প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে রোগীদের জন্য বিনামূল্যে খাবার সরবরাহ করা হয়। সাধারণ রোগীদের চার বেলার খাবারের জন্য প্রতিদিন ১৭৫ টাকা বরাদ্দ। রোগীদের বিনামূল্যের এই খাবারের মান নিয়ে আছে এন্তার অভিযোগ। মোটা চালের ভাত, পাতলা ডাল এবং মানহীন তরকারি সরবরাহ করা হয়। খাদ্যের মান যাচাই ও পুষ্টিবিদদের তদারকির কথা থাকলেও তা কেবল কাগজ-কলমে। খাবারের মান খারাপ হওয়ায় অনেক রোগীর খাবার আনতে হয় বাইরে থেকে।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সরজমিন দেখা যায়, প্রতিদিন নিম্নমানের খাবার দেয়া হয় রোগীদের। সকালের নাস্তায় শক্ত পাউরুটি, ছোট ডিম ও নিম্নমানের কলা দেয়া হয়। দুপুরের ও রাতের খাবারে ডালের শুধু পানিই দেখা যায়। পাতলা ঝোলের নিচে ডুবে থাকে ছোট মাংসের টুকরো। মাছের আঁশ পর্যন্ত ভালোভাবে পরিষ্কার করা হয় না। সবচেয়ে কম দামি চাল দিয়ে রান্না হয় ভাত। প্রতি বেলায় ৬৪ গ্রাম মাছ অথবা মাংস দেয়ার কথা থাকলেও মানা হয় না নিয়ম। আর বিকালের নাস্তায় দেয়া হয় মাত্র ৩ টাকা দামের বিস্কুট।
এ বিষয়ে ১০৬ নম্বর ওয়ার্ডের ৬ নম্বর শয্যার রোগীর স্বজন তাহমিনা আক্তার বলেন, ১৫ দিন ধরে শাশুড়ির সঙ্গে হাসপাতালে আছি। যেসব খাবার দেয়া হয় এসব মুখেই তোলা যায় না। খাবার থেকে গন্ধ আসে। স্বাদ বলতে কিছুই নেই। তবুও বাধ্য হয়ে খেতে হয়। প্রতি বেলা বাইরে খেতে অনেক খরচ চলে যায়। এই খরচ বহন করা আমাদের জন্য খুবই কঠিন। দুপুরের খাবার ডাল ও মাংস দেখিয়ে তিনি বলেন, ডালের মধ্যে শুধু ডালের গন্ধ রয়েছে। আর কিছু নেই। শুধু পানি দিয়ে রেখেছে। রাতের বেলা এসে দেখবেন, মাছের আঁশ পর্যন্ত পরিষ্কার করা হয় না।
৭ নম্বর শয্যার রোগীর স্বজন রেহেনা বেগম মানবজমিনকে বলেন, আমরা গরিব বলেই সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছি। আর আমরা চাইলেই ভালো সেবা পাবো না। বিনামূল্যের খাবার মুখে দেয়ার মতো না। দুপুরের ভাত রাত পর্যন্ত থাকে না। রুটিগুলো শক্ত। নামমাত্র ডাল দেয়া হয়। মুরগির মাংসে কোনো স্বাদ নেই। মনে হয় পানিতে সেদ্ধ করে এনেছে। মাছের পরিমাণ খুবই ছোট। খাওয়ার সময় আঁশ বেছে বেছে খেতে হয়।
৫৩০ নম্বর ওয়ার্ডের এক রোগীর স্বজন সাইফুল ইসলাম (৪৮) বলেন, দুপুরের খাবার দেয় ৩-৪ টার দিকে। খাবারের মান এতো খারাপ যে, মাঝে মাঝে মনে হয় আমাদের পশুর খাবার দেয়া হচ্ছে। ১৮ই আগস্ট রাতে নষ্ট ডাল দেয়া হয়েছিল। ডালের ঢাকনা খুলতেই গন্ধ ছড়িয়ে পরে। তাদের জানালে বলে, ইচ্ছে হলে খান। না খেলে নিবেন না। কলা দেখে তো মনে হয়, ফেলে দেয়া কলাগুলো কুড়িয়ে এনেছে।
ঢাকা মেডিকেলে নিম্নমানের খাবার: ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মোটা চালের ভাত, ডাল-পানির মতো পাতলা ও স্বাদহীন তরকারি দেয়ার অভিযোগ করেছেন রোগী ও স্বজনরা। ক্যালরি মেপে রোগীর বয়স, ওজন ও রোগের ধরন অনুযায়ী খাবার দেয়ার তেমন ব্যবস্থা নেই। ওষুধের মতো প্রতিদিনের খাবার প্রত্যেক রোগীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর ডায়াবেটিস আছে কি না, কিডনিতে সমস্যা আছে কি না, এসব জেনে খাবার নির্বাচন করতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে রোগীর বয়স, ওজন অনুযায়ী খাবারের পরিমাণ ঠিক করতে হয়। রোগীভেদে কোন খাবার লাগবে, তা ঠিক করে দেয়ার দায়িত্ব ডায়েটিশিয়ান বা পুষ্টিবিদের।
ঢাকা মেডিকেলে-২ নম্বর ভবনের ৪র্থ তলায় কথা হয় রফিকুল ইসলামের সঙ্গে। হাসপাতালের বাইরের দোকান থেকে স্যুপ এনে খাচ্ছিলেন তিনি। রফিকুল বলেন, হাসপাতালের রান্নাটা ভালো লাগে না। যে কলা দেয়, তা খাওয়া যায় না। ডাল পানি পানি লাগে। বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে খাবার এনে দিতে হয়। খাবার যদি ভালোই হতো, তাহলে বিনা মূল্যে পাওয়া খাবার কেন খাবো না?
সার্জারি বিভাগে চিকিৎসাধীন অন্তিম বলেন, হাসপাতালের তরকারি দেখলেই খাবার ইচ্ছা নষ্ট হয়ে যায়। সকালের নাস্তায় দেয়া হয় পাউরুটি, সেদ্ধ ডিম আর একটা কলা। কলার অবস্থাও বেশি ভালো থাকে না। খাওয়ার উপযোগী থাকে না। খাবারে কোনো স্বাদ নেই। পরিমাণ খুব কম। খাবারের চেহারা ফ্যাকাশে। কিন্তু ‘ঠেইক্যা’ এ খাবারই খেতে হচ্ছে। প্রায়ই বাইরে থেকে খাবার কিনে আনতে হয়।
খাবার সরবরাহের জন্য প্রতিটি হাসপাতালের নিজস্ব ব্যবস্থাপনা রয়েছে। দরপত্রের মাধ্যমে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতিদিনের খাবার সংগ্রহ করে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের জানানো প্রতিদিনের রোগীর সংখ্যার ভিত্তিতে সরবরাহকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান খাবারের আয়োজন করে। বর্তমানে সরকারি হাসপাতালে প্রত্যেক রোগীর জন্য দৈনিক বরাদ্দ ১৭৫ টাকা। অভিযোগ রয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজে রোগীদের খাবার সাপ্লাইসহ হাসপাতালের টেন্ডার ও সরবরাহে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে।
