চিকিৎসার মাঝপথেই মানুষের টানে ফিরে এসেছি

সংসদে যোগ দিয়ে কাঁদলেন মির্জা আব্বাস

চিকিৎসার মাঝপথেই মানুষের টানে ফিরে এসেছি

ফন্ট সাইজ:

অসুস্থতার কারণে দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ মাস পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনে যোগ দিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। ২০০৬ সালের পর ফের সংসদে ফিরে নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে আবেগ সংবরণ করতে পারেননি ঢাকা-৮ আসন থেকে নির্বাচিত এই বর্ষীয়ান বিএনপি নেতা। বারবার কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে তার। হুইলচেয়ারে বসেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে ৬ মিনিট আবেগময় বক্তব্য রাখেন তিনি। সুস্থ হয়ে সংসদ অধিবেশনে যোগ দিতে পেরে মহান রাব্বুল আলামিনসহ সকল সংসদ সদস্য ও দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। বলেন, চিকিৎসার মাঝপথেই মানুষের টানে ফিরে এসেছি। বাকি জীবন দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে চাই।

বৃহস্পতিবার ৩টা ৫০ মিনিটে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে যোগ দেন মির্জা আব্বাস। এসময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম তাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, দীর্ঘ দিন পর চিকিৎসা শেষে সংসদে এসেছেন সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাস উদ্দিন। এই মহান সংসদে আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছি।

আসর নামাজের বিরতির পর ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে ত্রয়োদশ সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে প্রথমবারের মতো বক্তব্য দেন মির্জা আব্বাস। স্পিকারের অনুমতি নিয়ে মির্জা আব্বাস বলেন, দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ মাস তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন। নির্বাচনের পরপরই একটি দলীয় রাজনৈতিক সভায় অংশ নেয়া অবস্থায় তিনি গুরুতর স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। এরপর জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থেকে তাকে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় অবস্থান করতে হয়েছে। চিকিৎসা শেষ না হলেও এবং শরীর পুরোপুরি সুস্থ না থাকা সত্ত্বেও নিছক ভালোবাসা, আবেগ ও জনগণের প্রতি গভীর মানবিক দায়বদ্ধতার কারণে তিনি আজকের সংসদে উপস্থিত হতে বাধ্য হয়েছেন। সংসদ অধিবেশনে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেয়ার সময় বারবার অশ্রু সংবরণের চেষ্টা করছিলেন।

বক্তব্যের শুরুতেই মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করে মির্জা আব্বাস শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন মহান স্বাধীনতার ঘোষক, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং বাংলাদেশের গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে। তিনি আবেগঘন কণ্ঠে জানান, ২০০৬ সালের পর আজ আবার এই পবিত্র কক্ষে একজন সংসদ সদস্য হিসেবে দাঁড়িয়ে কথা বলার সুযোগ পাওয়া তার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম আবেগপূর্ণ ও স্মরণীয় মুহূর্ত। এটি তার জন্য পরম আনন্দের ও চরম গর্বের বিষয়।

নিজের শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসা সফর নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এই প্রবীণ রাজনীতিক বলেন, আমার অসুস্থতার খবর শুনে জাতীয় সংসদের স্পিকার স্বয়ং তাকে দেখতে গিয়েছিলেন। এ ছাড়া মাননীয় রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সার্বিকভাবে নিয়মিত তার শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর রেখেছেন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্পিকারের এই মানবিক ও আন্তরিক আচরণ তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি কেবল একজন অসুস্থ মানুষের প্রতি সাধারণ সমবেদনা ছিল না, বরং তা ছিল আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্রের এক অপূর্ব ও মানবিক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাদের এই আন্তরিকতা ও ভালোবাসা তিনি কোনোদিন ভুলবেন না।

সংসদীয় রাজনীতির প্রকৃত দর্শন পুনর্ব্যক্ত করে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আজ এই সংসদে ফিরে এসে আমার মনে হচ্ছে রাজনীতি কেবল দলীয় পার্থক্য বা রাজনৈতিক সংঘাতের বিষয় নয়; রাজনীতি মূলত মানুষের সেবা করার জন্য। মহান সংসদ কোনো নেহাত বিতর্কের মঞ্চ নয়, এটি গণমানুষের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর পবিত্রতম স্থান। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আল্লাহ তাআলা যেন আমাকে দ্রুত পূর্ণ সুস্থতা দান করেন যাতে নির্বাচনী এলাকা তথা সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের জন্য জীবনের বাকি সময়টুকু নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে কাজ করে যেতে পারেন।

বক্তব্যের শেষভাগে তাকে দেখতে আসা, খোঁজখবর নেয়া এবং অসুস্থতার দিনগুলোতে যার যার অবস্থান থেকে দোয়া ও প্রার্থনা করা সমস্ত সহকর্মী সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা এবং দেশবাসীর প্রতি চিরকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। তিনি বলেন, ২০০৬ সালের দীর্ঘ ব্যবধানের পর আজ আবার সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি কেবল একটি কথাই বলতে চান তিনি মানুষের কাছে, মানুষের সেবায় এবং প্রিয় বাংলাদেশের সমৃদ্ধির স্বার্থে কাজ করতেই আবার ফিরে এসেছেন। দেশ ও জাতির সেবায় যেন বাকি জীবনটুকু আত্মনিয়োগ করতে পারেন, সেজন্য দলমত নির্বিশেষে দেশের সকল মানুষের কাছে দোয়া চান তিনি।

এর আগে সকালে তার নিজ কার্যালয়ে দাপ্তরিক কাজ শুরু করেন মির্জা আব্বাস। সকালে মির্জা আব্বাস সংসদ ভবনে পৌঁছালে তার দপ্তরের কর্মকর্তা তাকে স্বাগত জানান। এরপর তিনি তার জন্য নির্ধারিত অফিসে প্রবেশ করেন এবং বেশ কিছু নথিপত্র পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রথম দিনের দাপ্তরিক কার্যক্রমের সূচনা করেন। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে নতুন এই দায়িত্ব পালনে তিনি সবার সহযোগিতা কামনা করেছেন।

এদিকে সন্ধ্যায় সংসদ ভবন থেকে ফেরার পথে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া’র সমাধিস্থলে শ্রদ্ধা জানান মির্জা আব্বাস।

উল্লেখ্য, গত ১১ই মার্চ রাজধানীর শাহজাহানপুরের বাসায় হঠাৎ জ্ঞান হারালে মির্জা আব্বাসকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিনই নিউরো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে মেডিকেল টিম তার মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করে। পরে ১৫ই মার্চ উন্নত চিকিৎসার জন্য মির্জা আব্বাসকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে নেওয়া হয় সিঙ্গাপুরে জেনারেল হাসপাতালে। সেখানে টানা এক মাসের চিকিৎসায় তিনি অনেকটাই সুস্থ হয়ে ওঠেন। পরে চিকিৎসকদের পরামর্শে গত ১৪ই এপ্রিল তাকে ভর্তি করা হয় মালয়েশিয়ার প্রিন্স কোর্ট হাসপাতালে। সেখানে এতদিন তার ফিজিওফেরাপি চলছিল। সাড়ে পাঁচ মাস চিকিৎসা শেষে ২রা সেপ্টেম্বর বুধবার দেশে ফিরেন মির্জা আব্বাস।