মশার আস্তানায় ডেঙ্গু চিকিৎসা

রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

মশার আস্তানায় ডেঙ্গু চিকিৎসা

ফন্ট সাইজ:

জ্বরে কাঁপতে থাকা ১০ মাসের শিশু সন্তান আরিফকে নিয়ে উপজেলার বরালু এলাকা থেকে হাসপাতালে ছুটে এসেছেন প্রবাসী পিতা আতিকুল। আতিকুলের মতো কয়েকশ’ স্বজন গত দুইদিনে তাদের পরিবারের অসুস্থ নিকটজনকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটে এসেছেন। কেউ কয়েকদিনের জ্বরকে সাধারণ অসুস্থতা ভেবে বাড়িতে চিকিৎসা নিয়েছেন, কেউ আবার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় ছুটেছেন হাসপাতালে। কিন্তু চিকিৎসা নিতে আসা সেই হাসপাতালের ভেতরেই যদি থাকে ময়লা-আবর্জনা, জমে থাকা পানি ও মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ, তাহলে রোগীর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এখন এমনই এক বিপরীত চিত্র। ৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে ভর্তি রোগীর সংখ্যা প্রায় ৭৫ জন। এর মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্ত ১৯ জন।

হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি, ময়লা-আবর্জনা, পানির ট্যাংকি এবং হাসপাতালের সামনেই ফেলে রাখা বর্জ্য নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার পাশাপাশি হাসপাতালের পরিবেশও এখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ওই হাসপাতালে ভর্তি রোগী হিসেবে চিকিৎসা নিয়েছেন ৫৯ জন। চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম দুইদিনে ভর্তি হয়েছেন ১৯ জন। একই সময়ে ডেঙ্গুর উপসর্গ নিয়ে শতাধিক মানুষ পরীক্ষা করিয়েছেন। তবে সরকারি হাসপাতালের এই হিসাবের বাইরে উপজেলার ২৮টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে অন্তত শতাধিক ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। গুরুতর রোগীদের অনেকে রাজধানীসহ বিভিন্ন হাসপাতালে যাচ্ছেন। সমপ্রতি ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন রূপগঞ্জ উপজেলা ভূমি অফিসের কর্মচারী আবু ছিদ্দিক।

তার মৃত্যুর ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। প্রায় ২০ লাখ মানুষের বসবাস রূপগঞ্জে। দু’টি পৌরসভা ও সাতটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এ উপজেলায় বর্ষায় বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকায় এডিস মশার বংশবিস্তারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বাড়ির আঙিনা, ডোবা-নালা, নর্দমা, পরিত্যক্ত পাত্র, ফুলের টব, পুরনো টায়ার ও নির্মাণাধীন স্থানে জমে থাকা পানি হয়ে উঠছে সম্ভাব্য প্রজননস্থল। ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লেও সাত ইউনিয়নে মশক নিধন কার্যক্রম নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, পৌরসভা এলাকায় মাঝে মধ্যে ওষুধ ছিটানো হলেও ইউনিয়ন পর্যায়ে মশক নিধন কার্যক্রম একেবারেই নেই।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন ডোবা-নালা, ময়লার ভাগাড় ও পরিত্যক্ত স্থান দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করায় মশার বংশবিস্তার বাড়ছে। দ্রুত এসব স্থান পরিষ্কার ও মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। এসব ব্যাপারে রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জুবায়ের নাদিম বলেন, ডেঙ্গু একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। বাড়ির আশপাশে পানি জমতে না দিলে এডিস মশার বংশবিস্তার ঠেকানো সম্ভব। হাসপাতালের অপরিচ্ছন্নতার বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে সক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ রোগী সামলাতে হচ্ছে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরও সংকট রয়েছে। বিষয়টি জানিয়ে কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়া হয়েছে এবং হাসপাতাল পরিচ্ছন্ন রাখার কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। ডা. জুবায়ের নাদিমের মতে, হঠাৎ উচ্চ জ্বর, প্রচণ্ড মাথাব্যথা, শরীর ও জয়েন্টে ব্যথা, দুর্বলতা কিংবা বমি বমি ভাব দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া জরুরি। একই সঙ্গে বাড়ির আশপাশে পানি জমতে না দেয়াই ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি।

অন্যদিকে, রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জয় বলেন, বাড়ির আঙিনা, ময়লা-আবর্জনা ও জমে থাকা পানি পরিষ্কার করার পাশাপাশি জনসচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু নির্দেশনা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নিয়মিত মশক নিধন, দ্রুত বর্জ্য অপসারণ এবং কোথায় পানি জমছে ও কোথায় এডিস মশার প্রজনন হচ্ছে তা চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া।