বান্দরবানে সুপেয় পানি, বদলে গেছে দুর্গম জনপদের জীবন

বান্দরবানে সুপেয় পানি, বদলে গেছে দুর্গম জনপদের জীবন

ফন্ট সাইজ:

বছরের পর বছর পাহাড়ের দুর্গম পথ পেরিয়ে ঝিরি, ঝরনা কিংবা ছড়া থেকে অনিরাপদ পানি সংগ্রহই ছিল বান্দরবানের প্রত্যন্ত পাহাড়ি জনপদের মানুষের নিত্যদিনের বাস্তবতা। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের প্রতিদিন পানির জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হতো। শুষ্ক মৌসুমে সেই দুর্ভোগ আরও বেড়ে যেতো। তবে সেই চিত্র এখন বদলাতে শুরু করেছে। দুর্গম পাহাড়ের চূড়ায় বসবাসরত মানুষের ঘরের পাশেই পৌঁছে গেছে সুপেয় পানি। গভীর নলকূপ, গ্র্যাভিটি ফ্লো সিস্টেম (জিএফএস), রিংওয়েল ও রেইন ওয়াটার হারভেস্টিংসহ বিভিন্ন প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রত্যন্ত এলাকায় নিরাপদ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। সরজমিন বান্দরবান সদর উপজেলার কয়েকটি দুর্গম এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পাড়ার বাড়ির পাশেই স্থাপন করা হয়েছে পানির কল। সেখান থেকেই প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহ করছেন স্থানীয়রা।

এতে দীর্ঘদিনের পানি সংকট অনেকটাই কমেছে। শহর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরের টিঅ্যান্ডটি পাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি বাড়ির কাছেই পানির কল স্থাপন করা হয়েছে। স্থানীয় নারী মেনেইচিং মারমা বলেন, আগে পাহাড়ের নিচে গিয়ে পানি আনতে হতো। এতে অনেক কষ্ট হতো। এখন ঘরের পাশেই পানি পাওয়ায় সেই দুর্ভোগ নেই।
টিঅ্যান্ডটি পাড়ার কারবারি অংবাই মারমা জানান, গভীর নলকূপের মাধ্যমে পাহাড়ি ও বাঙালি মিলিয়ে প্রায় ৮০টি পরিবারের কয়েকশ’ মানুষ সুপেয় পানির সুবিধা পাচ্ছেন। অন্যদিকে বান্দরবান-চট্টগ্রাম প্রধান সড়কের রেইছা লম্বা রাস্তা পাড়ার ১০টি পরিবারও পেয়েছে পানির সংকট থেকে স্বস্তি। স্থানীয়রা জানান, আগে পানি সংগ্রহে পাহাড়ের পর পাহাড় পায়ে হেঁটে দূরে যেতে হতো। কয়েক মাস আগে রিংওয়েল স্থাপনের পর এখন প্রায় ৩০-৩৫ জন মানুষ সহজেই পানি পাচ্ছেন।

জানা গেছে, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উদ্যোগে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে জেলার দুর্গম এলাকায় নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ১২টি জিএফএস মেরামত, নতুন ১০টি জিএফএস নির্মাণ, ৫৮৩টি রিংওয়েল, ১৪০টি রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং সিস্টেম, ৫০টি গভীর নলকূপ এবং পাড়াভিত্তিক পানি সরবরাহে ৫০টি প্রোডাকশন টিউবওয়েল স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় নির্মাণ করা হয়েছে ৩০টি স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট।

বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে বলেন, পাহাড়ের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় এলাকাভেদে গভীর নলকূপ, জিএফএস, রিংওয়েল ও রেইন ওয়াটার হারভেস্টিংয়ের মতো বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিরাপদ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে দুর্গম এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের পানির সংকট অনেকটাই দূর হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগে পানির জন্য দিনের বড় একটি সময় ব্যয় হলেও এখন ঘরের পাশেই পানি পাওয়ায় সময় ও শ্রম দুটোই সাশ্রয় হচ্ছে। একইসঙ্গে অনিরাপদ পানি ব্যবহারের ঝুঁকিও কমেছে। তাদের প্রত্যাশা, স্থাপিত পানি সরবরাহ ব্যবস্থাগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা হলে পাহাড়ের দুর্গম জনপদে সুপেয় পানির এ সুবিধা দীর্ঘস্থায়ী হবে।