগস্ট সোমবার বিকাল ৪টায় ঢাকা মেডিকেলে পুরাতন ভবনে নিউরো সার্জন বিভাগের সামনে স্ট্রেচারের খোঁজ করছিলেন বিল্লাল হোসেন। তার মায়ের এক্সরে আর ব্লাড টেস্ট করতে হবে। একজন হুইলচেয়ার নিয়ে এসে বলে, নিয়ে যাবো। কিন্তু টাকা দিতে হবে ৫০০। পরে হুইলচেয়ারে করে রোগীকে নিয়ে যাওয়ার জন্য ৩০০ টাকায় রফাদফা হয়। এ সময় বিল্লাল হোসেন মানবজমিনকে বলেন, আমরা জানি ট্রলি, স্ট্রেচার এগুলো সরকারি। এগুলো পরিবহনে কেন টাকা দিতে হবে?
২০শে আগস্ট বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জ থেকে মাকে নিয়ে ঢামেকে আসেন অন্তিম। জরুরি বিভাগে নিয়ে আসার পর ট্রলি পরিবহনে দায়িত্বরত কর্মচারীরা তাকে নিয়ে মেডিকেল অফিসারের রুমে যান। এরপর ডাক্তার ভর্তির রেফারেন্স করলে সার্জারি বিভাগে নিয়ে যান। রোগীকে নিয়ে আসার পর প্রথমে ট্রলি কর্মচারীকে অন্তিম ৩০০ টাকা দেন। কিন্তু ঐ কর্মচারী ৬০০ টাকা দাবি করেন। পরে ৫০০ টাকা দিতে বাধ্য হয়।
শুধু অন্তিমই নয় লিভারের সমস্যা নিয়ে ভর্তি আসলামকেও একই ভোগান্তি পোহাতে হয়। আসলামের স্বজন ওয়াসিম জানান, এখানে আসার পর এক লোক ট্রলি নিয়ে আমাদের জরুরি বিভাগে নিয়ে যায়। এরপর ওয়ার্ডে আসার পর সে টাকা দাবি করে। পরে ৫০০ টাকা দিয়েছি তাকে। তিনি বলেন, এখানে টাকা ছাড়া ট্রলি বা হুইলচেয়ার পাওয়া যায় না।
সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও একই চিত্র: গত ২৩শে আগস্ট রোববার বিকাল ৩টায় স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেলের জরুরি বিভাগে অসুস্থ মাকে নিয়ে আসেন ইয়াকুব আলী। ট্রলির খোঁজ করছিলেন তিনি। মেডিকেলের এক কর্মচারী ট্রলি নিয়ে আসেন। পরে তাদের জরুরি বিভাগের মেডিকেল অফিসারের কাছে নিয়ে যান। সেখান থেকে ডাক্তার তাদের মেডিসিন ওয়ার্ডে রেফার করেন। রোগীকে ওয়ার্ডে নেয়ার পর ওই কর্মচারী তাদের কাছে টাকা দাবি করেন। ইয়াকুব আলী বলেন, ওই ছেলে ৫০০ টাকা চেয়েছে। আমি তাকে ৩০০ টাকা দিয়েছি। নিয়ম তো ফ্রি সার্ভিস দেয়ার। ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার জন্য তো আর ঝগড়া করতে পারি না।
একই হাসপাতালে আইসিইউর সামনে কথা হয় শাকিল হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমার মেয়ের কিডনিতে সমস্যা। আইসিইউতে আছে। সেখানে কর্তব্যরত নার্সরা শুধু স্লিপ ধরিয়ে দেয়। এই টেস্ট লাগবে, ওই টেস্ট লাগবে। কিন্তু টেস্ট করাতে গেলে লম্বা সিরিয়াল। আইসিইউর রোগীর জন্য আলাদা ব্যবস্থা নেই। রোগীকে আনা-নেয়ার ট্রলি ব্যবসা রয়েছে। টাকা ছাড়া ফ্রিতে ট্রলি ও হুইলচেয়ার মেলে না।
সোহ্রাওয়ার্দী মেডিকেলে ১০ মিনিটের জন্য ৩০০ টাকা: সোহ্রাওয়ার্দী মেডিকেলে ট্রলি কিংবা হুইলচেয়ার ব্যবহারে মিনিটের হিসেবে টাকা দিতে হয়। সোহ্রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৫২৯ নম্বর ওয়ার্ডের রোগীর স্বজন মো. সোহেল মানবজমিনকে বলেন, ১০ই আগস্ট বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি করি। নিচতলা থেকে ৫ তলায় উঠতে হুইলচেয়ার খুঁজছিলাম। একজন স্টাফ এসে বলেন, টাকা দিলেই তিনি ব্যবস্থা করে দিবেন। ১০ মিনিটের জন্য ভাড়া দিতে হবে ৩০০ টাকা। টাকা না দিলে স্ট্রেচার দিবে না বলে জানিয়ে দেয়। এ ছাড়াও বাড়াবাড়ি করলে হাসপাতালে চিকিৎসা পাবো না বলেও হুমকি দেয়। পরে বাধ্য হয়ে ৩০০ টাকা দিয়ে বাবাকে উপরে নিয়ে যাই। আবার সিটে উঠার জন্য ওয়ার্ড বয়কে ২০০ টাকা বকশিশ দিতে হয়েছে। তিনি বলেন, এখানে টাকা ছাড়া গাছের পাতাও নড়ে না।
একই হাসপাতালের ২১৭ নম্বর ওয়ার্ডের এক রোগীর স্বজন হেলাল হোসেন মানবজমিনকে বলেন, আমার মাকে জরুরি বিভাগে দেখালে হাসপাতালে ভর্তি করার জন্য বলে। এরপর ভর্তির কাগজপত্র প্রস্তুত করে মাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য ট্রলি চাই। নিচ তলা থেকে ২য় তলায় নিয়ে যেতে হবে। একজন স্টাফ এসে বলেন, ট্রলি টানতে কষ্ট হয়। টাকা ছাড়া কাজ হবে না। উপরে নিয়ে গিয়ে ৬০০ টাকা দিতে বলে। পরে বাধ্য হয়ে ৫০০ টাকা দিতে হয়েছে। অথচ দেয়ালে লেখা ছিল- ‘ট্রলির জন্য কোনো টাকা লাগবে না’।
এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস মানবজমিনকে বলেন, জনবল সংকটের কারণে হাসপাতালের ভেতরে আমাদের যে সমস্ত সেবা দেয়ার কথা তা পর্যাপ্ত দেয়া যাচ্ছে না। আনুপাতিক হারে আমাদের জনবল নেই। এই সুযোগটাই নিচ্ছে অসাধু ব্যক্তিরা। অভিযোগ পেলে আমরা ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।
