সিলেট জুড়েই মাদকের ভয়াবহ বিস্তার। সীমান্ত গলিয়ে বানের মতো আসছে নেশাজাতীয় দ্রব্য। ইয়াবা, ফেনসিডিল ও হেরোইনের বিস্তার সবখানে। সন্ধ্যা নামলেই চিহ্নিত স্পটগুলোতে মাদকসেবনের মহোৎসব চলে। মাঠ পর্যায়ের পুলিশও মিশে গেছে এর সঙ্গে। রাজনৈতিক শেল্টার তো আছে। সিলেটে মাদক নিয়ে এখন বাস্তবতা এমনই। সম্প্রতি সময়ে কয়েকটি লোমহর্ষক ঘটনার পেছনেও রয়েছে মাদক। নগরের রায়নগরে ট্রিপল মার্ডারের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া রংমিস্ত্রি বাবুল মিয়াও একজন মাদকসেবনকারী। ঘটনার পর বাবুল মিয়া দলদলি চা বাগানে গিয়ে কয়েক ঘণ্টা কাটিয়েছে। ওখানে সে মাদকসেবনের পর ফিরে এসে বাসার মালিকের কাছে বাসা ভাড়ার পাওনা টাকা পরিশোধ করেছে। বাগানে থাকা অবস্থায়ই বাসার মালিকের সঙ্গে মোবাইল ফোনে তার কয়েক দফা কথা হয়।
এ সময় বাবুল জানিয়েছে সে বাগানেই ছিল। শাহপরানে ব্যবসায়ী শাহাদাত হোসেনের খুনি জালাল আহমদও মাদকসেবনকারী। সম্প্রতি শাহপরানে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার হয়েছে। আর প্রতি রাতেই শাহাদাত মাদকসেবন করতো। এর আগে সিলেটে র্যাব সদস্য ইমন আচার্য খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া নগরের মোগলটুলা এলাকার আসাদুল হক বাপ্পি নামের এক মাদক বিক্রেতা ও ছিনতাইকারী। বাপ্পি নগরের ক্বীনব্রিজ এলাকায় মাদক বিক্রি করতো। একইসঙ্গে ছিনতাই চক্রেরও নেতৃত্ব দিতো সে। এ ঘটনার পর পুলিশ ক্বীনব্রিজ এলাকা অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প বসিয়েছে। নগর জুড়ে ছিনতাইয়ের ঘটনায়ও উঠে আসে মাদককারবারিদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি। সিলেট নগর পুলিশ এসব ঘটনার পর মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছিল। তছনছ করে দিয়েছিল মাদক হাট কাস্টঘর।
পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় জনতাও মাদকের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে নেমেছেন। তবুও মাদক বিক্রেতা ও সেবীদের লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হচ্ছে না। সূত্র বলছে; সন্ধ্যা নামলেই নগরের বালুচরের ইকোপার্ক, উপ-শহরের এইচ ব্লক, বুরহানউদ্দিন রুট, বালুচর, দলদলি বাগান, এয়ারপোর্ট রোড, ভার্সিটি এলাকা ও দক্ষিণ সুরমা পুরোটাই মাদকসেবীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। রায়নগরে আলোচিত ট্রিপল মার্ডারের ঘটনার পর সিলেট-১ আসনের এমপি ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির নগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক করেন মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মোর্শেদসহ সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে। বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী সিলেটের শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা প্রস্তুত করে তাদের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যেতে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন। মঙ্গলবার সার্কিট হাউজে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সিলেটের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে বৈঠক করেন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে।
ওই বৈঠকেও বাণিজ্যমন্ত্রী পূর্বের সিদ্ধান্তের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেছেন- সম্প্রতি সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনারসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠকে মাদকের শীর্ষ ৫০ ব্যবসায়ীর তালিকা প্রণয়ন করে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সিলেটে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ অভিযান পরিচালনা করা গেলে এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে পরিস্থিতির দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা সম্ভব বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। এ কাজে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় লজিস্টিক ও যানবাহন সরবরাহের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, সিলেট এসএমপি দেশের অন্যতম বৃহৎ পুলিশি এলাকার দায়িত্ব পালন করছে। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এডিসি (মিডিয়া) মঞ্জুরুল আলম মানবজমিনকে জানিয়েছেন- অনেক ঘটনার পেছনে মাদকের বিস্তার রয়েছে। মাদক ব্যবসায়ী সেবীদের বিরুদ্ধে পুলিশের আইনি কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
মন্ত্রীর নির্দেশনার পর বিষয়টিকে জোরালোভাবে দেখা হচ্ছে। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ মাদক ব্যবসায়ী ও সেবীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অ্যাকশনে নামছে বলে জানান তিনি। এদিকে সিলেটে পুলিশের পাশাপাশি র্যাব সদস্যরাও মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সনীতি গ্রহণ করেছেন। তারাও চিহ্নিত এলাকায় অভিযান চালাচ্ছেন।
