খেলাপি ঋণ ছাড়ালো ছয় লাখ কোটি টাকা

খেলাপি ঋণ ছাড়ালো ছয় লাখ কোটি টাকা

ফন্ট সাইজ:

খেলাপিদের ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন ও বিশেষ ছাড় দেয়ার পরও দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি বা অনাদায়ী ঋণের লাগাম টানা যাচ্ছে না। ফলে আবারো ব্যাংক খাতে শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যা দেশের আর্থিক খাতের নাজুক পরিস্থিতিকে উন্মোচিত করেছে। পাশাপাশি ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। মোট বিতরণ করা ঋণের বিপরীতে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩২.৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংক খাতের ১০০ টাকার ঋণে খেলাপি ঋণ ৩৩ টাকা ৭৮ পয়সা। এর সিংহভাগই আদায় অযোগ্য। বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
ব্যাংকিং খাতের এই বিপুল পরিমাণ মূলধন আটকে থাকায় উৎপাদনশীল খাতে সাধারণ বিনিয়োগ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তারল্য সংকটের কারণে ব্যাংকগুলোর নতুন করে ঋণ দেয়ার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের সামগ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে।

খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের অভাব, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব খাটিয়ে বেনামে ঋণ নেয়া এবং জবাবদিহিতার চূড়ান্ত ঘাটতিই এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মূল কারণ। খেলাপি ঋণ আদায়ে বিদ্যমান আইনি কাঠামোর দ্রুত সংস্কার এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ব্যাংক খাতের এই ধারাবাহিক রক্তক্ষরণ কোনোভাবেই বন্ধ করা সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এর আগে চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। সে হিসাবে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। একই সময়ে খেলাপি ঋণের হার ৩২.২৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩২.৭৮ শতাংশে উঠেছে।

ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের এই লাগামহীন বৃদ্ধিকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, দেশে রাজনৈতিক প্রভাব ও সুশাসনের ঘাটতির কারণে ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণের প্রবণতা বেড়েছে। এর ফলে ব্যাংকে তারল্য সংকট তৈরি হচ্ছে এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে গিয়ে নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন প্রকৃত খেলাপি ঋণ আড়াল করা হয়েছে। সব ব্যাংকের প্রকৃত তথ্য সামনে এলে এই অঙ্ক আরও বাড়বে। তাই বিশেষ ছাড় না দিয়ে বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার করতে হবে। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আড়াল না করে দ্রুত আদায়যোগ্য ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
খেলাপি ঋণ কমানোই বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সমস্যাগুলোর মধ্যে খেলাপি ঋণই অন্যতম বড় সমস্যা। এটি কমাতে না পারলে ব্যাংকিং খাতকে টেকসইভাবে ঘুরে দাঁড় করানো কঠিন।

তিনি বলেন, বর্তমান গভর্নর দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই খেলাপি ঋণ কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন এবং বিশেষ এক্সিট পলিসির আওতায় ঋণগ্রহীতাদের বিভিন্ন সুযোগ দেয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হলো সম্ভাবনাময় কিন্তু সমস্যাগ্রস্ত ঋণগুলোকে একটি কাঠামোর মধ্যে এনে আদায়যোগ্য করা এবং ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা। আরিফ হোসেন খান বলেন, খেলাপি ঋণ কমানো শুধু ব্যাংকগুলোর জন্য নয়, পুরো আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিভিন্ন নীতিগত সুবিধা দেয়ার পরও খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে।
ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে অতীতের অনিয়ম ও ঋণের প্রকৃত মান নির্ধারণের ক্ষেত্রে পরিবর্তনকেও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুনে ব্যাংক খাতে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৩০ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শ্রেণিকৃত ঋণ বেড়েছে ৩ লাখ ১৯ হাজার ৩৭ কোটি টাকা; যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
জুন ২০২৬: ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা; খেলাপির হার ৩২.৭৮ শতাংশ, মার্চ ২০২৬: ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা; খেলাপির হার ৩২.২৬ শতাংশ, ডিসেম্বর ২০২৫: ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা, সেপ্টেম্বর ২০২৫: ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৪১৫ কোটি টাকা; খেলাপির হার ৩৫.৭৩ শতাংশ, মার্চ থেকে জুনে বৃদ্ধি: ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা, ডিসেম্বর থেকে জুনে বৃদ্ধি: ৪৯ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক খাতে অনিয়মের মাধ্যমে নাম-বেনামে বিতরণ করা অনেক ঋণ এখন নিয়ম অনুযায়ী খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হতে শুরু করেছে। পাশাপাশি ঋণ খেলাপি হওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ম আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার কারণেও শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। যেসব ঋণ বারবার নবায়ন করা হয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোও আদায় হচ্ছে না। অনিয়মের মাধ্যমে বিতরণ করা ঋণ চিহ্নিত হওয়ার ফলে প্রকৃত খেলাপি ঋণের চিত্রও সামনে আসছে।