মাদ্রাসাছাত্রকে বলাৎকারের অভিযোগে সহপাঠী-শিক্ষকসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা

ফন্ট সাইজ:

সাভারে সাত বছর বয়সী এক মাদ্রাসাছাত্রকে বলাৎকারের অভিযোগে ওই মাদ্রাসার চার শিক্ষক ও ছয় শিক্ষার্থীসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছেন ভুক্তভোগী শিশুটির বাবা মো. জসীম উদ্দিন। গত ২৩শে আগস্ট ট্রাইব্যুনালের বিচারিক আদালতে মামলার আবেদন করা হলে অভিযোগটি সাভার মডেল থানাকে এজাহার হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল।

ট্রাইব্যুনালের আদেশের পর সাভার মডেল থানা থেকে ২৭শে আগস্ট মামলার এজাহার আদালতে উপস্থাপন করা হয়। ওই দিন ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তানভীর আহমদ তা গ্রহণ করে ১৩ই অক্টোবরের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেন। মামলায় মাদ্রাসাটির মুহতামিম (পরিচালক) জিয়া ইবনে কাসেমের (৪৮) পাশাপাশি মক্তব বিভাগের প্রধান ক্বারী রফিকুল ইসলাম (৫৬) ও সহকারী শিক্ষক হাফেজ মাওলানা জাবের হোসেন (২৯)। দুই হাফেজ সাব্বির (২৭) ও হাফেজ কামরুজ্জামান (২৮), মক্তব বিভাগের ছাত্র হাসান বিন মোস্তফা (১৬), মোহাম্মদ বিন মুক্তার (১৫), আবু সাঈদ (১৫), সায়েম (২২), রাফি (২০)কে আসামি করা হয়েছে।

মামলার বাদী ভুক্তভোগী শিশুটির বাবা স্থানীয় একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। তার ছেলে সাভারের পূর্ব শাহীবাগ এলাকার মারকাযুল উলুম আশ-শরইয়্যাহ মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে এবং আবাসিক শিক্ষার্থী হিসেবে সেখানেই থাকে। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ২১শে ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ই জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা শিশুটিকে ধর্ষণ করেছে। বিষয়টি জানার পর শিশুটির বাবা মাদ্রাসার পরিচালক জিয়া ইবনে কাশেমের কাছে অভিযোগ করেন। অভিযুক্তদের পুলিশের হাতে তুলে দেয়ার আশ্বাস দেয়া হলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বরং বিষয়টি নিয়ে চুপ থাকতে তাকে নির্দেশ দেয় এবং হুমকি দেয়ার অভিযোগও করেছেন শিশুটির বাবা। এদিকে শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়লে পরিচিত এক চিকিৎসকের পরামর্শ নেন তার বাবা। চিকিৎসক শিশুটিকে পরীক্ষা করে দ্রুত সরকারি হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দেন।

গত ১৮ই আগস্ট তাকে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হয়। সেখানকার চিকিৎসকরা শিশুটিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে নেয়ার পরামর্শ দেন। একই দিন তাকে সেখানে ভর্তি করা হয়। শিশুটিকে চারদিন চিকিৎসা দেয়া হয় বলে জানান তার বাবা। পরে পরিচিত এক আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে মামলা করেন। আদালত শিশুটির জবানবন্দি গ্রহণ করে সাভার মডেল থানাকে মামলা নেয়ার নির্দেশ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৬শে আগস্ট থানায় মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়। মামলার বিষয়টি জানার পর সরজমিন পূর্ব শাহীবাগ এলাকার মারকাযুল উলুম আশ-শরইয়্যাহ মাদ্রাসায় গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মামলার ১ নম্বর আসামি হিফজ বিভাগের শিক্ষার্থী রাফিকে ঘটনার পরপর তার পরিবারের লোকজন এখান থেকে নিয়ে গেছে। মামলায় তার বয়স ২০ বছর উল্লেখ করা হলেও জন্মসনদ অনুযায়ী তার প্রকৃত বয়স ১৩ বছর।

এ ছাড়া তার সহপাঠী ছায়েমের বয়স ১৩ বছরের পরিবর্তে ১৫ বছর, মোহাম্মদ বিন মুক্তারের বয়স ১১ বছরের পরিবর্তে ১৫ বছর, হাসান বিন মোস্তফার বয়স ১১ বছরের পরিবর্তে ১৬ বছর দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মক্তব বিভাগের প্রধান ক্বারী রফিকুল ইসলাম বলেন, মামলায় যে শিক্ষার্থীদের বিষয়ে অভিযোগ আনা হয়েছে তারা সবাই সহপাঠী এবং একই বয়সের। রাতে তারা একসঙ্গে ঘুমানোর সময় কিছু হলেও হতে পারে। কিন্তু মামলায় পরিকল্পিতভাবে ভুক্তভোগী শিশুটির বয়স কমিয়ে আসামিদের বয়স বাড়ানো হয়েছে। রফিকুল ইসলাম বলেন, ভুক্তভোগী শিশুটির বাবার সঙ্গে আমাদের অনেকদিনের সম্পর্ক। সে এখানে নামাজ পড়েন এবং তাবলিগ করেছেন।
তার ছেলেকে বলাৎকারের অভিযোগ এনে তিনি নিজে মাদ্রাসায় ছুরি নিয়ে এসেছিলেন অভিযুক্তদের জবাই করার জন্য। পরে মাদ্রাসার পক্ষ থেকে তাকে শান্ত করার জন্য উপযুক্ত বিচারের আশ্বাস দেয়া হয়।

সেই অনুযায়ী দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে। তাদেরকে ৬ মাস আগেই মাদ্রাসা থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু হঠাৎ করে তিনি আমাদের নামে মামলা করেছেন শুনে আশ্চর্য হয়েছি। বিষয়টি জানতে মামলার বাদীর নম্বরে গত দুইদিনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাভার মডেল থানার উপ-পরিদর্শক মো. সামিরুল হাসান বলেন, আদালতের নির্দেশে মামলাটি হয়েছে। মামলায় পাঁচ শিক্ষার্থী ও এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে সরাসরি বলাৎকারের অভিযোগ আনা হয়েছে। বাকি চারজনের বিরুদ্ধে বলাৎকারে সহায়তার অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তের পাশাপাশি আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল আলম বলেন, বাদী চাইলে সরাসরি থানায় এসে মামলা করতে পারতেন। সরাসরি মামলা হলে আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তারের সুযোগ থাকতো। তবে বর্তমানে অভিযুক্তরা পালিয়ে গেছে। তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশি অভিযান অব্যাহত আছে।